রাজধানীর পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরে কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, ঢাকা কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে তিন সংগঠনের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী, কয়েকজন সাংবাদিকসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. মকবুল হোসেন জানান, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৭০ জনেরও বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই দিনে রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরান ঢাকার শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিরোধ, শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু), ইনকিলাব মঞ্চ ও কয়েকটি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্্বিতন্ডা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এতে ছাত্রদলেরও বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জবি ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, ‘জকসুর ব্যর্থতা ও সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের অপকর্ম ঢাকার জন্য তারা এসব করছে। আমরা দেখেছি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) তারা মব করার চেষ্টা করেছে। একইভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা মব করার চেষ্টা করছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তারা মব কালচার করে যাচ্ছে।’ তাঁর দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীরাই এ ধরনের কর্মকান্ড প্রতিহত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন বলেন, অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান চলার সময় বাইরে একটি পক্ষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংঘর্ষ : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুরের দিকে সেখানে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা জড়ো হলে হাসপাতালের বাইরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও অবস্থান নেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের জের ধরে দুপুরে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং কয়েক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাঁদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
ঢাকা কলেজ : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দুপুরে কলেজের গ্যালারি-২ এলাকায় জুলাই গণ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল ছাত্রশিবির। এতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শিবিরের নেতা-কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং তাঁদের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পর উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা কলেজ এলাকায় অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
আলিয়া মাদ্রাসা : পুরান ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও বিকালে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকাল সোয়া ৫টার দিকে মাদ্রাসার সামনে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে ২০-৩০ ব্যক্তি আহত হন। ছাত্রদলের অভিযোগ, হলের বিভিন্ন কক্ষ দখল ও সাংগঠনিক বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পর আহত ব্যক্তিরা হাসপাতালে গেলে সেখানে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস























