ইয়েমেনকে ঘিরে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা, হুথিদের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি এবং লোহিত সাগরে নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। সব মিলিয়ে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের এই সংকট মূলত সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়েরই একটি অংশ। হুথি বিদ্রোহীদের পেছনে ইরানের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে সৌদি আরব। অন্যদিকে হুথিরা নিজেদের ইয়েমেনের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে আসছে।
সানা বিমানবন্দর ঘিরে নতুন উত্তেজনা
সাম্প্রতিক উত্তেজনার শুরু সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালিয়ে একটি ইরানি বিমানকে অবতরণে বাধা দেয়। সরকারের দাবি, ওই বিমানের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং এর মাধ্যমে হুথিদের সহায়তা দেওয়া হতে পারে।
হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
তিনি বলেন, তারা যদি আমাদের বিমানবন্দর বন্ধ করতে পারে, তাহলে আমরাও তাদের বিমানবন্দরে হামলা চালানোর অধিকার রাখি।
এরপর হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, তারা এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
হুথিরা জানিয়েছে, সানা বিমানবন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে তারা আরও পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে তেহরান-সানা বিমান যোগাযোগ চালু রাখার কথাও বলেছে তারা।
কীভাবে শুরু হয়েছিল ইয়েমেন যুদ্ধ?
ইয়েমেনের বর্তমান সংকটের শুরু ২০১৪ সালে। সে সময় হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।
সৌদি আরবের অভিযোগ, হুথিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট একটি প্রক্সি বাহিনী। রিয়াদের আশঙ্কা, ইয়েমেনের মতো কৌশলগত অবস্থানে ইরানের প্রভাব বাড়লে তা সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সিএনএনের সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিক ফ্রানকোনা বলেন, সৌদি আরব হুথিদের ইরানের একটি মিত্র বাহিনী হিসেবে দেখে, যেমন দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে ইরানের মিত্র শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান এবং সুন্নি-প্রধান সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রয়েছে। ইয়েমেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি সংঘাত
২০২২ সালে ইয়েমেনে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে আসে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা এগোয়নি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোদেইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ বিভিন্ন এলাকায় আবারও সামরিক তৎপরতা বেড়েছে।
হোদেইদার হায়েস এলাকায় হুথি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। লোহিত সাগরের কাছে হওয়ায় এই অঞ্চল সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল-জাওফে উপজাতীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে হুথিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি হুথিদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেন সংকট শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ২০২৪ সালে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
জাহাজগুলোকে তখন আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হবে, এতে পরিবহন সময় ও খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানিও ঝুঁকিতে
সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে। এই পাইপলাইন দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পৌঁছে দেয়।
কিন্তু ইয়ানবু বন্দর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠাতে হলে বাব আল-মান্দেব প্রণালী খোলা থাকা জরুরি।
কিন্তু হুথিরা যদি এই নৌপথ বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে—এমন স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে পাল্টাপাল্টি হামলা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং স্থবির শান্তি আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
সৌদি আরব হুথিদের প্রভাব সীমিত রাখতে চায়, আর হুথিরা বিমানবন্দর, নৌপথ ও বন্দি বিনিময়ের মতো বিষয়কে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
ইয়েমেন সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে। আর সেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে।
সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন, রয়টার্স
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ



























