জুলাইয়ের শেষভাগে এসে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল একটিই- যেকোনো মূল্যে গণমানুষের এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়া। সারা দেশে তখন কারফিউ, মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে চলছে সাঁড়াশি ‘ব্লক রেইড’। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করার পরও যখন শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরানো যাচ্ছিল না, তখন স্বৈরাচারী শাসক বেছে নেয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে কদর্য হাতিয়ার- গুম, গ্রেপ্তার ও হেফাজতে নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই দিনটি ছিল সেই ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুরতা ও ছাত্র-জনতার আপসহীন লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক দলিল।
রিমান্ড সেল ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রহসন
২৬ জুলাই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে। এর ২৪ ঘণ্টার মাথায়, ২৭ জুলাই হেফাজতে নেওয়া হয় আরও দুই সমন্বয়ক- সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে।
ডিবি কার্যালয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ হাসিমুখে নিরাপত্তা দেওয়ার গল্প শোনালেও মূল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। পরবর্তীতে সারজিস আলমের জবানবন্দিতে উঠে আসে সেই বীভৎস স্মৃতিকথা। টয়লেটের পাশে ছোট একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখে, ঘুমোতে না দিয়ে, মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করে জোরপূর্বক ‘আন্দোলন প্রত্যাহার’-এর জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ডিবি পুলিশ যাকে ‘হেফাজত ও নিরাপত্তা’ বলছিল, তা ছিল মূলত মুক্তিকামী তরুণদের ওপর চালানো এক নৃশংস মনস্তাত্ত্বিক স্ট্র্যাটেজি।
শাসকের দাম্ভিকতা
এদিকে যখন রাজপথে লাশের সারি বড় হচ্ছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) গিয়ে প্রকাশ করেন শাসকের চিরাচরিত দাম্ভিকতা। আহতদের ক্ষতচিহ্ন দেখে দুঃখপ্রকাশের বদলে তিনি প্রশ্ন তোলেন- ‘দেশকে অস্থিতিশীল করে আবার ভিক্ষুকের জাতি বানানোর চক্রান্ত হচ্ছে কি না।’ অপরদিকে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উসকানিমূলক বক্তব্যে বিএনপি-জামায়াতকে রাজনীতি থেকে বিতাড়নের ডাক দেন।
ফ্যাসিবাদের এই বক্তব্যের জবাবে তৎকালীন বিরোধী দলগুলোও তোপ দাগে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারি করে সরকার মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছে। একই দিনে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য হিন্দু-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দেন- এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচন, কারণ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, শাসকগোষ্ঠী নয়।
ধ্বংসস্তূপ ও বিদেশি চাপ
২৭ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১১ দিনে স্বৈরাচারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয় ৯ হাজার ১২১ জনেরও বেশি মানুষ। শুধু ঢাকাতেই গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৩৬ জনে। সরকারি খাতায় নিহতের সংখ্যা ২১০ ছাড়িয়ে গেলেও সমন্বয়কদের দেওয়া তথ্যমতে সংঘাত-সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা ততদিনে ২৬৬ অতিক্রম করেছিল। পুরো দেশটা যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল কারাগারে।
এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও দমনপীড়নে বিশ্ব বিবেক কেঁপে ওঠে। ২৭ জুলাই ঢাকায় অবস্থিত ১৪টি পশ্চিমা ও মিত্র দেশের মিশন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) যৌথভাবে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে উদ্বেগ বার্তা পাঠায়। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগ বন্ধ: অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে।
স্বাধীন তদন্ত: প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত হতে হবে।
ডিজিটাল অবরোধ প্রত্যাহার: অবিলম্বে ইন্টারনেট সেবা চালু করতে হবে।
একই সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের কাছে ১৪০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশে চলমান গণহত্যা বন্ধে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানান।
২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
নেতাদের তুলে নিয়ে, অগণিত মামলা দিয়ে আর সাঁজোয়া যান নামিয়েও ফ্যাসিবাদের শেষ রক্ষা হয়নি। ২৭ জুলাই রাতে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন সমন্বয়করা সরকারকে স্পষ্ট ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন।
তাদের ৩ দফা দাবি ছিল সুনির্দিষ্ট:
১. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডিবি হেফাজতে থাকা নাহিদ, আসিফ, সারজিসসহ আটক সব সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীর নিঃশর্ত মুক্তি।
২. শিক্ষার্থীদের নামে দেওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
৩. ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার সাথে জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সকলকে আইনের আওতায় আনা।
একই সাথে তারা সারা দেশে ‘হেলথ ফোর্স’ (আহত-নিহতদের সহায়তায়) এবং ‘লিগ্যাল ফোর্স’ (আইনি লড়াইয়ের জন্য) গঠনের ঘোষণা দেন। দেয়াল লিখন, ডিজিটাল প্রচারণায় রাজপথ আর স্ক্রিন- দুটোই তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যায়।
২৭ জুলাই ছিল এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেদিন শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল সমন্বয়কদের আটকে রেখে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া গেছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, ততক্ষণে এই আন্দোলন আর গুটিপয় সমন্বয়কের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল গণমানুষের এক দাবানলে। শাসকের বন্দুকের নল, ডিবির টর্চার সেল আর কারফিউর দেয়াল ভেঙে ছাত্র-জনতা প্রমান করেছিল- শেকল ভাঙার এই লড়াই আর থামার নয়।
বাংলা৭১নিউজ/এসিএইচবি






















