ঢাকা ০৩:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ফিরে দেখা ৫ আগস্ট ২০২৪

অশ্রু, রক্ত আর বাঁধভাঙা উল্লাস: এক অবরুদ্ধ জাতির মুক্তিকাব্য

আজ ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়েছিল একটি অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণের মুখোমুখি। এই দিনটি বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় হাজার বছরের রাজনৈতিক মানচিত্রে খোদাই হয়ে গেল চির-অমোছনীয় এক রক্তিম হরফে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের জগদ্দল পাথরসম স্বৈরশাসনের নিকষ আঁধার ছিন্ন করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলার আকাশে উদিত হলো এক নতুন সূর্য। কারফিউর প্রহর, সামরিক বুটের দাপট, স্নাইপারের অবিরাম গর্জন আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরম হুমকির সীমানা ডিঙিয়ে ছাত্র-জনতা সেদিন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার এক নতুন দিগন্ত।

লাখো মুক্তিকামী মানুষের বাঁধভাঙা পদভারে যখন কেঁপে উঠছিল ঢাকার রাজপথ, ঠিক তখনই রচিত হলো চূড়ান্ত নাটকীয়তা। ছাত্র-জনতার অদম্য আক্রমণের মুখে নিজের শেষ রক্ষা অসম্ভব জেনে, সর্বশক্তি দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অত্যন্ত গোপনে, এক সামরিক বিমানে বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে চোরের মতো দেশ ছেড়ে তিনি আশ্রয় নিলেন ভারতে।

হাসিনার এই আকস্মিক ও কাপুরুষোচিত পলায়নের পর মুহূর্তের মধ্যেই যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল পুরো আওয়ামী সাম্রাজ্য। সাড়ে ১৫ বছর ধরে ধরাকে সরা জ্ঞান করা দলটির শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এক নিমিষে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও হতস্তম্ভ হয়ে পড়েন; কেউ দিশেহারা হয়ে পালালেন সীমান্ত ঘেঁষে, কেউ আত্মগোপনে গেলেন অচেনা আঁধারে, আর বাকিরা রয়ে গেলেন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে স্বজন হারানো হাজারো পরিবারের বোবা কান্না ও তাজা রক্তের চরম ট্রাজেডি, অন্যদিকে একটি দাম্ভিক শাসনের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে জনগণের চূড়ান্ত অধিপত্য—বিজয়ের উল্লাস, পলায়ন ও পতনের এমন নজিরবিহীন গণবিস্ফোরণের মহাকাব্যিক রূপ দিয়েই সূচিত হলো এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা।

 গণভবনে উত্তপ্ত বৈঠক, ক্ষোভ ও পলায়ন নাটক

সকালের গণভবন তখন এক অবরুদ্ধ প্রাসাদ। চারপাশে তখন আছড়ে পড়ছে হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদশব্দ। প্রাসাদের অন্দরে রক্তচক্ষু আর তীব্র উত্তাপ। সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক রূপ নিয়েছিল এক নাটকীয় সংঘাতময় ক্ষণে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্যমতে, পদত্যাগের লিখিত প্রস্তাব সামনে আসামাত্রই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন শেখ হাসিনা। ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজপথে আরও কঠোর হওয়ার, গুলি বর্ষণ করে জনস্রোত থামিয়ে রাখার নির্দেশ দেন তিনি। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পুলিশপ্রধানসহ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরা বিনয়ের সাথে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানান—রাজপথে যেভাবে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, কোনো বুলেটে তা আর থামানো সম্ভব নয়।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পরিষ্কার জানিয়ে দেন, সাধারণ মানুষের বুকে আর গুলি চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল—মাত্র ৪৫ মিনিটের আলটিমেটাম। জনতার সমুদ্র তখন গণভবনের কয়েক শত গজের মধ্যে। অবশেষে বোনের হাতে ধরে অশ্রুসিক্ত ও ক্রুদ্ধ অবস্থায় হেলিকপ্টারের সিঁড়িতে পা রাখতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। একটি দেশের দীর্ঘ ক্ষমতার দণ্ড ভেঙে পকেটে নিয়ে, বোন শেখ রেহানাকে সাথে করে এক সামরিক বিমানে ভারতের উদ্দেশে উড়াল দেন তিনি। ইতিহাস প্রত্যক্ষ করল এক স্বৈরাচারের চরম পরাভব ও পলায়নের করুণ ইতি।

 পুলিশ-র‌্যাবের পলায়ন, বিজিবি’র পিছু হটা

৫ আগস্ট সকালে ঢাকা শহরের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। কয়েক দিন ধরে রাজপথে নির্বিচারে গুলি চালানো পুলিশ ও র‌্যাবের শক্ত অবস্থান ভোর থেকেই ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে। শেখ হাসিনার পলায়নের আগ মুহূর্তে যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে সেনা ও অন্যান্য বাহিনী জনতার দিকে আর অস্ত্র তাক করবে না, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল মুহূর্তে ধসে পড়ে।

সকাল থেকে কিছু পয়েন্টে কাঁদানে গ্যাস ও গুলি বর্ষণ করলেও দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা না পেয়ে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য পোশাক খুলে, অস্ত্র ফেলে থানা ও ব্যারাক ছেড়ে পালিয়ে আত্মগোপনে যান।

সীমান্তে ও রাজপথে দায়িত্বরত বিজিবির জওয়ানরা পিছু হটে নিজেদের ব্যারাকে গুটিয়ে নেন। সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় এক সংবেদনশীল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। তারা জনতার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে রাজপথে বাধা অপসারণ করে দেন, যা সাধারণ মানুষকে বিজয় অভিমুখে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়।

 রাজপথে বাঁধভাঙা জোয়ার

সান্ধ্য আইনের তোয়াক্কা করেনি স্বাধীনতাকামী জনতা। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম—ঢাকার চারপাশ থেকে বাঁধভাঙা নদীর মতো ধেয়ে আসছিল মিছিলের পর মিছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর শাহবাগ মোড় রূপ নিয়েছিল মানুষের এক নীল সমুদ্রে।

“আজ আর ভয় নেই, আজ আর মৃত্যুর চিন্তা নেই। আমরা রক্ত দিয়েছি, আজ আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি।” — শাহবাগে অশ্রুসিক্ত এক তরুণের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছিল আন্দোলনের অগ্নিময় রূপ।

দুপুরের পর যখন পলায়নের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল, তখন ঢাকার রাজপথ কেঁপে উঠল এক অভূতপূর্ব বিজয়োল্লাসে। শত শত বছরের শৃঙ্খল ভেঙে লাখো মানুষ প্রবেশ করল গণভবনে, জাতীয় সংসদ ভবনে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

গণভবনের সবুজ লনে, বিলাসবহুল কক্ষে, সুইমিং পুলে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি যেন বুঝিয়ে দিল—রাজপ্রাসাদ কখনো জনগণের চেয়ে বড় হতে পারে না। সংসদের মূল ভবনে উড়ল লাল-সবুজের পতাকা, ছাদের ওপর তরুণদের উল্লাস আর দিগন্তবিদায়ী ধ্বনি বলে দিচ্ছিল—জনতাই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।

 রক্ত, ট্রাজেডি ও বীর শহীদদের মহাকাব্য

এই মহা বিজয়ের পেছনে ছিটকে ছড়িয়ে ছিল অগুনতি লাশের স্তূপ, তাজা রক্তের দাগ আর শত শত মায়ের আর্তনাদ। ৫ আগস্ট সকালে এবং আগের রাতগুলোতে ঢাকার সাভার, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা এবং দেশের নানা প্রান্তে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে শত শত তরুণ, কিশোর ও সাধারণ পথচারী শহীদ হন।

যাত্রাবাড়ী আর সাভারের ফ্লাইওভারের নিচে ৫ আগস্ট সকালেও পিচঢালা পথ ভেসে গিয়েছিল তাজা রক্তে। শত শত আহত মানুষ যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছিলেন, তখন একদিকে রক্তদানের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি, অন্যদিকে স্বজন হারানোদের করুণ আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল আকাশ-বাতাস।

একেকটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার বিনিময়ে অর্জিত হলো এই স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ। এই অর্জনের পৃষ্ঠায় যেমন আছে বিজয়ের আনন্দ, তেমনি আছে হাজারো পরিবার খালি হয়ে যাওয়ার চিরন্তন ট্রাজেডি।

জেলায় জেলায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি

ঢাকার বার্তা পৌঁছানো মাত্রই দেশের ৬৪টি জেলায় নেমে আসে মানুষের ঢল। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত টেকনাফ ও তেঁতুলিয়া পর্যন্ত—সর্বত্র নেমে আসে বিজয়ের মিছিল।

তবে এই উৎসবের মাঝেও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘাতের আগুন। দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ ক্ষোভ থেকে উত্তেজিত জনতা বহু জায়গায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কার্যালয়, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ও আওয়ামী নেতাদের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়।

বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতা ও দুর্বৃত্তরা পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে এবং ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

অরাজকতার এই অন্ধকার মুহূর্তগুলোতেও স্থানীয় ছাত্র-জনতা ও সচেতন নাগরিকরা রাত জেগে পাহাড়া দিয়ে মন্দির, গির্জা এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় এক অভূতপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি করেন।

সেনাপ্রধানের ঘোষণা

দিনভর রক্তের খেলা, উত্তাপ আর ঐতিহাসিক বিজয়ের পর গোধূলিলগ্নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সাথে জরুরি বৈঠকের কথা জানান।

ভাষণে সেনাপ্রধান বলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা হবে। ছাত্র-জনতার সকল দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরা ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

 ক্ষমতার পালাবদল ও সহস্রাধিক লাশের মিছিল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি রাজনৈতিক পতনের দিন ছিল না। এটি ছিল রক্ত, অগ্নিসংযোগ, উল্লাস এবং নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলায় মোড়ানো একটি ঐতিহাসিক দিন।

৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পরবর্তী কয়েক দিনের নৈরাজ্যে নিহতের সংখ্যা ছিল ভয়াবহ।

৫ আগস্ট সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি, দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান (পরবর্তী অনুসন্ধানে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।

১৬ জুলাই থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তার পরবর্তী কয়েক দিনের সহিংসতা মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা ৮৫০ ছাড়িয়ে যায় (পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার স্পর্শ করে বলে জানানো হয়।

আর ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন, যাদের মধ্যে শত শত তরুণ চোখ হারান কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

 থানা হামলা ও পুলিশ নিধন

৫ আগস্ট দুপুরে সরকারের পতনের সাথে সাথেই সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এক চরম প্রতিশোধমূলক আক্রমণ নেমে আসে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা এবং বাঘারপাড়া, সিরাজগঞ্জসহ দেশের প্রায় ৪৫৮টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।

থানাগুলো থেকে হাজার হাজার আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও লাখ লাখ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায় ক্ষুব্ধ জনতা ও দুর্বৃত্তরা।

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ ৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী দুই দিনে সারা দেশে অন্তত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ভয় ও আতঙ্কে পুরো দেশের পুলিশ ব্যবস্থা ধসে পড়ে এবং পুলিশ সদস্যরা ইউনিফর্ম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।

 আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা

সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের শিকার হওয়া ক্ষুব্ধ জনতা এবং সুযোগসন্ধানী দুষ্কৃতকারীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় তাণ্ডব চালায়:

বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনে (বঙ্গবন্ধু জাদুঘর) হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়।

ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের ৬৪টি জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন “হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল”-এ দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে সেখানে থাকা বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ২৪ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।

সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপিদের বাসভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

গাজীপুরের মেয়র ও স্থানীয় নেতাদের বাড়িঘর এবং শিল্পকারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

কারাফাটক উন্মোচন ও নৈরাজ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে সারা দেশে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়:

শেরপুর ও সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দিদের মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং অস্ত্রাগার লুট করা হয়।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ, আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও ঘরবাড়িতে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটে (যদিও পরবর্তীতে ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাত জেগে সেগুলো পাহারা দেয়)।

খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক বার্তা

একটি সফল গণঅভ্যূত্থানের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুনে যখন জ্বলছে গোটা দেশ- তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দেশের একমাত্র আশাভরসার আলো আপোষহীন দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মাতা, দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ ও গৃহবন্দী  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শরণাপন্ন হন গোটাজাতি। ৫ আগস্টের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাংলাদেশকে একটি গৃহযুদ্ধ ও নৈরাজ্যের কবল থেকে টেনে তুলতে তিনি মুক্ত পরিবেশে দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দেন।

তিনি বলেন- “প্রতিশোধ বা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ভালোবাসা ও শান্তির মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। ধ্বংস নয়, সৃষ্টিই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। তরুণেরা যে স্বপ্নের জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি দেশের সার্বিক শান্তি বজায় রাখা, সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষা করা এবং সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

সেনাসদরে নেতাদের ঐতিহাসিক বৈঠক

বিকেল গড়াতেই দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাসদরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাস। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান। জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নু। অন্যান্য দলের হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধি এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, খেলাফত মজলিসের প্রধান প্রমুখ। সুশীল সমাজের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ।

 বৈঠকের নির্যাস ও সিদ্ধান্ত

১.দেশে অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।

২.বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীদের ইচ্ছা অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের নাম চূড়ান্ত করা হবে।

৩.দেশে কোনো কারফিউ বা জরুরি অবস্থা থাকবে না; সেনাবাহিনী অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে।

৪.আন্দোলন চলাকালে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার করা হবে এবং সব রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।

একটি যুগের অবসান ও নতুন ভোরে পদার্পণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্ত ও আগুনে লেখা একটি মহাকাব্য। যে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার থেকে, তা রূপ নিয়েছিল এক সার্বজনীন গণবিপ্লবে। হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ, হাজারো পঙ্গুত্বের যাতনা আর লাখো মানুষের বুকের সাহসে চুরমার হয়ে গেল একটি শক্তিশালী দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থা।

এই দিনটি বাংলাদেশকে শিখিয়ে দিল—বন্দুক আর বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী হলো মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। রক্তে ধোয়া ৫ আগস্ট একদিকে যেমন স্বজন হারানো ট্রাজেডির বেদনায় নীল, অন্যদিকে একটি স্বৈরাচারমুক্ত, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অনন্ত সম্ভাবনার এক রক্তিম সূর্যোদয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

‘লিটল বয়’-এর ছদ্মবেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য বিষাক্ত ছোবল

ফিরে দেখা ৫ আগস্ট ২০২৪

অশ্রু, রক্ত আর বাঁধভাঙা উল্লাস: এক অবরুদ্ধ জাতির মুক্তিকাব্য

আপডেট সময় ০৫:০৩:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

আজ ইতিহাস থমকে দাঁড়িয়েছিল একটি অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণের মুখোমুখি। এই দিনটি বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় হাজার বছরের রাজনৈতিক মানচিত্রে খোদাই হয়ে গেল চির-অমোছনীয় এক রক্তিম হরফে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের জগদ্দল পাথরসম স্বৈরশাসনের নিকষ আঁধার ছিন্ন করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলার আকাশে উদিত হলো এক নতুন সূর্য। কারফিউর প্রহর, সামরিক বুটের দাপট, স্নাইপারের অবিরাম গর্জন আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরম হুমকির সীমানা ডিঙিয়ে ছাত্র-জনতা সেদিন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার এক নতুন দিগন্ত।

লাখো মুক্তিকামী মানুষের বাঁধভাঙা পদভারে যখন কেঁপে উঠছিল ঢাকার রাজপথ, ঠিক তখনই রচিত হলো চূড়ান্ত নাটকীয়তা। ছাত্র-জনতার অদম্য আক্রমণের মুখে নিজের শেষ রক্ষা অসম্ভব জেনে, সর্বশক্তি দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অত্যন্ত গোপনে, এক সামরিক বিমানে বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে চোরের মতো দেশ ছেড়ে তিনি আশ্রয় নিলেন ভারতে।

হাসিনার এই আকস্মিক ও কাপুরুষোচিত পলায়নের পর মুহূর্তের মধ্যেই যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল পুরো আওয়ামী সাম্রাজ্য। সাড়ে ১৫ বছর ধরে ধরাকে সরা জ্ঞান করা দলটির শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এক নিমিষে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও হতস্তম্ভ হয়ে পড়েন; কেউ দিশেহারা হয়ে পালালেন সীমান্ত ঘেঁষে, কেউ আত্মগোপনে গেলেন অচেনা আঁধারে, আর বাকিরা রয়ে গেলেন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে স্বজন হারানো হাজারো পরিবারের বোবা কান্না ও তাজা রক্তের চরম ট্রাজেডি, অন্যদিকে একটি দাম্ভিক শাসনের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে জনগণের চূড়ান্ত অধিপত্য—বিজয়ের উল্লাস, পলায়ন ও পতনের এমন নজিরবিহীন গণবিস্ফোরণের মহাকাব্যিক রূপ দিয়েই সূচিত হলো এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা।

 গণভবনে উত্তপ্ত বৈঠক, ক্ষোভ ও পলায়ন নাটক

সকালের গণভবন তখন এক অবরুদ্ধ প্রাসাদ। চারপাশে তখন আছড়ে পড়ছে হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদশব্দ। প্রাসাদের অন্দরে রক্তচক্ষু আর তীব্র উত্তাপ। সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক রূপ নিয়েছিল এক নাটকীয় সংঘাতময় ক্ষণে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্যমতে, পদত্যাগের লিখিত প্রস্তাব সামনে আসামাত্রই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন শেখ হাসিনা। ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজপথে আরও কঠোর হওয়ার, গুলি বর্ষণ করে জনস্রোত থামিয়ে রাখার নির্দেশ দেন তিনি। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পুলিশপ্রধানসহ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিরা বিনয়ের সাথে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানান—রাজপথে যেভাবে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, কোনো বুলেটে তা আর থামানো সম্ভব নয়।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পরিষ্কার জানিয়ে দেন, সাধারণ মানুষের বুকে আর গুলি চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল—মাত্র ৪৫ মিনিটের আলটিমেটাম। জনতার সমুদ্র তখন গণভবনের কয়েক শত গজের মধ্যে। অবশেষে বোনের হাতে ধরে অশ্রুসিক্ত ও ক্রুদ্ধ অবস্থায় হেলিকপ্টারের সিঁড়িতে পা রাখতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। একটি দেশের দীর্ঘ ক্ষমতার দণ্ড ভেঙে পকেটে নিয়ে, বোন শেখ রেহানাকে সাথে করে এক সামরিক বিমানে ভারতের উদ্দেশে উড়াল দেন তিনি। ইতিহাস প্রত্যক্ষ করল এক স্বৈরাচারের চরম পরাভব ও পলায়নের করুণ ইতি।

 পুলিশ-র‌্যাবের পলায়ন, বিজিবি’র পিছু হটা

৫ আগস্ট সকালে ঢাকা শহরের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। কয়েক দিন ধরে রাজপথে নির্বিচারে গুলি চালানো পুলিশ ও র‌্যাবের শক্ত অবস্থান ভোর থেকেই ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে। শেখ হাসিনার পলায়নের আগ মুহূর্তে যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে সেনা ও অন্যান্য বাহিনী জনতার দিকে আর অস্ত্র তাক করবে না, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল মুহূর্তে ধসে পড়ে।

সকাল থেকে কিছু পয়েন্টে কাঁদানে গ্যাস ও গুলি বর্ষণ করলেও দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা না পেয়ে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য পোশাক খুলে, অস্ত্র ফেলে থানা ও ব্যারাক ছেড়ে পালিয়ে আত্মগোপনে যান।

সীমান্তে ও রাজপথে দায়িত্বরত বিজিবির জওয়ানরা পিছু হটে নিজেদের ব্যারাকে গুটিয়ে নেন। সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় এক সংবেদনশীল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। তারা জনতার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে রাজপথে বাধা অপসারণ করে দেন, যা সাধারণ মানুষকে বিজয় অভিমুখে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়।

 রাজপথে বাঁধভাঙা জোয়ার

সান্ধ্য আইনের তোয়াক্কা করেনি স্বাধীনতাকামী জনতা। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম—ঢাকার চারপাশ থেকে বাঁধভাঙা নদীর মতো ধেয়ে আসছিল মিছিলের পর মিছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর শাহবাগ মোড় রূপ নিয়েছিল মানুষের এক নীল সমুদ্রে।

“আজ আর ভয় নেই, আজ আর মৃত্যুর চিন্তা নেই। আমরা রক্ত দিয়েছি, আজ আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি।” — শাহবাগে অশ্রুসিক্ত এক তরুণের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছিল আন্দোলনের অগ্নিময় রূপ।

দুপুরের পর যখন পলায়নের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল, তখন ঢাকার রাজপথ কেঁপে উঠল এক অভূতপূর্ব বিজয়োল্লাসে। শত শত বছরের শৃঙ্খল ভেঙে লাখো মানুষ প্রবেশ করল গণভবনে, জাতীয় সংসদ ভবনে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

গণভবনের সবুজ লনে, বিলাসবহুল কক্ষে, সুইমিং পুলে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি যেন বুঝিয়ে দিল—রাজপ্রাসাদ কখনো জনগণের চেয়ে বড় হতে পারে না। সংসদের মূল ভবনে উড়ল লাল-সবুজের পতাকা, ছাদের ওপর তরুণদের উল্লাস আর দিগন্তবিদায়ী ধ্বনি বলে দিচ্ছিল—জনতাই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।

 রক্ত, ট্রাজেডি ও বীর শহীদদের মহাকাব্য

এই মহা বিজয়ের পেছনে ছিটকে ছড়িয়ে ছিল অগুনতি লাশের স্তূপ, তাজা রক্তের দাগ আর শত শত মায়ের আর্তনাদ। ৫ আগস্ট সকালে এবং আগের রাতগুলোতে ঢাকার সাভার, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা এবং দেশের নানা প্রান্তে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে শত শত তরুণ, কিশোর ও সাধারণ পথচারী শহীদ হন।

যাত্রাবাড়ী আর সাভারের ফ্লাইওভারের নিচে ৫ আগস্ট সকালেও পিচঢালা পথ ভেসে গিয়েছিল তাজা রক্তে। শত শত আহত মানুষ যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছিলেন, তখন একদিকে রক্তদানের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি, অন্যদিকে স্বজন হারানোদের করুণ আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল আকাশ-বাতাস।

একেকটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার বিনিময়ে অর্জিত হলো এই স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ। এই অর্জনের পৃষ্ঠায় যেমন আছে বিজয়ের আনন্দ, তেমনি আছে হাজারো পরিবার খালি হয়ে যাওয়ার চিরন্তন ট্রাজেডি।

জেলায় জেলায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি

ঢাকার বার্তা পৌঁছানো মাত্রই দেশের ৬৪টি জেলায় নেমে আসে মানুষের ঢল। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত টেকনাফ ও তেঁতুলিয়া পর্যন্ত—সর্বত্র নেমে আসে বিজয়ের মিছিল।

তবে এই উৎসবের মাঝেও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘাতের আগুন। দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ ক্ষোভ থেকে উত্তেজিত জনতা বহু জায়গায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কার্যালয়, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ও আওয়ামী নেতাদের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়।

বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতা ও দুর্বৃত্তরা পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে এবং ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

অরাজকতার এই অন্ধকার মুহূর্তগুলোতেও স্থানীয় ছাত্র-জনতা ও সচেতন নাগরিকরা রাত জেগে পাহাড়া দিয়ে মন্দির, গির্জা এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় এক অভূতপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি করেন।

সেনাপ্রধানের ঘোষণা

দিনভর রক্তের খেলা, উত্তাপ আর ঐতিহাসিক বিজয়ের পর গোধূলিলগ্নে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সাথে জরুরি বৈঠকের কথা জানান।

ভাষণে সেনাপ্রধান বলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা হবে। ছাত্র-জনতার সকল দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরা ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

 ক্ষমতার পালাবদল ও সহস্রাধিক লাশের মিছিল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি রাজনৈতিক পতনের দিন ছিল না। এটি ছিল রক্ত, অগ্নিসংযোগ, উল্লাস এবং নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলায় মোড়ানো একটি ঐতিহাসিক দিন।

৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পরবর্তী কয়েক দিনের নৈরাজ্যে নিহতের সংখ্যা ছিল ভয়াবহ।

৫ আগস্ট সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি, দফায় দফায় সংঘর্ষ এবং পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান (পরবর্তী অনুসন্ধানে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়।

১৬ জুলাই থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তার পরবর্তী কয়েক দিনের সহিংসতা মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা ৮৫০ ছাড়িয়ে যায় (পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার স্পর্শ করে বলে জানানো হয়।

আর ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন, যাদের মধ্যে শত শত তরুণ চোখ হারান কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

 থানা হামলা ও পুলিশ নিধন

৫ আগস্ট দুপুরে সরকারের পতনের সাথে সাথেই সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এক চরম প্রতিশোধমূলক আক্রমণ নেমে আসে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা এবং বাঘারপাড়া, সিরাজগঞ্জসহ দেশের প্রায় ৪৫৮টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।

থানাগুলো থেকে হাজার হাজার আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও লাখ লাখ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায় ক্ষুব্ধ জনতা ও দুর্বৃত্তরা।

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ ৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী দুই দিনে সারা দেশে অন্তত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। ভয় ও আতঙ্কে পুরো দেশের পুলিশ ব্যবস্থা ধসে পড়ে এবং পুলিশ সদস্যরা ইউনিফর্ম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।

 আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা

সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের শিকার হওয়া ক্ষুব্ধ জনতা এবং সুযোগসন্ধানী দুষ্কৃতকারীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় তাণ্ডব চালায়:

বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনে (বঙ্গবন্ধু জাদুঘর) হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়।

ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের ৬৪টি জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন “হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনাল”-এ দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে সেখানে থাকা বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ২৪ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।

সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ এমপিদের বাসভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

গাজীপুরের মেয়র ও স্থানীয় নেতাদের বাড়িঘর এবং শিল্পকারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

কারাফাটক উন্মোচন ও নৈরাজ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে সারা দেশে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়:

শেরপুর ও সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দিদের মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং অস্ত্রাগার লুট করা হয়।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ, আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও ঘরবাড়িতে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা ঘটে (যদিও পরবর্তীতে ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাত জেগে সেগুলো পাহারা দেয়)।

খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক বার্তা

একটি সফল গণঅভ্যূত্থানের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুনে যখন জ্বলছে গোটা দেশ- তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দেশের একমাত্র আশাভরসার আলো আপোষহীন দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মাতা, দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ ও গৃহবন্দী  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শরণাপন্ন হন গোটাজাতি। ৫ আগস্টের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাংলাদেশকে একটি গৃহযুদ্ধ ও নৈরাজ্যের কবল থেকে টেনে তুলতে তিনি মুক্ত পরিবেশে দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দেন।

তিনি বলেন- “প্রতিশোধ বা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ভালোবাসা ও শান্তির মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। ধ্বংস নয়, সৃষ্টিই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। তরুণেরা যে স্বপ্নের জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি দেশের সার্বিক শান্তি বজায় রাখা, সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষা করা এবং সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

সেনাসদরে নেতাদের ঐতিহাসিক বৈঠক

বিকেল গড়াতেই দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাসদরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে এক জরুরি বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাস। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান। জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নু। অন্যান্য দলের হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধি এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, খেলাফত মজলিসের প্রধান প্রমুখ। সুশীল সমাজের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ।

 বৈঠকের নির্যাস ও সিদ্ধান্ত

১.দেশে অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।

২.বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীদের ইচ্ছা অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানের নাম চূড়ান্ত করা হবে।

৩.দেশে কোনো কারফিউ বা জরুরি অবস্থা থাকবে না; সেনাবাহিনী অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে।

৪.আন্দোলন চলাকালে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার করা হবে এবং সব রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।

একটি যুগের অবসান ও নতুন ভোরে পদার্পণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্ত ও আগুনে লেখা একটি মহাকাব্য। যে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার থেকে, তা রূপ নিয়েছিল এক সার্বজনীন গণবিপ্লবে। হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ, হাজারো পঙ্গুত্বের যাতনা আর লাখো মানুষের বুকের সাহসে চুরমার হয়ে গেল একটি শক্তিশালী দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থা।

এই দিনটি বাংলাদেশকে শিখিয়ে দিল—বন্দুক আর বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী হলো মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। রক্তে ধোয়া ৫ আগস্ট একদিকে যেমন স্বজন হারানো ট্রাজেডির বেদনায় নীল, অন্যদিকে একটি স্বৈরাচারমুক্ত, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অনন্ত সম্ভাবনার এক রক্তিম সূর্যোদয়।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি