ঢাকা ০৪:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পদ্মাপাড়ের সেই ছেলেটি

মঞ্চে খেটে খাওয়া মানুষের জয়গান: সাধারণের উঠোনে অনন্য বিজন

বাংলা নাটকের সনাতন খোলস ভেঙে যিনি থিয়েটারকে নিয়ে গিয়েছিলেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের উঠোনে, তিনি বিজন ভট্টাচার্য। ১৯১৫ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন ফরিদপুর (বর্তমানে রাজবাড়ী) জেলার খানখানাপুরে এই মহান নাট্যব্যক্তিত্বের জন্ম। আজ তাঁর জন্মদিনে বাংলা নাট্যজগৎ তথা এদেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে। রাজা-বাদশাহ আর কাল্পনিক উপাখ্যানের বলয় থেকে নাটককে বের করে এনে যিনি পঞ্চাশের মন্বন্তর, কৃষকের কান্না আর মেহনতি মানুষের অধিকারকে নাটকের মূল উপজীব্য করেছিলেন, তিনিই বিজন ভট্টাচার্য।

জন্ম ও বেড়ে উঠা

বিজন ভট্টাচার্যের জন্ম ও শৈশব কেটেছে পদ্মাপাড়ের গ্রামীণ পরিমণ্ডলে। তাঁর বাবা ক্ষীরোদবিহারী ভট্টাচার্য ছিলেন একজন শিক্ষক এবং সংস্কৃতিমনা মানুষ। গ্রামীণ জীবনের এই নিবিড় স্পর্শ, লোকসংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাঁর শৈশবেই ঘটেছিল। পরবর্তীকালে কলকাতার আশুতোষ কলেজ ও রিপন কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি ছাপিয়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইটাই তাঁর জীবনের মূল পাঠশালা হয়ে ওঠে।

সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনা

বিজন ভট্টাচার্যের জীবন ছিল আপসহীন সংগ্রামের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে যখন অবিভক্ত বাংলায় দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শোষণ আর সাম্প্রদায়িকতার কালো ছায়া গ্রাস করছিল, তখন তিনি নিজেকে সঁপে দেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় তিনি রাজপথে নেমে এসেছিলেন মানুষের সেবায়। এই মন্বন্তর তাঁর মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে তাঁর লেখনীর প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রগতিশীল লেখক সংঘ এবং পরবর্তীতে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’- এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। নিজের বিশ্বাসকে বাঁচাতে গিয়ে আজীবন আর্থিক অনটন ও রাষ্ট্রীয় কোপানলের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে।

বাংলা নাটকের রূপান্তর

বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিজন ভট্টাচার্য একটি মোড় পরিবর্তনকারী নাম। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় নব্যনাট্য আন্দোলন। ১৯৪৪ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার ‘শ্রীরঙ্গম’ মঞ্চে প্রথম অভিনীত হয় বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকটি। এটি কেবল একটি সাধারণ নাটক ছিল না, এটি ছিল বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। এর পর থেকেই বাংলা নাটকের গতিপথ পুরোপুরি বদলে যায়।

রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট: ‘নবান্ন’ নাটকটির সৃষ্টি হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম কালো এক অধ্যায়ের গর্ভ থেকে। নাটকের মূল পটভূমি ছিল ১৩৫০ বঙ্গাব্দের (ইংরেজি ১৯৪৩ সাল) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়।

ঔপনিবেশিক নীতি: এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুর নীতি, চাল বাজেয়াপ্তকরণ, এবং চালকল মালিক ও মজুতদারদের অতিমুনাফার লোভের কারণে কৃত্রিম এই সংকট তৈরি হয়েছিল।

কৃষক সমাজের চরম বিপর্যয়: বাংলার চিরন্তন উৎসব ‘নবান্ন’ (নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসব) কর্পূরের মতো উড়ে যায়। ক্ষুধার তাড়নায় গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং লাখ লাখ কৃষক জমিজমা হারিয়ে কলকাতার ফুটপাতে এসে “ফ্যান দাও” বলে চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

নায়ক হিসেবে সাধারণ কৃষক: এর আগে নাটকের প্রধান চরিত্র হতো রাজা, মহারাজা বা উচ্চবিত্ত শিক্ষিত সমাজ। ‘নবান্ন’ প্রথম দেখাল যে, অজপাড়াগাঁয়ের জরাজীর্ণ কৃষক ‘প্রধান সমাদ্দার’ বা ‘দয়াল’ একটি নাটকের মূল নায়ক হতে পারে। প্রান্তিক মেহনতি মানুষের কান্নাই হয়ে উঠল মঞ্চের মূল আকর্ষণ।

কথ্য ভাষার প্রবর্তন: নাটকে কৃত্রিম সাধু বা চলিত ভাষার বদলে মেদিনীপুর ও পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মানুষের আঞ্চলিক উপভাষাকে হুবহু মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। এর ফলে নাটকটি সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণভাবে জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত মনে হয়েছিল।

গণমুখী থিয়েটারের সূচনা: ‘নবান্ন’ প্রাবন্ধিক বা বাণিজ্যিক থিয়েটারের ধারণা বদলে দেয়। টিকিট বিক্রির টাকা মন্বন্তর-পীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে পাঠানো হয়েছিল। এই নাটকটি দিয়েই বাংলায় “নব্যনাট্য আন্দোলন” বা নবনাট্য আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, যা থিয়েটারকে বিনোদনের খোরাক থেকে সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করে।

অসাম্প্রদায়িক নীতি 

বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন আগাগোড়া একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা কিংবা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ—কোনো কিছুই তাঁর মানবিক চেতনাকে টলাতে পারেনি। ধর্ম কিংবা জাতের ভিত্তিতে নয়, তিনি মানুষকে দেখেছেন শোষক আর শোষিত—এই দুই ভাগে। তাঁর দেশপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না; শৃঙ্খলিত স্বদেশের মুক্তির পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিই ছিল তাঁর দেশপ্রেমের মূল ভিত্তি। নিজের জন্মভূমি পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) প্রতি তাঁর ছিল আজীবন এক নাড়ির টান, যা তাঁর বিভিন্ন নাটকের সংলাপে ও আবহে বারবার ফিরে এসেছে।

পারিবারিক জীবন ও মূল্যায়ন

বিজন ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। সমকালীন সমাজবাস্তবতা ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের যে দর্শন বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে ছিল, মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যেও তার এক গভীর প্রতিফলন দেখা যায়। এই যুগলের পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যও পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম শক্তিশালী ও দ্রোহী ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যার লেখনীতে প্রথাগত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছিল।

নাট্যসমালোচক ও ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে বিজন ভট্টাচার্যের মূল্যায়ন অনন্য। বাংলা নাটকের আধুনিকায়নে তাঁর অবদান কালজয়ী। নাগরিক সমাজ যখন গ্রামীণ সর্বহারাদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল, তখন তিনি মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে নাটককে বের করে প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতিকে মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। কাল্পনিক রোমান্টিকতা বর্জন করে চরম রূঢ় বাস্তবতাকে শিল্পসম্মত উপায়ে উপস্থাপন করার কারণে তাঁকে বাংলা থিয়েটারের প্রথম সার্থক আধুনিকতাবাদী বলা হয়। নাটককে কেবল বিনোদনের মাধ্যম না রেখে, সমাজ পরিবর্তনের ও প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করার এই ঐতিহাসিক কৃতিত্ব বিজন ভট্টাচার্যকে শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক ও চিরভাস্বর করে রেখেছে।

শেষ জীবন ও বিদায়

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থিয়েটার ও মানুষের অধিকারের কথাই ভেবেছেন এই রূপকার। চরম দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের আদর্শ থেকে এক চুলও নড়েননি। ১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় এই মহান নাট্যযোদ্ধা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজ তাঁর ১১১তম জন্মদিনে তাঁর রেখে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী নাট্যভাবনাকে এদেশের মানুষ বুকে ধারণ করে রেখেছে। গণমানুষের এই মহান শিল্পীর জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

পদ্মাপাড়ের সেই ছেলেটি

মঞ্চে খেটে খাওয়া মানুষের জয়গান: সাধারণের উঠোনে অনন্য বিজন

আপডেট সময় ০৩:০১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

বাংলা নাটকের সনাতন খোলস ভেঙে যিনি থিয়েটারকে নিয়ে গিয়েছিলেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের উঠোনে, তিনি বিজন ভট্টাচার্য। ১৯১৫ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন ফরিদপুর (বর্তমানে রাজবাড়ী) জেলার খানখানাপুরে এই মহান নাট্যব্যক্তিত্বের জন্ম। আজ তাঁর জন্মদিনে বাংলা নাট্যজগৎ তথা এদেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে। রাজা-বাদশাহ আর কাল্পনিক উপাখ্যানের বলয় থেকে নাটককে বের করে এনে যিনি পঞ্চাশের মন্বন্তর, কৃষকের কান্না আর মেহনতি মানুষের অধিকারকে নাটকের মূল উপজীব্য করেছিলেন, তিনিই বিজন ভট্টাচার্য।

জন্ম ও বেড়ে উঠা

বিজন ভট্টাচার্যের জন্ম ও শৈশব কেটেছে পদ্মাপাড়ের গ্রামীণ পরিমণ্ডলে। তাঁর বাবা ক্ষীরোদবিহারী ভট্টাচার্য ছিলেন একজন শিক্ষক এবং সংস্কৃতিমনা মানুষ। গ্রামীণ জীবনের এই নিবিড় স্পর্শ, লোকসংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাঁর শৈশবেই ঘটেছিল। পরবর্তীকালে কলকাতার আশুতোষ কলেজ ও রিপন কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি ছাপিয়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইটাই তাঁর জীবনের মূল পাঠশালা হয়ে ওঠে।

সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনা

বিজন ভট্টাচার্যের জীবন ছিল আপসহীন সংগ্রামের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে যখন অবিভক্ত বাংলায় দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শোষণ আর সাম্প্রদায়িকতার কালো ছায়া গ্রাস করছিল, তখন তিনি নিজেকে সঁপে দেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় তিনি রাজপথে নেমে এসেছিলেন মানুষের সেবায়। এই মন্বন্তর তাঁর মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে তাঁর লেখনীর প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রগতিশীল লেখক সংঘ এবং পরবর্তীতে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’- এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। নিজের বিশ্বাসকে বাঁচাতে গিয়ে আজীবন আর্থিক অনটন ও রাষ্ট্রীয় কোপানলের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে।

বাংলা নাটকের রূপান্তর

বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিজন ভট্টাচার্য একটি মোড় পরিবর্তনকারী নাম। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় নব্যনাট্য আন্দোলন। ১৯৪৪ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার ‘শ্রীরঙ্গম’ মঞ্চে প্রথম অভিনীত হয় বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকটি। এটি কেবল একটি সাধারণ নাটক ছিল না, এটি ছিল বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। এর পর থেকেই বাংলা নাটকের গতিপথ পুরোপুরি বদলে যায়।

রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট: ‘নবান্ন’ নাটকটির সৃষ্টি হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম কালো এক অধ্যায়ের গর্ভ থেকে। নাটকের মূল পটভূমি ছিল ১৩৫০ বঙ্গাব্দের (ইংরেজি ১৯৪৩ সাল) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যায়।

ঔপনিবেশিক নীতি: এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুর নীতি, চাল বাজেয়াপ্তকরণ, এবং চালকল মালিক ও মজুতদারদের অতিমুনাফার লোভের কারণে কৃত্রিম এই সংকট তৈরি হয়েছিল।

কৃষক সমাজের চরম বিপর্যয়: বাংলার চিরন্তন উৎসব ‘নবান্ন’ (নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসব) কর্পূরের মতো উড়ে যায়। ক্ষুধার তাড়নায় গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং লাখ লাখ কৃষক জমিজমা হারিয়ে কলকাতার ফুটপাতে এসে “ফ্যান দাও” বলে চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

নায়ক হিসেবে সাধারণ কৃষক: এর আগে নাটকের প্রধান চরিত্র হতো রাজা, মহারাজা বা উচ্চবিত্ত শিক্ষিত সমাজ। ‘নবান্ন’ প্রথম দেখাল যে, অজপাড়াগাঁয়ের জরাজীর্ণ কৃষক ‘প্রধান সমাদ্দার’ বা ‘দয়াল’ একটি নাটকের মূল নায়ক হতে পারে। প্রান্তিক মেহনতি মানুষের কান্নাই হয়ে উঠল মঞ্চের মূল আকর্ষণ।

কথ্য ভাষার প্রবর্তন: নাটকে কৃত্রিম সাধু বা চলিত ভাষার বদলে মেদিনীপুর ও পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মানুষের আঞ্চলিক উপভাষাকে হুবহু মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। এর ফলে নাটকটি সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণভাবে জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত মনে হয়েছিল।

গণমুখী থিয়েটারের সূচনা: ‘নবান্ন’ প্রাবন্ধিক বা বাণিজ্যিক থিয়েটারের ধারণা বদলে দেয়। টিকিট বিক্রির টাকা মন্বন্তর-পীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে পাঠানো হয়েছিল। এই নাটকটি দিয়েই বাংলায় “নব্যনাট্য আন্দোলন” বা নবনাট্য আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, যা থিয়েটারকে বিনোদনের খোরাক থেকে সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করে।

অসাম্প্রদায়িক নীতি 

বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন আগাগোড়া একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা কিংবা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ—কোনো কিছুই তাঁর মানবিক চেতনাকে টলাতে পারেনি। ধর্ম কিংবা জাতের ভিত্তিতে নয়, তিনি মানুষকে দেখেছেন শোষক আর শোষিত—এই দুই ভাগে। তাঁর দেশপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না; শৃঙ্খলিত স্বদেশের মুক্তির পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তিই ছিল তাঁর দেশপ্রেমের মূল ভিত্তি। নিজের জন্মভূমি পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) প্রতি তাঁর ছিল আজীবন এক নাড়ির টান, যা তাঁর বিভিন্ন নাটকের সংলাপে ও আবহে বারবার ফিরে এসেছে।

পারিবারিক জীবন ও মূল্যায়ন

বিজন ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। সমকালীন সমাজবাস্তবতা ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের যে দর্শন বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে ছিল, মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যেও তার এক গভীর প্রতিফলন দেখা যায়। এই যুগলের পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যও পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম শক্তিশালী ও দ্রোহী ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যার লেখনীতে প্রথাগত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছিল।

নাট্যসমালোচক ও ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে বিজন ভট্টাচার্যের মূল্যায়ন অনন্য। বাংলা নাটকের আধুনিকায়নে তাঁর অবদান কালজয়ী। নাগরিক সমাজ যখন গ্রামীণ সর্বহারাদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল, তখন তিনি মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে নাটককে বের করে প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতিকে মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। কাল্পনিক রোমান্টিকতা বর্জন করে চরম রূঢ় বাস্তবতাকে শিল্পসম্মত উপায়ে উপস্থাপন করার কারণে তাঁকে বাংলা থিয়েটারের প্রথম সার্থক আধুনিকতাবাদী বলা হয়। নাটককে কেবল বিনোদনের মাধ্যম না রেখে, সমাজ পরিবর্তনের ও প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করার এই ঐতিহাসিক কৃতিত্ব বিজন ভট্টাচার্যকে শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক ও চিরভাস্বর করে রেখেছে।

শেষ জীবন ও বিদায়

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থিয়েটার ও মানুষের অধিকারের কথাই ভেবেছেন এই রূপকার। চরম দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের আদর্শ থেকে এক চুলও নড়েননি। ১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় এই মহান নাট্যযোদ্ধা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজ তাঁর ১১১তম জন্মদিনে তাঁর রেখে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী নাট্যভাবনাকে এদেশের মানুষ বুকে ধারণ করে রেখেছে। গণমানুষের এই মহান শিল্পীর জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি