ঢাকা ০৩:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আজ ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস

‘লিটল বয়’-এর ছদ্মবেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য বিষাক্ত ছোবল

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, সোমবার। প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে জেগে উঠছিল হিরোশিমা। সুমিশেন নদী ও ওতা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছিমছাম শহরটি তখনো জানত না, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক নরককুণ্ড। আকাশে কোনো বড় যুদ্ধবিমানের গর্জন ছিল না, কেবল একটি একক ধাতব পাখির ছায়া।

হঠাৎ, সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। এক তীব্র আলোর ঝলকানি—যেন হাজারটা সূর্য একসাথে জ্বলে উঠল আকাশে। কোনো শব্দ শোনার আগেই মানুষগুলো বিলীন হয়ে গেল তীব্র তাপে। মুহূর্তের মধ্যে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে। লোহা, পাথর আর মানুষের মাংসপেশি মিশে একাকার হয়ে গেল সেই উত্তাপে।

মানবতা যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল

হিরোশিমার বাতাস থেকে সেদিন ভেসে আসছিল চামড়া পোড়া তীব্র গন্ধ। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যবর্তী সীমারেখা বিলীন হয়ে গিয়েছিল শহরের ‘হিবাখুশা’ (পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া মানুষ)-দের জন্য। যে শিশুরা সকালে টিফিন বক্স হাতে স্কুলে গিয়েছিল, তাদের অনেকের কোনো অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি; রয়ে গিয়েছিল শুধু পাথরের ওপর তাদের অবয়বের তেজস্ক্রিয় ছায়া।

হিরোশিমার পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি আধপোড়া তিন চাকার সাইকেল কিংবা থমকে যাওয়া দেয়ালঘড়ি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অহংকার আর যুদ্ধের উন্মাদনা মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে।

এক লহমায় স্তব্ধতার নগরী

ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ ‘লিটল বয়’ যখন শহরের মাটির ১৯০০ ফুট ওপরে বিস্ফোরিত হয়, তখন চোখের পলকে গুঁড়িয়ে যায় মাইলের পর মাইল এলাকা।

বিষাক্ত সেই অগ্নিগোলক আর তীব্র শকওয়েভে মুহূর্তেই ছাই হয়ে যান প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার নিরপরাধ মানুষ।

১৯৮০-এর দশকের শেষ নাগাদ পারমাণবিক বিকিরণ, ক্যান্সার ও অন্যান্য জটিলতায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে।

বিস্ফোরণের কিছু সময় পর আকাশ থেকে নেমে এসেছিল এক অভিশপ্ত ‘কালো বৃষ্টি’। তৃষ্ণার্ত, দগ্ধ মানুষগুলো সেই জল পান করার আকুতি জানিয়েছিল, কিন্তু তা ছিল তেজস্ক্রিয়তায় ভরা আরও এক মরণব্যাধি।

তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় আঘাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে জাপানি সাম্রাজ্যকে দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ফেলা দুটি পারমাণবিক বোমা মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ে পরিণত করেছিল দুটি সাজানো নগরী এবং কেড়ে নিয়েছিল লাখ লাখ প্রাণ।

প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের এক প্রফাতকালে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বিমানবাহিনীর শক্তিশালী বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ হিরোশিমা শহরের আকাশে উড়ে এসে নিক্ষেপ করে অত্যন্ত শক্তিশালী ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভিত্তিক পারমাণবিক বোমা, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘লিটল বয়’। বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই এক তপ্ত নরককুণ্ডে পরিণত হয় পুরো শহর। মুহূর্তের মধ্যেই শহরের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান এবং চোখের পলকে মাটির সঙ্গে মিশে যায় মাইলের পর মাইল অবকাঠামো।

এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলার খেসারত শেষ হওয়ার আগেই, ঠিক তিন দিন পর অর্থাৎ ৯ আগস্ট সকাল ১১টা ০২ মিনিটে আসে দ্বিতীয় আঘাত। এবার লক্ষ্য ছিল শিল্পনগরী নাগাসাকি। ‘বক্সকার’ নামের আরেকটি বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হয় প্লুটোনিয়াম-২৩৯ উপাদান দিয়ে তৈরি অধিক ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’। পাহাড়ঘেরা নাগাসাকি শহরে এই বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান প্রায় ৪০ হাজার মানুষ।

তবে মৃত্যুর মিছিল কেবল ওই মুহূর্তে বা ওই দিনেই থেমে থাকেনি। বোমাবর্ষণের পর বাতাস, পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য এক অভিশাপ—পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা। পরবর্তী কয়েক মাস ও বছরে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি এবং তেজস্ক্রিয়তাজনিত নানাবিধ জটিলতায় হিরোশিমায় মৃতের সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে, আর নাগাসাকিতে তা ছাড়িয়ে যায় ৭০ হাজার। পরমাণু অস্ত্রের এমন বিভীষিকাময় আঘাতের পরই অবশেষে নতজানু হতে বাধ্য হয় জাপানি বাহিনী, যার মাধ্যমে পতন ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়ের।

পারমাণবিক বোমার আবিষ্কার ও হিরোশিমা-নাগাসাকির বিষাদময় ট্র্যাজেডি মানব ইতিহাসের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

‘লিটল বয়’-এর সূচনা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি যেন আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে না ফেলে, সেই আশঙ্কায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪২ সালে গোপনে শুরু করে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।

বিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহাইমার (J. Robert Oppenheimer)-এর নেতৃত্বে নিউ মেক্সিকোর লস আলামস গবেষণাগারে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা একত্রিত হন।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা ‘ট্রিনিটি’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

হিরোশিমা দিবসের গুরুত্ব ও বিশ্বশান্তি

হিরোশিমার ঘটনার পর ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।

জাপানি ভাষায় পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ‘হিবাখুশা’ বলা হয়। তারা আজীবন শারীরিক বিকলাঙ্গতা, ক্যান্সার ও সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে মূল ভূমিকা রেখেছেন।

হিরোশিমার যে ভবনের ঠিক ওপরে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার ধ্বংসাবশেষ আজও অবিকল রাখা হয়েছে। এটি এখন জাতিসংঘ ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং শান্তির প্রতীক।

হিরোশিমার বোমাবর্ষণে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়া ১২ বছরের শিশু সাদাকো সাসাকির গল্প বিশ্বখ্যাত। জাপানি বিশ্বাস অনুযায়ী ১ হাজারটি কাগজের সারস বানালে রোগ মুক্তি ঘটে—এই আশায় সে সারস বানানো শুরু করেছিল। আজ কাগজের ক্রেন বিশ্বশান্তির বিশ্বজনীন প্রতীক।

কেন এই ঘটনা চিরন্তন শিক্ষা?

হিরোশিমা কেবল কোনো সামরিক ইতিহাস নয়, এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা। ৬ আগস্ট আমাদের শেখায়—বিজ্ঞান যখন ধ্বংসের হাতিয়ার হয়, তখন কোনো জয়ী বা বিজিত থাকে না; জয়ী হয় কেবল শ্মশানের নীরবতা।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির পর আজ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি, তবে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম হয়েছিল:

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (ইউএসএসআর) মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উন্মাদ প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

১৯৬৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২,০০০-এর বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে (মূলত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়ার কাছে)।

হিরোশিমা দিবস প্রতি বছর ৬ আগস্ট পালিত হয় যেন বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়—”আর কখনোই যেন কোনো শহরকে হিরোশিমা হতে না হয়।”

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

‘লিটল বয়’-এর ছদ্মবেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য বিষাক্ত ছোবল

আজ ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস

‘লিটল বয়’-এর ছদ্মবেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য বিষাক্ত ছোবল

আপডেট সময় ০১:৪৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, সোমবার। প্রাত্যহিক জীবনের ছন্দে জেগে উঠছিল হিরোশিমা। সুমিশেন নদী ও ওতা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছিমছাম শহরটি তখনো জানত না, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক নরককুণ্ড। আকাশে কোনো বড় যুদ্ধবিমানের গর্জন ছিল না, কেবল একটি একক ধাতব পাখির ছায়া।

হঠাৎ, সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। এক তীব্র আলোর ঝলকানি—যেন হাজারটা সূর্য একসাথে জ্বলে উঠল আকাশে। কোনো শব্দ শোনার আগেই মানুষগুলো বিলীন হয়ে গেল তীব্র তাপে। মুহূর্তের মধ্যে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে। লোহা, পাথর আর মানুষের মাংসপেশি মিশে একাকার হয়ে গেল সেই উত্তাপে।

মানবতা যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল

হিরোশিমার বাতাস থেকে সেদিন ভেসে আসছিল চামড়া পোড়া তীব্র গন্ধ। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যবর্তী সীমারেখা বিলীন হয়ে গিয়েছিল শহরের ‘হিবাখুশা’ (পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া মানুষ)-দের জন্য। যে শিশুরা সকালে টিফিন বক্স হাতে স্কুলে গিয়েছিল, তাদের অনেকের কোনো অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি; রয়ে গিয়েছিল শুধু পাথরের ওপর তাদের অবয়বের তেজস্ক্রিয় ছায়া।

হিরোশিমার পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি আধপোড়া তিন চাকার সাইকেল কিংবা থমকে যাওয়া দেয়ালঘড়ি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অহংকার আর যুদ্ধের উন্মাদনা মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে।

এক লহমায় স্তব্ধতার নগরী

ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ ‘লিটল বয়’ যখন শহরের মাটির ১৯০০ ফুট ওপরে বিস্ফোরিত হয়, তখন চোখের পলকে গুঁড়িয়ে যায় মাইলের পর মাইল এলাকা।

বিষাক্ত সেই অগ্নিগোলক আর তীব্র শকওয়েভে মুহূর্তেই ছাই হয়ে যান প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার নিরপরাধ মানুষ।

১৯৮০-এর দশকের শেষ নাগাদ পারমাণবিক বিকিরণ, ক্যান্সার ও অন্যান্য জটিলতায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে।

বিস্ফোরণের কিছু সময় পর আকাশ থেকে নেমে এসেছিল এক অভিশপ্ত ‘কালো বৃষ্টি’। তৃষ্ণার্ত, দগ্ধ মানুষগুলো সেই জল পান করার আকুতি জানিয়েছিল, কিন্তু তা ছিল তেজস্ক্রিয়তায় ভরা আরও এক মরণব্যাধি।

তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় আঘাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে জাপানি সাম্রাজ্যকে দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ফেলা দুটি পারমাণবিক বোমা মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ে পরিণত করেছিল দুটি সাজানো নগরী এবং কেড়ে নিয়েছিল লাখ লাখ প্রাণ।

প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের এক প্রফাতকালে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বিমানবাহিনীর শক্তিশালী বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ হিরোশিমা শহরের আকাশে উড়ে এসে নিক্ষেপ করে অত্যন্ত শক্তিশালী ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভিত্তিক পারমাণবিক বোমা, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘লিটল বয়’। বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই এক তপ্ত নরককুণ্ডে পরিণত হয় পুরো শহর। মুহূর্তের মধ্যেই শহরের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান এবং চোখের পলকে মাটির সঙ্গে মিশে যায় মাইলের পর মাইল অবকাঠামো।

এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলার খেসারত শেষ হওয়ার আগেই, ঠিক তিন দিন পর অর্থাৎ ৯ আগস্ট সকাল ১১টা ০২ মিনিটে আসে দ্বিতীয় আঘাত। এবার লক্ষ্য ছিল শিল্পনগরী নাগাসাকি। ‘বক্সকার’ নামের আরেকটি বি-২৯ বোমারু বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হয় প্লুটোনিয়াম-২৩৯ উপাদান দিয়ে তৈরি অধিক ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’। পাহাড়ঘেরা নাগাসাকি শহরে এই বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান প্রায় ৪০ হাজার মানুষ।

তবে মৃত্যুর মিছিল কেবল ওই মুহূর্তে বা ওই দিনেই থেমে থাকেনি। বোমাবর্ষণের পর বাতাস, পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য এক অভিশাপ—পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা। পরবর্তী কয়েক মাস ও বছরে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি এবং তেজস্ক্রিয়তাজনিত নানাবিধ জটিলতায় হিরোশিমায় মৃতের সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে, আর নাগাসাকিতে তা ছাড়িয়ে যায় ৭০ হাজার। পরমাণু অস্ত্রের এমন বিভীষিকাময় আঘাতের পরই অবশেষে নতজানু হতে বাধ্য হয় জাপানি বাহিনী, যার মাধ্যমে পতন ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়ের।

পারমাণবিক বোমার আবিষ্কার ও হিরোশিমা-নাগাসাকির বিষাদময় ট্র্যাজেডি মানব ইতিহাসের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

‘লিটল বয়’-এর সূচনা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি যেন আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে না ফেলে, সেই আশঙ্কায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪২ সালে গোপনে শুরু করে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।

বিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহাইমার (J. Robert Oppenheimer)-এর নেতৃত্বে নিউ মেক্সিকোর লস আলামস গবেষণাগারে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা একত্রিত হন।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা ‘ট্রিনিটি’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

হিরোশিমা দিবসের গুরুত্ব ও বিশ্বশান্তি

হিরোশিমার ঘটনার পর ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।

জাপানি ভাষায় পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ‘হিবাখুশা’ বলা হয়। তারা আজীবন শারীরিক বিকলাঙ্গতা, ক্যান্সার ও সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে মূল ভূমিকা রেখেছেন।

হিরোশিমার যে ভবনের ঠিক ওপরে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার ধ্বংসাবশেষ আজও অবিকল রাখা হয়েছে। এটি এখন জাতিসংঘ ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং শান্তির প্রতীক।

হিরোশিমার বোমাবর্ষণে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়া ১২ বছরের শিশু সাদাকো সাসাকির গল্প বিশ্বখ্যাত। জাপানি বিশ্বাস অনুযায়ী ১ হাজারটি কাগজের সারস বানালে রোগ মুক্তি ঘটে—এই আশায় সে সারস বানানো শুরু করেছিল। আজ কাগজের ক্রেন বিশ্বশান্তির বিশ্বজনীন প্রতীক।

কেন এই ঘটনা চিরন্তন শিক্ষা?

হিরোশিমা কেবল কোনো সামরিক ইতিহাস নয়, এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা। ৬ আগস্ট আমাদের শেখায়—বিজ্ঞান যখন ধ্বংসের হাতিয়ার হয়, তখন কোনো জয়ী বা বিজিত থাকে না; জয়ী হয় কেবল শ্মশানের নীরবতা।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির পর আজ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি, তবে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম হয়েছিল:

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (ইউএসএসআর) মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উন্মাদ প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

১৯৬৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২,০০০-এর বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে (মূলত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়ার কাছে)।

হিরোশিমা দিবস প্রতি বছর ৬ আগস্ট পালিত হয় যেন বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়—”আর কখনোই যেন কোনো শহরকে হিরোশিমা হতে না হয়।”

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি