যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থেমে নেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন। ড্রোনের সাহায্যে বোমাবর্ষণ, ফ্লেয়ার ও ড্রোন ছুড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বনভূমি, ফসলি জমি ও শতবর্ষী জলপাই বাগানে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থেমে নেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন। সরাসরি সংঘাত এড়ালেও ড্রোনের সাহায্যে বোমাবর্ষণ, ফ্লেয়ার ও ড্রোন ছুড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বনভূমি, ফসলি জমি ও শতবর্ষী জলপাই বাগানে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দমকলকর্মীদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে এসব আগুন লাগানো হচ্ছে। এতে শত শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাগান ও সবুজ বনাঞ্চল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও নষ্ট হচ্ছে হাজারো মানুষের জীবিকা।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এই ক্ষতি শুধু প্রকৃতির নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে জমিতে মানুষ চাষ করেছে, সেই জমিই এখন তাদের কাছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠছে।
গত ১৭ জুন যুদ্ধবিরতির পর প্রায় দুই মাসে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। নাবাতিয়েহ অঞ্চলের বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রধান হুসেইন ফাকিহ বলেন, ‘ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো আমাদের হাতে নেই, তবে চোখের সামনে বিশাল বনাঞ্চল পুড়ে ছাই হতে দেখেছি। সীমান্তসংলগ্ন লড়াইয়ের যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে।’
গত মঙ্গলবার খিয়ামের একটি বনাঞ্চলে ফ্লেয়ার নিক্ষেপের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে গেলে কাছাকাছি ড্রোন হামলা হয়। এতে তাদের পিছু হটতে হয় বলে জানান ফাকিহ।
তিনি বলেন, আগুন নেভানো এখন দমকলকর্মীদের নিয়মিত কাজের বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ফ্লেয়ার, অগ্নিসংযোগকারী অস্ত্র ও অন্যান্য হামলার কারণে বন ও কৃষিজমিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ লেবাননের মানুষের কাছে জলপাই গাছ শুধু গাছ নয়। এটি তাদের জীবিকা, ইতিহাস ও পারিবারিক স্মৃতির অংশ। সীমান্তবর্তী ইয়ারুন গ্রামের বাসিন্দাদের সেই স্মৃতিও এখন আগুনে পুড়ছে। গ্রামের মেয়র হাফেজ ঘাশাম বলেন, ৯০০টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ২০টি ছাড়া বাকি সবই বুলডোজারে ধ্বংস করা হয়েছে। এখন অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের প্রাচীন জলপাই বাগানগুলোও পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এই গাছগুলোর বেশিরভাগই আমাদের দাদা-দাদি ও বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। ইসরায়েলিরা আমাদের জমিকে বসবাসের অযোগ্য করে আমাদের সমগ্র ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।
আগুন নেভানোও দমকলকর্মীদের জন্য সহজ নয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রবেশের আগে লেবানিজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে একটি ‘ডিকনফ্লিকশন’ বা সংঘাত এড়ানোর সমন্বয় ব্যবস্থার অনুমতি নিতে হয়। তারপরও সব এলাকায় প্রবেশের অনুমতি মেলে না।
পরিবেশবাদীদের মতে, এই আগুনের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হবে না। দক্ষিণ লেবাননের বনাঞ্চলে ওক ও স্টোন পাইনসহ বহু পুরোনো গাছ রয়েছে। এসব বন পরিযায়ী পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন সাউদার্নার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস এই ঘটনাকে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, এটি কোনো একক আগুনের ঘটনা নয়। ধারাবাহিকভাবে বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হলে একটি বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকা ও পুনরুদ্ধারের ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক আগুনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেছে, তাদের সামরিক অভিযান বেসামরিক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়েই পরিচালিত হয়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ



























