ঢাকা ০৬:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি বন্দিশালায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, ভুক্তভোগী জানালেন ভয়াবহ তথ্য

ইসরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন গাজাগামী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহর (ফ্লোটিলা)-এর সদস্য ও ফিলিস্তিনপন্থি জার্মান অধিকারকর্মী অ্যানা লিডকে। তার দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং ইসরায়েলে দায়ের করা ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেআইনিভাবে তৃতীয় দফা দেহ তল্লাশির সময় কারারক্ষীরা তাকে জোরপূর্বক হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চিৎকার থামাতে তার মুখ চেপে ধরা হয় এবং পরে তাকে ধর্ষণ করা হয়।

বুধবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। লিডকের দাবি, নির্যাতনের সময় তিনি পুরুষ কারারক্ষীদের হাসির শব্দ শুনতে পান। তার ধারণা, তারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং সম্ভবত ভিডিওও ধারণ করছিলেন। ঘটনাস্থলটি একটি আংশিক টানা পর্দা দিয়ে আলাদা করা হলেও সেটি খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

২৫ বছর বয়সী লিডকে গত শরতে ইউরোপ থেকে গাজাগামী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহরে যোগ দেন। ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নৌযান আটক করে। পরে তাকে ইসরায়েলে নিয়ে গিয়ে পাঁচ দিন আটক রাখা হয়।

লিডকের ভাষ্য, ফ্লোটিলার কর্মীদের ওপর ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা। গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায় এবং আমাদের চুপ করাতে চায়। তারা আমাদের এমন এক ট্রমার মধ্যে ফেলতে চায়, যাতে আমরা আর কখনো ফিলিস্তিন নিয়ে কথা না বলি।’

নির্যাতনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি বিষয়টি বন্ধু ও চিকিৎসকদের জানান। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি হেফাজতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা প্রথম ফ্লোটিলা কর্মী ছিলেন লিডকে। পরে আরও এক ডজনের বেশি কর্মী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুললেও তাদের অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশ করেননি।

লিডকের পক্ষে ইসরায়েলে তার আইনজীবীরা অভিযোগের তদন্ত চেয়ে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছেন। ইসরায়েলি আইনে সম্মতি ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে লিডকে বলেন, ‘আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা যদি চুপ থাকি, তাহলে তারা অন্য কারও সঙ্গেও একই কাজ করবে।’

অভিযোগপত্রটি ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, দেশটির কারা কর্তৃপক্ষের আইনি উপদেষ্টা, কারারক্ষী তদন্ত বিভাগ (ইয়াহাস) এবং গিভন কারাগারের কমান্ডারের কাছে পাঠানো হয়েছে। লিডকের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, এ উদ্যোগের লক্ষ্য ইসরায়েলে বন্দি নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে চ্যালেঞ্জ করা।

ইসরায়েলে কর্মরত ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আদালাহ-এর আইনজীবী হাদ্দাদ বলেন, অ্যানা লিডকে ন্যায়বিচার চান এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সব ধরনের আইনি পথ ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তদন্তের দাবিতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিও তারা পর্যবেক্ষণ করবেন।

তার দাবি, গত প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের অভিযোগ উঠে আসছে এবং এখন এর বিস্তার আরও বেড়েছে। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করা হচ্ছে।

লিডকে বলেন, ‘আমি মনে করি না, শুধু মুখ খুললেই কারাগারে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারী হিসেবে এ বিষয়ে কথা বলা আমার দায়িত্ব। আমি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ফিলিস্তিনি বন্দিরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, আমার ওপর হওয়া নির্যাতন তার চেয়ে অনেক কম।’

তিনি জানান, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ইতালি থেকে প্রায় ১০০ কর্মীর সঙ্গে বড় একটি ফেরিতে যাত্রা শুরুর আগে আগের ফ্লোটিলা সদস্যদের কাছ থেকে তিনি ইসরায়েলি হেফাজতে সম্ভাব্য সহিংসতা, এমনকি যৌন নিপীড়নের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এমন অভিজ্ঞতার জন্য আগে থেকে প্রস্তুত হওয়া প্রায় অসম্ভব।

বাংলা৭১নিউজ/এবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েলি বন্দিশালায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, ভুক্তভোগী জানালেন ভয়াবহ তথ্য

আপডেট সময় ০৪:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

ইসরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন গাজাগামী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহর (ফ্লোটিলা)-এর সদস্য ও ফিলিস্তিনপন্থি জার্মান অধিকারকর্মী অ্যানা লিডকে। তার দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং ইসরায়েলে দায়ের করা ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেআইনিভাবে তৃতীয় দফা দেহ তল্লাশির সময় কারারক্ষীরা তাকে জোরপূর্বক হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চিৎকার থামাতে তার মুখ চেপে ধরা হয় এবং পরে তাকে ধর্ষণ করা হয়।

বুধবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। লিডকের দাবি, নির্যাতনের সময় তিনি পুরুষ কারারক্ষীদের হাসির শব্দ শুনতে পান। তার ধারণা, তারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং সম্ভবত ভিডিওও ধারণ করছিলেন। ঘটনাস্থলটি একটি আংশিক টানা পর্দা দিয়ে আলাদা করা হলেও সেটি খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

২৫ বছর বয়সী লিডকে গত শরতে ইউরোপ থেকে গাজাগামী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহরে যোগ দেন। ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নৌযান আটক করে। পরে তাকে ইসরায়েলে নিয়ে গিয়ে পাঁচ দিন আটক রাখা হয়।

লিডকের ভাষ্য, ফ্লোটিলার কর্মীদের ওপর ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল তাদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা। গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায় এবং আমাদের চুপ করাতে চায়। তারা আমাদের এমন এক ট্রমার মধ্যে ফেলতে চায়, যাতে আমরা আর কখনো ফিলিস্তিন নিয়ে কথা না বলি।’

নির্যাতনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি বিষয়টি বন্ধু ও চিকিৎসকদের জানান। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি হেফাজতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা প্রথম ফ্লোটিলা কর্মী ছিলেন লিডকে। পরে আরও এক ডজনের বেশি কর্মী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুললেও তাদের অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশ করেননি।

লিডকের পক্ষে ইসরায়েলে তার আইনজীবীরা অভিযোগের তদন্ত চেয়ে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছেন। ইসরায়েলি আইনে সম্মতি ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে লিডকে বলেন, ‘আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা যদি চুপ থাকি, তাহলে তারা অন্য কারও সঙ্গেও একই কাজ করবে।’

অভিযোগপত্রটি ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, দেশটির কারা কর্তৃপক্ষের আইনি উপদেষ্টা, কারারক্ষী তদন্ত বিভাগ (ইয়াহাস) এবং গিভন কারাগারের কমান্ডারের কাছে পাঠানো হয়েছে। লিডকের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, এ উদ্যোগের লক্ষ্য ইসরায়েলে বন্দি নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে চ্যালেঞ্জ করা।

ইসরায়েলে কর্মরত ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আদালাহ-এর আইনজীবী হাদ্দাদ বলেন, অ্যানা লিডকে ন্যায়বিচার চান এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সব ধরনের আইনি পথ ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তদন্তের দাবিতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিও তারা পর্যবেক্ষণ করবেন।

তার দাবি, গত প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের অভিযোগ উঠে আসছে এবং এখন এর বিস্তার আরও বেড়েছে। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করা হচ্ছে।

লিডকে বলেন, ‘আমি মনে করি না, শুধু মুখ খুললেই কারাগারে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারী হিসেবে এ বিষয়ে কথা বলা আমার দায়িত্ব। আমি এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ফিলিস্তিনি বন্দিরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, আমার ওপর হওয়া নির্যাতন তার চেয়ে অনেক কম।’

তিনি জানান, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ইতালি থেকে প্রায় ১০০ কর্মীর সঙ্গে বড় একটি ফেরিতে যাত্রা শুরুর আগে আগের ফ্লোটিলা সদস্যদের কাছ থেকে তিনি ইসরায়েলি হেফাজতে সম্ভাব্য সহিংসতা, এমনকি যৌন নিপীড়নের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এমন অভিজ্ঞতার জন্য আগে থেকে প্রস্তুত হওয়া প্রায় অসম্ভব।

বাংলা৭১নিউজ/এবি