বাংলাদেশ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গুঞ্জনের যে মেঘ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, অবশেষে তা রূপ নিল ইতিহাসের এক সুনির্দিষ্ট ও অনিবার্য পরিণতিতে। নানা জল্পনা-কল্পনা, রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিতর্কের ঝড় সামলে অবশেষে রাষ্ট্রপ্রধানের রক্তিম আলো-ঝলমলে বঙ্গভবনের দীর্ঘ বারান্দা থেকে বিদায় নিতে হলো সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার মনোনীত দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনকে। সোয়া তিন বছরের মাথায় এসে “স্বাস্থ্যগত অসামর্থ্য” ও দূরারোগ্য ব্যাধির কারণ দেখিয়ে স্পিকারের দরবারে জমা হলো তাঁর পদত্যাগপত্র। এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এক ঝঞ্ঝাবাজ অধ্যায়ের যেমন যবনিকাপাত ঘটল, তেমনি সংবিধানে বর্ণিত ধারাপাত মেনে রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অভিভাবকত্ব গ্রহণ করলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর-বিক্রম।
অসুস্থতার আবেদনপত্র ও নীরব প্রস্থান
শুক্রবার শেষ বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের হাতে পৌঁছায় প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মারফত পাঠানো পদত্যাগপত্র। চিঠির ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে বিদায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের শরীর ও মনের ক্লান্তি। হৃৎযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতার পাশাপাশি সম্প্রতি ধরা পড়েছে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক এক জটিল স্নায়ুরোগ- যা মানুষকে মুহূর্তেই ঠেলে দেয় ক্ষণিক সচেতনতাহীন এক ঘোরলাগা জগতের দিকে।
সাংবিধানিক দস্তাবেজে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট নিজের নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের কথা স্মরণ করালেও অন্তরালের রাজনীতি যেন ভিন্ন সুর বাজাচ্ছিল। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর স্পিকার স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান- বিদায়ী প্রেসিডেন্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী মাফিয়া আমলের ধারাবাহিকতায় মনোনীত হলেও জনগণের রায়ে নির্বাচিত বর্তমান নতুন সরকারের প্রতি তিনি সর্বদাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তবে আনুষ্ঠানিকতার পাঠ চুকিয়ে খুব শীঘ্রই বঙ্গভবনের সীমানা পেরিয়ে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফিরে যাচ্ছেন তিনি; চিকিৎসার প্রয়োজনে আকাশপথে উড়াল দিতে পারেন সুদূর বিদেশেও।
বঙ্গভবনে বিশেষ সঙ্কেত
কেন হঠাৎ দেড় বছর মেয়াদ বাকি থাকতেই রাষ্ট্রপ্রধানকে বেছে নিতে হলো পদত্যাগের পথ? রাজনৈতিক অন্দরের সূত্রগুলোর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘেরাও ও অপসারণের উত্তাল দাবি সামলে ওঠা গেলেও সম্প্রতি লন্ডনে চিকিৎসার নামে সফরের সময় তৈরি হয় জটিলতা। সেখানে অবস্থানকালে দিল্লিতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তিনি এক গোপন ফোনালাপে যুক্ত হন বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে আসে।
সংবিধানের শপথ ও দায়িত্বের সঙ্গে এই যোগাযোগ চরম অসঙ্গতিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়। এরপরই সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে পাঠানো হয় এক অলিখিত কিন্তু কঠোর সঙ্কেত- ‘জুলাই শেষের আগেই পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা শ্রেয়।’ এই সঙ্কেত পাওয়ার পরই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার চিঠি দিয়েই বিদায় নিশ্চিত করতে হয় মো. সাহাবুদ্দিনকে।
বিচার ও আইনি দায়বদ্ধতা
প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিলেও রাজপথ ও বিরোধী রাজনৈতিক মহলে বইছে তীব্র ক্ষোভের হাওয়া। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ২০১৬ সালের ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন’ অনুযায়ী আজীবন পেনশন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেলেও রাজনীতির চত্বর তাকে সহজ সুযোগ দিতে নারাজ।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকে উঠে এসেছে কঠোর বার্তা। “স্বৈরাচারের এই শেষ সোপানকেও কোনোরূপ নিরাপদ প্রস্থান (সেফ এক্সিট) না দিয়ে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে”- রাজপথে এমনই গর্জন তুলে শাহবাগে মিছিল ও আলটিমেটাম দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চসহ নানা ছাত্র-যুব সংগঠন। তাঁদের মতে, অভ্যুত্থানের শহীদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই ফ্যাসিবাদের দোসরকে দেশের প্রচলিত আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন মূল গণদাবি।
স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পরপরই ৫৪ অনুচ্ছেদের আইনি বিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির চেয়ারে আসীন হয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির সুযোগ নেই। সংবিধানের নির্ধারিত ধারাপাত অনুসরণ করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদ বেছে নেবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রধানকে। দুই মাস পর হতে যাওয়া সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে বা তারও আগে জরুরি অধিবেশন ডেকে সমাপ্ত করা হতে পারে এই ঐতিহাসিক আনুষ্ঠানিকতা।
পদত্যাগপত্রে যা লিখলেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি
স্পিকারের কাছে পাঠানো রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রের পুরো বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে পড়ে শোনানো হয়। চিঠিতে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন:
“আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪শে এপ্রিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ৫ই আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।
নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (Autonomic Neuropathy) নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগ সমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে প্রেসিডেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।”
কে হচ্ছেন ২৩তম রাষ্ট্রপতি
রাজনীতির ধোঁয়াশা ঘনীভূত হচ্ছে বঙ্গভবনের পরবর্তী প্রধানকে ঘিরে। একটি নতুন নির্বাচন আয়োজনের গুরুদায়িত্ব সামলাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল কি বেছে নেবে কোনো ঝানু রাজনীতিবিদ, নাকি কোনো অভিজ্ঞ আমলাকে পাঠানো হবে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদে?
নীতিনির্ধারণী মহলের জোরালো বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. আব্দুল মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খানের মতো হেভিওয়েট নামগুলো। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অতীত ইতিহাস বিবেচনায় রেখে শেষ পর্যন্ত কার মাথায় উঠতে যাচ্ছে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির মর্যাদা- তা দেখার জন্য এখন ব্যাকুল প্রতীক্ষায় পুরো বাংলাদেশ।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















