ঢাকা ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo চট্টগ্রামে বিএনপি-এনসিপির মুখোমুখি অবস্থান, উত্তেজনা Logo বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি জনশক্তি নি‌তে ব্রুনাইকে অনু‌রোধ Logo সার্ক কার্যকর করতে বাংলাদেশ-নেপাল একমত Logo গুজবে কান নয়, তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করুন: আইসিটি মন্ত্রী Logo মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ হবে, এমন প্রকল্পে অগ্রাধিকার: মির্জা ফখরুল Logo রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্য, কর ফাঁকি ঠেকাতে মাঠে এনবিআর Logo এবার মিরপুরে জিয়াউল আহসানের ফ্ল্যাটের মালামাল গুনছে দুদক Logo ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির হামলা, নিহত ২০ Logo ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হাম উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না Logo হাসপাতালে দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্য, কর ফাঁকি ঠেকাতে মাঠে এনবিআর

চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ। স্বাধীনতার পর এবারই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর হচ্ছে এনবিআর। বিশেষ নজরদারি এবং বড় কর ফাঁকি উদঘাটনের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর আহসান হাবিব একাধিক বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এসব বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করজাল বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধ করার মতো বিষয়।

জানা গেছে, কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে এবারই প্রথম মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে একাধিক কর্মকর্তাকে এপ্রিসিয়েশন লেটার বা ভালো কাজের প্রশংসাপত্র পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত ব্রিফ করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর ও ভ্যাট ফাঁকি রোধে মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে উৎসে কর (টিডিএস) যথাযথভাবে কর্তন ও জমা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। তবে এসব পদক্ষেপ ঘিরে ব্যবসায়ী সমাজে উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, অটোমেশন ছাড়া কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে হয়রানি ও দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

গত ১৯ জুলাই এনবিআরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উৎসে কর আদায় যাচাই করতে কর্মকর্তারা যে কোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আর্থিক নথি, কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করা যাবে। এমনকি প্রয়োজন হলে ইলেকট্রনিক তথ্য সাময়িকভাবে জব্দ করারও ক্ষমতা থাকবে। পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই ক্ষমতার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের হয়রানি নয়, বরং যারা উৎসে কর কর্তন করেও সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না কিংবা তথ্য গোপন করছেন, তাদের চিহ্নিত করা। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অভিযোগ জানানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ বলেন, ধারা ১৪৭ সংক্রান্ত যে কোনো হয়রানি, অস্পষ্টতা কিংবা সংক্ষুব্ধতায় সরাসরি এনবিআরের ১৪৭ ধারা সংক্রান্ত কমিটির সদস্যসচিব বরাবর ই-মেইলে জানানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত নয়। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, টিডিএস ব্যবসায়ীদের কর নয়; তারা কেবল সরকারের হয়ে কর সংগ্রহ করে। তাই এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো সুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা গেলে তার অপব্যবহারের আশঙ্কাই বেশি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো টিডিএস সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। এমন অবস্থায় নথিপত্র ও কম্পিউটার জব্দের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর হবে।

রাজস্ব আদায়ের বড় অংশ আসবে ভ্যাট খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর এরই মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন রয়েছে এবং ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকি বেশি— এমন প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট প্রদানকারী প্রায় ২ হাজার বড় করদাতার ওপরও আলাদা নজরদারি চালিয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যান্য উৎস মিলিয়ে শুধু ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটনের মাধ্যমেই অতিরিক্ত ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।

শুধু ভ্যাট নয়, প্রয়োগমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট ৯৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি, বকেয়া আদায় থেকে ১৪ হাজার কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি এবং স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির কারণে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আসবে বলে আশা করছে রাজস্ব বোর্ড।

সম্প্রতি এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তামাক খাতে নজরদারি বাড়ানো, সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করা, কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপন এবং ৬৬ হাজার করদাতার অডিট দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব জড়িত ২৩টি বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে ভ্যাট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বড় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন কেবল তারাই ভ্যাট দেন। খুচরাসহ অনেক খাতে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আছে, সেখানে বড় একটি অংশের মধ্যে ফাঁকির প্রবণতা আছে। ফাঁকি কমানো সম্ভব হলে বিশাল অঙ্কের বাড়তি ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ভ্যাট ফাঁকির অনেক তথ্য আমরা দেখছি গণমাধ্যমে। আবাসন খাতে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে যে ধরনের গরমিল রয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো উদঘাটন করা গেলে এখাত থেকে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট আদায় করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, আন্দোলন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক কর্মকর্তা বড় ধরনের অভিযান পরিচালনায় আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে ‘টিম এনবিআর’ হিসেবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক- এই তিনটি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। ৬ লাখ কোটি টাকা আহরণের রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। বিভেদ ভুলে টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করলে এবং রাজস্ব ফাঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলে ৬ লাখ কোটি টাকা আদায় করাও সম্ভব বলে মনে করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হলেও কর ফাঁকি কমাতে পারলে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা গেলে বর্তমান সংগ্রহ অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, চলতি অর্থবছর এনবিআরের সামনে অনেক বড় রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজস্ব আহরণে এনবিআর নানান উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। করফাঁকি রোধে এনবিআর ব্যবস্থা নেবে, তবে তা যেন হয়রানির মাধ্যম না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্ব বাড়বে। এক্ষেত্রে এনবিআরকে অটোমেশনের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে বিএনপি-এনসিপির মুখোমুখি অবস্থান, উত্তেজনা

রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্য, কর ফাঁকি ঠেকাতে মাঠে এনবিআর

আপডেট সময় ০৫:০২:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ। স্বাধীনতার পর এবারই সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এই লক্ষ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর হচ্ছে এনবিআর। বিশেষ নজরদারি এবং বড় কর ফাঁকি উদঘাটনের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর আহসান হাবিব একাধিক বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এসব বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, করজাল বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধ করার মতো বিষয়।

জানা গেছে, কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে এবারই প্রথম মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে একাধিক কর্মকর্তাকে এপ্রিসিয়েশন লেটার বা ভালো কাজের প্রশংসাপত্র পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তাদের নিয়মিত ব্রিফ করছেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর ও ভ্যাট ফাঁকি রোধে মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে উৎসে কর (টিডিএস) যথাযথভাবে কর্তন ও জমা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। তবে এসব পদক্ষেপ ঘিরে ব্যবসায়ী সমাজে উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, অটোমেশন ছাড়া কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে হয়রানি ও দুর্নীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

গত ১৯ জুলাই এনবিআরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উৎসে কর আদায় যাচাই করতে কর্মকর্তারা যে কোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আর্থিক নথি, কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা করা যাবে। এমনকি প্রয়োজন হলে ইলেকট্রনিক তথ্য সাময়িকভাবে জব্দ করারও ক্ষমতা থাকবে। পরিদর্শনে বাধা দিলে আয়কর আইনের ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই ক্ষমতার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের হয়রানি নয়, বরং যারা উৎসে কর কর্তন করেও সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না কিংবা তথ্য গোপন করছেন, তাদের চিহ্নিত করা। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে অভিযোগ জানানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল-আমিন শেখ বলেন, ধারা ১৪৭ সংক্রান্ত যে কোনো হয়রানি, অস্পষ্টতা কিংবা সংক্ষুব্ধতায় সরাসরি এনবিআরের ১৪৭ ধারা সংক্রান্ত কমিটির সদস্যসচিব বরাবর ই-মেইলে জানানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত নয়। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের মতে, টিডিএস ব্যবসায়ীদের কর নয়; তারা কেবল সরকারের হয়ে কর সংগ্রহ করে। তাই এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো সুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা গেলে তার অপব্যবহারের আশঙ্কাই বেশি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো টিডিএস সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। এমন অবস্থায় নথিপত্র ও কম্পিউটার জব্দের মতো ক্ষমতা প্রয়োগ ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর হবে।

রাজস্ব আদায়ের বড় অংশ আসবে ভ্যাট খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর এরই মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাসে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন রয়েছে এবং ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকি বেশি— এমন প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট প্রদানকারী প্রায় ২ হাজার বড় করদাতার ওপরও আলাদা নজরদারি চালিয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যান্য উৎস মিলিয়ে শুধু ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটনের মাধ্যমেই অতিরিক্ত ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।

শুধু ভ্যাট নয়, প্রয়োগমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট ৯৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি, বকেয়া আদায় থেকে ১৪ হাজার কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি এবং স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির কারণে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আসবে বলে আশা করছে রাজস্ব বোর্ড।

সম্প্রতি এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তামাক খাতে নজরদারি বাড়ানো, সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করা, কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপন এবং ৬৬ হাজার করদাতার অডিট দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব জড়িত ২৩টি বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে ভ্যাট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বড় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন কেবল তারাই ভ্যাট দেন। খুচরাসহ অনেক খাতে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আছে, সেখানে বড় একটি অংশের মধ্যে ফাঁকির প্রবণতা আছে। ফাঁকি কমানো সম্ভব হলে বিশাল অঙ্কের বাড়তি ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ভ্যাট ফাঁকির অনেক তথ্য আমরা দেখছি গণমাধ্যমে। আবাসন খাতে সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে যে ধরনের গরমিল রয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো উদঘাটন করা গেলে এখাত থেকে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট আদায় করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, আন্দোলন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক কর্মকর্তা বড় ধরনের অভিযান পরিচালনায় আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে ‘টিম এনবিআর’ হিসেবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক- এই তিনটি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। ৬ লাখ কোটি টাকা আহরণের রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। বিভেদ ভুলে টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করলে এবং রাজস্ব ফাঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলে ৬ লাখ কোটি টাকা আদায় করাও সম্ভব বলে মনে করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হলেও কর ফাঁকি কমাতে পারলে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা গেলে বর্তমান সংগ্রহ অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, চলতি অর্থবছর এনবিআরের সামনে অনেক বড় রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজস্ব আহরণে এনবিআর নানান উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। করফাঁকি রোধে এনবিআর ব্যবস্থা নেবে, তবে তা যেন হয়রানির মাধ্যম না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে রাজস্ব বাড়বে। এক্ষেত্রে এনবিআরকে অটোমেশনের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ