ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ৭ জেলায় বন্যা : ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু বেড়ে ৫৪ Logo মডেল মসজিদ প্রকল্পে দুর্নীতি অত্যন্ত গর্হিত ও ন্যক্কারজনক কাজ Logo ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৩২৭ Logo ভিড়বে ৪ গুণ বড় জাহাজ, মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর Logo নিজেদের পরিবেশ নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী Logo বিদেশি বিনিয়োগে আরও অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলছে সরকার : আইসিটি মন্ত্রী Logo আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তুষ্ট আইএমএফ, নতুন ঋণেও ইতিবাচক অগ্রগতি Logo বন্যা মোকাবিলায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ও ৯ হাজার টন চাল বরাদ্দ Logo ছাত্রশিবির থেকে বিদায় নিলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম Logo কারাগারে বন্দিরা বানাচ্ছেন সাবান, নাম ‘প্রিজন ফ্রেশ’

কারাগারে বন্দিরা বানাচ্ছেন সাবান, নাম ‘প্রিজন ফ্রেশ’

‘রাখিবো নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’ কারাগারের মূলমন্ত্র। কারাবন্দিদের শুধু শাস্তি নয়, সেই আলোর পথে ফেরাতে আরও একধাপ এগিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারে কারখানা স্থাপন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, যেখানে কাজ করছেন বন্দিরাই।

বন্দিদের সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সেখানে চালু হয়েছে একটি অত্যাধুনিক অটো সাবান উৎপাদন কারখানা। কারাগারে উৎপাদিত সাবানের ব্র্যান্ডের নাম রাখা হয়েছে ‘প্রিজন ফ্রেশ’। বর্তমানে উৎপাদন করা হচ্ছে তিন ক্যাটাগরির সাবান।

চলতি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কারখানার উদ্বোধন করা হয়। এতে বন্দিরা কাজে লাগাচ্ছেন কারাভোগের সময়। অর্জন করছেন আধুনিক শিল্প-কারখানায় কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। ফলে মুক্তির পর তৈরি হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা

কারাগারের অভ্যন্তরে স্থাপিত এই বাণিজ্যিক কারখানায় অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বন্দিরা নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন।

কারখানায় প্রথমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও রাসায়নিক উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর সেই মিশ্রণ প্রক্রিয়াজাত করা হয় থ্রি-রোলার মেশিনের মাধ্যমে। পরবর্তী ধাপে প্লোডার মেশিনের সাহায্যে সাবান নির্দিষ্ট আকৃতিতে বের করা হয়।

এরপর সাবানের গায়ে প্রতিষ্ঠানের লোগো বা নির্ধারিত ছাপ বসে। সবশেষ উন্নতমানের প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের উপযোগী করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শিল্প-কারখানার মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।
দক্ষ হচ্ছেন বন্দিরা

কারাগারের এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী বন্দিরা আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, যন্ত্র পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শিল্প নিরাপত্তা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মুক্তির পর কোনো সাবান বা কসমেটিকস কারখানায় চাকরি কিংবা নিজস্ব ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

সরকারের রাজস্ব সাশ্রয়

বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ব্যবহৃত সাবান বাইরে থেকে কিনতে হয়। দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দিদের জন্য সাবানের চাহিদা ৯০ হাজার পিস এবং কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাহিদা ১০ হাজার পিস। মোট ১ লাখ পিস চাহিদা রয়েছে সাবানের।

নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের ফলে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে আরও শক্তিশালী হবে বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করে কারা প্রশাসনের পুনর্বাসন কার্যক্রম। প্রতিটি ‘প্রিজন ফ্রেশ’ সাবানের দাম রাখা হয়েছে ৫০ টাকা।

অবসর সময় কাজে লাগিয়ে আয়

কারাজীবনে বন্দিদের দীর্ঘ সময় অনেক ক্ষেত্রেই কর্মহীনভাবে কাটে। নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই সময়কে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা হয়েছে। কারখানায় কাজের বিনিময়ে বন্দিরা পাচ্ছেন পারিশ্রমিক। মাসে ৫-৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন বন্দিরা।

উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তারা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন এবং একটি অংশ পরিবারের কাছে পাঠানোর সুযোগও রয়েছে। ফলে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একজন বন্দি বলেন, জেলে বসে আমরা শুধু কাজ করছি না, নতুন কিছু শিখছি। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবো। দেশের জন্য কাজ করতে পারবো এবং পরিবারের দায়িত্বও পালন করতে পারব।

এভাবে যদি সব কারাগারে চালু হয় তাহলে বন্দিরা জামিন লাভের পর আর অসৎ কাজ করবে না, সৎ কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করবে বলে মনে করেন তিনি।

পুনর্বাসনে ইতিবাচক ভূমিকা

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের ভেতরে এ ধরনের উৎপাদনমুখী কার্যক্রম বন্দিদের মানসিক পরিবর্তন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কাজের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে মুক্তির পর সমাজে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করা তুলনামূলক সহজ হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত মডেল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারাগারভিত্তিক শিল্প কার্যক্রম বহুদিন ধরেই চালু রয়েছে। সেখানে বন্দিরা আসবাবপত্র, পোশাক, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্পসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন করেন। এসব উদ্যোগ বন্দিদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন ও পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার কমাতে কার্যকর বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশেও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের এ উদ্যোগ সেই আধুনিক পুনর্বাসনমুখী কারা ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন সম্ভাবনার সূচনা

কারা প্রশাসনের এই উদ্যোগ বন্দিদের জন্য কেবল একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, বরং নতুন জীবন শুরু করার একটি বাস্তব প্রস্তুতি। দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, পরিবারের আর্থিক সহায়তা ও সমাজে সম্মানজনকভাবে ফিরে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছে এই সাবান কারখানা।

সংশ্লিষ্টদের আশা, এ ধরনের উৎপাদনমুখী ও পুনর্বাসনভিত্তিক প্রকল্প দেশের অন্য কারাগারেও সম্প্রসারণ করা হলে বন্দিদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি একটি মানবিক ও আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

ঘণ্টায় ১৫শ পিস সাবান উৎপাদন, বাইরে বিক্রির পরিকল্পনা

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ  বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় ১৫শ পিস সাবান উৎপাদন চলছে কারখানায়। এর মাধ্যমে বন্দি, কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কারাগারে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়বে।’

ভবিষ্যতে কারাগারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন  বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল কারাগারকে শুধু বন্দি রাখার জায়গা না বানিয়ে একটি উৎপাদনমুখী ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।’

তিনি বলেন, ‘বন্দিরা এখানে কাজ করে পারিশ্রমিক পাবে, নতুন দক্ষতা অর্জন করবে এবং মুক্তির পর সমাজে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন।’

ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিন ধরনের সাবান উৎপাদন

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন  বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে কারখানায় তিন ধরনের সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। শুরুতে উৎপাদিত সাবান দেশের বিভিন্ন কারাগারের নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। এতে সাশ্রয় হবে সরকারের রাজস্ব।’

পরবর্তীসময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জন্যও বাজারে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

কাশিমপুরে এ প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্য কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারেও একই ধরনের উৎপাদনমুখী শিল্প প্রকল্প চালু করা হবে জানান সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

৭ জেলায় বন্যা : ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু বেড়ে ৫৪

কারাগারে বন্দিরা বানাচ্ছেন সাবান, নাম ‘প্রিজন ফ্রেশ’

আপডেট সময় ০৪:৪৭:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

‘রাখিবো নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’ কারাগারের মূলমন্ত্র। কারাবন্দিদের শুধু শাস্তি নয়, সেই আলোর পথে ফেরাতে আরও একধাপ এগিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারে কারখানা স্থাপন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, যেখানে কাজ করছেন বন্দিরাই।

বন্দিদের সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সেখানে চালু হয়েছে একটি অত্যাধুনিক অটো সাবান উৎপাদন কারখানা। কারাগারে উৎপাদিত সাবানের ব্র্যান্ডের নাম রাখা হয়েছে ‘প্রিজন ফ্রেশ’। বর্তমানে উৎপাদন করা হচ্ছে তিন ক্যাটাগরির সাবান।

চলতি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কারখানার উদ্বোধন করা হয়। এতে বন্দিরা কাজে লাগাচ্ছেন কারাভোগের সময়। অর্জন করছেন আধুনিক শিল্প-কারখানায় কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। ফলে মুক্তির পর তৈরি হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা

কারাগারের অভ্যন্তরে স্থাপিত এই বাণিজ্যিক কারখানায় অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বন্দিরা নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন।

কারখানায় প্রথমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও রাসায়নিক উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর সেই মিশ্রণ প্রক্রিয়াজাত করা হয় থ্রি-রোলার মেশিনের মাধ্যমে। পরবর্তী ধাপে প্লোডার মেশিনের সাহায্যে সাবান নির্দিষ্ট আকৃতিতে বের করা হয়।

এরপর সাবানের গায়ে প্রতিষ্ঠানের লোগো বা নির্ধারিত ছাপ বসে। সবশেষ উন্নতমানের প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের উপযোগী করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শিল্প-কারখানার মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।
দক্ষ হচ্ছেন বন্দিরা

কারাগারের এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী বন্দিরা আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, যন্ত্র পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শিল্প নিরাপত্তা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মুক্তির পর কোনো সাবান বা কসমেটিকস কারখানায় চাকরি কিংবা নিজস্ব ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

সরকারের রাজস্ব সাশ্রয়

বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ব্যবহৃত সাবান বাইরে থেকে কিনতে হয়। দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দিদের জন্য সাবানের চাহিদা ৯০ হাজার পিস এবং কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাহিদা ১০ হাজার পিস। মোট ১ লাখ পিস চাহিদা রয়েছে সাবানের।

নিজস্ব কারখানায় উৎপাদনের ফলে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে আরও শক্তিশালী হবে বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করে কারা প্রশাসনের পুনর্বাসন কার্যক্রম। প্রতিটি ‘প্রিজন ফ্রেশ’ সাবানের দাম রাখা হয়েছে ৫০ টাকা।

অবসর সময় কাজে লাগিয়ে আয়

কারাজীবনে বন্দিদের দীর্ঘ সময় অনেক ক্ষেত্রেই কর্মহীনভাবে কাটে। নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই সময়কে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা হয়েছে। কারখানায় কাজের বিনিময়ে বন্দিরা পাচ্ছেন পারিশ্রমিক। মাসে ৫-৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন বন্দিরা।

উপার্জিত অর্থের একটি অংশ তারা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন এবং একটি অংশ পরিবারের কাছে পাঠানোর সুযোগও রয়েছে। ফলে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একজন বন্দি বলেন, জেলে বসে আমরা শুধু কাজ করছি না, নতুন কিছু শিখছি। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবো। দেশের জন্য কাজ করতে পারবো এবং পরিবারের দায়িত্বও পালন করতে পারব।

এভাবে যদি সব কারাগারে চালু হয় তাহলে বন্দিরা জামিন লাভের পর আর অসৎ কাজ করবে না, সৎ কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করবে বলে মনে করেন তিনি।

পুনর্বাসনে ইতিবাচক ভূমিকা

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, কারাগারের ভেতরে এ ধরনের উৎপাদনমুখী কার্যক্রম বন্দিদের মানসিক পরিবর্তন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কাজের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে মুক্তির পর সমাজে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করা তুলনামূলক সহজ হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত মডেল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারাগারভিত্তিক শিল্প কার্যক্রম বহুদিন ধরেই চালু রয়েছে। সেখানে বন্দিরা আসবাবপত্র, পোশাক, খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্পসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন করেন। এসব উদ্যোগ বন্দিদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন ও পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার হার কমাতে কার্যকর বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশেও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের এ উদ্যোগ সেই আধুনিক পুনর্বাসনমুখী কারা ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন সম্ভাবনার সূচনা

কারা প্রশাসনের এই উদ্যোগ বন্দিদের জন্য কেবল একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, বরং নতুন জীবন শুরু করার একটি বাস্তব প্রস্তুতি। দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, পরিবারের আর্থিক সহায়তা ও সমাজে সম্মানজনকভাবে ফিরে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছে এই সাবান কারখানা।

সংশ্লিষ্টদের আশা, এ ধরনের উৎপাদনমুখী ও পুনর্বাসনভিত্তিক প্রকল্প দেশের অন্য কারাগারেও সম্প্রসারণ করা হলে বন্দিদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি একটি মানবিক ও আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

ঘণ্টায় ১৫শ পিস সাবান উৎপাদন, বাইরে বিক্রির পরিকল্পনা

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ  বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় ১৫শ পিস সাবান উৎপাদন চলছে কারখানায়। এর মাধ্যমে বন্দি, কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কারাগারে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়বে।’

ভবিষ্যতে কারাগারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন  বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল কারাগারকে শুধু বন্দি রাখার জায়গা না বানিয়ে একটি উৎপাদনমুখী ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।’

তিনি বলেন, ‘বন্দিরা এখানে কাজ করে পারিশ্রমিক পাবে, নতুন দক্ষতা অর্জন করবে এবং মুক্তির পর সমাজে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন।’

ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিন ধরনের সাবান উৎপাদন

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন  বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে কারখানায় তিন ধরনের সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। শুরুতে উৎপাদিত সাবান দেশের বিভিন্ন কারাগারের নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। এতে সাশ্রয় হবে সরকারের রাজস্ব।’

পরবর্তীসময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জন্যও বাজারে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

কাশিমপুরে এ প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্য কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারেও একই ধরনের উৎপাদনমুখী শিল্প প্রকল্প চালু করা হবে জানান সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ