ফটোগ্রাফি একই সঙ্গে একটি শিল্প ও বিজ্ঞান। একজন নবীন আলোকচিত্রীর জন্য এটি বিজ্ঞান। কারণ এই শিল্প আয়ত্ত করতে তাকে বিভিন্ন নিয়ম ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। আর দক্ষ আলোকচিত্রীদের জন্য এটি শিল্প। কারণ তারা নিজেদের স্বতন্ত্র ধারা ও পরিচয় তৈরি করে অন্যদের থেকে নিজেদের অনেক ওপরে তুলে ধরতে পারেন।
প্রতি বছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস পালিত হয়। এই দিনে ফটোগ্রাফির সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সর্বপ্রথম ছবি কে তুলেছিলেন, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন চীনা ও গ্রিকরা হয়তো পর্দায় ছবি প্রক্ষেপণের প্রাথমিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতেন। একটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে আলো প্রবেশ করিয়ে পর্দায় কোনো দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি তৈরি করা হতো। ১৬শ শতাব্দীতে একজন ইতালীয় বিজ্ঞানী এই ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনেন। তিনি ছোট ছিদ্রের পরিবর্তে একটি লেন্স ব্যবহার করে ছবি প্রক্ষেপণ করেন। তবে এই পদ্ধতিতে ছবিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রথম আলোকচিত্রটি তোলেন ফরাসি বিজ্ঞানী জোসেফ নিসেফোর নিপস। ছবিটির নাম ছিল ‘ভিউ ফ্রম দ্য ইউন্ডো অ্যাট লা গ্রেস’ এবং এটি ১৮২৬ সালে ধারণ করা হয়। এটিকেই সাধারণভাবে বিশ্বের প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে নিএপ্সের বাড়ির ওপরতলার জানালা থেকে দেখা একটি উঠান ও আশপাশের কয়েকটি স্থাপনা ধারণ করা হয়েছিল।
তৎকালীন ফরাসি সরকার ড্যাগেরিওটাইপ পদ্ধতিতে ফটোগ্রাফি আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়সে সময় ফটোগ্রাফি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল এবং ধারণ করা দৃশ্যকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। নিপসও নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করেন। স্থায়ী ছবি তৈরির জন্য তিনি বিটুমেন-প্রলেপযুক্ত একটি প্লেট ক্যামেরা অবস্কিউরার মধ্যে রেখে তার জানালার পাশে কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোতে উন্মুক্ত করেন। এর ফলেই তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্রগুলোর একটি।
আজ আমরা যে অর্থে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস পালন করি, সেই ধারণাটি ১৯৯১ সালের আগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। এর জন্য কৃতিত্ব দিতে হয় ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ওপি শর্মাকে। তিনি হারমনি-সেলিব্রেট এইজ ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন: ‘১৯৮৮ সালে আমার মাথায় এই ধারণাটি আসে। ফটোগ্রাফির ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় বারবার আমি ১৯ আগস্ট ১৮৩৯ তারিখটি দেখতে পেতাম।
সেখানে বলা হতো, ওই দিন তৎকালীন ফরাসি সরকার ড্যাগেরিওটাইপ পদ্ধতিতে ফটোগ্রাফি আবিষ্কারের ঘোষণা দেয় এবং এটিকে ‘বিশ্বের জন্য একটি মুক্ত উপহার’ হিসেবে ঘোষণা করে। আমি রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এবং ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব আমেরিকা (পিএসএ)-সহ বিশ্বের প্রায় ১৫০ জন আলোকচিত্রী ও বিশেষজ্ঞের কাছে এই ধারণাটি প্রস্তাব করি। ১৯৯১ সালের শুরু নাগাদ সবাই সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই বছর থেকেই আমরা বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস পালন শুরু করি।’
ড্যাগেরিওটাইপ কী?
লুই ড্যাগের ছিলেন একজন শিল্পী ও পদার্থবিদ। তিনি পরবর্তীতে একজন বিখ্যাত থিয়েটার ডিজাইনার হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন। তিনি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর নিপসের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। নিয়েপসের ‘হেলিওগ্রাফি’ পদ্ধতিই পরবর্তী ফটোগ্রাফিক প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করে। এ কারণে নিয়েপসকেই অনেক সময় ফটোগ্রাফির আবিষ্কারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নিয়েপসের তৈরি ‘ভিউ ফ্রম দ্য ইউন্ডো অ্যাট লা গ্রেস’ ছবিটি ১৮২৬ সালে পালিশ করা পিউটার ধাতুর একটি পাতের ওপর আলো-সংবেদনশীল বিটুমেন ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। এটি প্রকৃতি থেকে ধারণ করা এখন পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন স্থায়ী ছবি। অন্যদিকে, ১৮৩৩ সালে নিয়েপসের মৃত্যুর পর ড্যাগের নিজস্ব একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। তিনি ১৮৩৭ সালে ড্যাগেরিওটাইপ আবিষ্কার করেন। এতে রুপার আয়োডাইডে আবৃত একটি তামার পাতের ওপর ইতিবাচক ছবি তৈরি করা হতো। ক্যামেরায় ধারণ করা অদৃশ্য বা ‘ল্যাটেন্ট’ ছবিকে পারদীয় বাষ্পের সংস্পর্শে এনে দৃশ্যমান করা হতো এবং পরে শক্তিশালী লবণের দ্রবণ দিয়ে ছবিটিকে স্থায়ী করা হতো।
তাই ড্যাগেরকেই সাধারণত ক্যামেরা ও আধুনিক ফটোগ্রাফির বিকাশের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে দেখা হয়। ড্যাগের তার আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি ফরাসি একাডেমি অব সায়েন্সেসের কাছে বিক্রি করেন। এর বিনিময়ে তিনি বছরে ৬ হাজার ফ্রাঁ পেনশন পান। পাশাপাশি নিয়েপসের পরিবার বা উত্তরাধিকারীদের জন্য বছরে ৪ হাজার ফ্রাঁ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি ১৮৩৯ সালের ৭ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয় এবং ওই বছরের ১৯ আগস্ট এর বিস্তারিত বিবরণ ‘বিশ্বের জন্য মুক্ত উপহার’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়।
প্রথম মানুষের ছবি কখন তোলা হয়?
১৮৩৮ সালে প্যারিসে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের জানালা থেকে ড্যাগের তোলা ভিউ অব দ্য বুলেভার্ড দু টেম্প্যাল ছবিটি প্রাথমিক স্ট্রিট ফটোগ্রাফির একটি অনন্য উদাহরণ। এটিকে মানুষের উপস্থিতি থাকা প্রথম পরিচিত আলোকচিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ড্যাগেরিওটাইপ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে একটি ছবি তৈরি করতে প্রায় সাত মিনিট সময় লাগত।
এত দীর্ঘ সময় ধরে ক্যামেরার শাটার খোলা থাকার কারণে চলমান কোনো কিছুই ছবিতে ধরা পড়ত না। ছবিটিতে প্যারিসের একটি ব্যস্ত রাস্তা দেখা যায়, যেখানে অসংখ্য মানুষ ও ঘোড়ার গাড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ১০-১৫ মিনিটের দীর্ঘ এক্সপোজারের কারণে তারা কেউই এতক্ষণ স্থির থাকতে পারেনি যে ছবিতে ধরা পড়বে। এক ব্যতিক্রম ছিলেন নিচের বাম দিকে একজন ব্যক্তি, যিনি জুতা পালিশ করাচ্ছিলেন। ড্যাগেরের পদ্ধতিই ছিল প্রথম এমন আলোকচিত্র প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছবি তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। একই পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে ছবি তৈরি করা যেত। তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিই ছিল বিশ্বের প্রথম আলোকচিত্র পদ্ধতি, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবসের গুরুত্ব
আবিষ্কারের পর থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফটোগ্রাফির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। একসময় এটি কেবল একটি শখ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে অনেকের জন্য এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা। ফটোগ্রাফি এখন শুধু প্রযুক্তি নয়। এটি নিজেকে প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমও। একটি মাত্র ক্লিকের মাধ্যমে একটি ছবি হাজার শব্দের অনুভূতি ও গল্প প্রকাশ করতে পারে। বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সব মানুষ উদযাপন করেন। এর মাধ্যমে ফটোগ্রাফির সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া, এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এই অসাধারণ শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ ছড়িয়ে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
ফটোসাংবাদিকতার শুরু যুদ্ধের ময়দানে
ফটোগ্রাফি সবসময় সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করেছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৫ সালে ফটোগ্রাফার রজার ফেন্টন লন্ডন থেকে ক্রিমিয়ায় যান এবং ইংল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যকার যুদ্ধের ছবি ধারণ করেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে ফটোগ্রাফির ব্যবহার শুরু হয়। তাকে পাঠানো হয়েছিল দ্য টাইমস অব লন্ডন-এর যুদ্ধ সংবাদদাতা উইলিয়াম রাসেলের পাঠানো প্রতিবেদনগুলোর বিপরীতে যুদ্ধের দৃশ্যের বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রমাণ তুলে ধরার জন্য। চার মাসের অবস্থানকালে ফেন্টন মোট ৩৬০টি ছবি তোলেন। এগুলো ছিল একটি যুদ্ধের প্রথম বৃহৎ পরিসরের ক্যামেরাভিত্তিক নথিবদ্ধকরণ।
আজ ফটোগ্রাফি দিবস উদযাপন করা হয় যেভাবে
মানুষ তাদের প্রিয় ছবিগুলো শেয়ার করার মাধ্যমে বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস উদযাপন করে। কেউ কেউ ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী বা কর্মশালায় অংশ নেন। আবার অনেকে নিজেদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা তুলে ধরতে নতুন ছবি তোলেন এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন।
সূত্র: এনডিটিভি, ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























