ঢাকা ১২:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলমগ্ন রাজধানী: থমকে গেল জনজীবন, বন্ধ হলো স্কুলের পরীক্ষা

শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম মুষলধারে বৃষ্টিতে আজ রোববার সকাল নাগাদ এক অচেনা ও বিপর্যস্ত রূপ নিয়েছে রাজধানী ঢাকা। মাত্র ছয় ঘণ্টার টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে শহরের সিংহভাগ সড়ক ও অলিগলি। কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানিতে স্থবির হয়ে পড়েছে কোটি মানুষের এই ব্যস্ত মহানগরী। বৃষ্টির তীব্রতা ও জলাবদ্ধতার কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজকের পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দুর্ভোগের চরমে সাধারণ মানুষ

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানিয়েছেন, গতকাল রাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত রাজধানীতে রেকর্ড ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা চলতি জুলাই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, মণিপুর, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর এবং বিজয়নগরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। পান্থপথ, ক্রিসেন্ট রোড, কাঁঠালবাগান ও ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হতেই কোমরসমান পানির মুখোমুখি হন।

পরীক্ষা দিতে এসে ফিরল শিক্ষার্থীরা

সকালের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা। মিরপুরের বাসিন্দা জামাল উদ্দীন জানান, মিরপুর ১০ থেকে শেওড়াপাড়া এলাকার প্রধান সড়ক ও গলির পথগুলো এখন পানির নিচে।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে বনানী একটি স্কুলে পড়ে। সকালে তৈরি হওয়ার পর মোবাইল ফোনে পরীক্ষা স্থগিতের মেসেজ আসায় আমরা আর বের হইনি। কিন্তু মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিভিন্ন শাখার শিক্ষার্থীরা সকালে চরম দুর্ভোগের মধ্যে কষ্ট করে স্কুলে এসে জানতে পারে আজকের পরীক্ষা বন্ধ। নিরুপায় হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে তাদের বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে।” উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মণিপুর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত শাখার আজকের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।

জলমগ্ন পথে যুদ্ধের গল্প

সবকিছু থমকে গেলেও পেটের তাগিদে ও পেশাগত দায়িত্বে ঘরের বাইরে বের হতে হয়েছে চাকুরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষদের। গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশাও পানির কারণে বিকল হয়ে পড়ে রাস্তায়।

পুরান ঢাকা থেকে কারওয়ান বাজারে কর্মস্থলে আসার পথে চরম ভোগান্তির বর্ণনা দেন

গার্মেন্ট কর্মী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাট তরিয়ে গেছে। শেওড়াপাড়ার এক গার্মেন্টস-এ কাজ করেন তিনি ও তার স্ত্রী মর্জিনা বেগম। দুজনকেই ভিজে অফিসে যেতে হচ্ছে। 

পুরান ঢাকার আবদুল কাদের জানান, তার বাসা বংশালে।  তিনি বলেন, ভোর পৌনে ৭টার দিকে বংশাল থেকে রওনা দিয়েছিলাম। বংশাল পুরান চৌরাস্তা থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত পুরো পথেই পানি জমে ছিল। সেই নোংরা পানি ডিঙিয়ে, ভিজে ভিজেই কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়েছে।

অন্যদিকে শাহজাদপুর থেকে আসা রহিম বেপারী মতিঝিলের একটি ব্যাংকে কাজ করেন। তিনি জানান, আলীর মোড়সহ বেশ কিছু এলাকায় আজ পানি জমেছে, যেখানে সাধারণত কখনো পানি জমে না।

আকস্মিক এই জলাবদ্ধতা ঢাকার ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ভঙ্গুর রূপকে আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। একদিকে নোংরা পানির দুর্গন্ধ, অন্যদিকে যাতায়াতের চরম সংকট- সব মিলিয়ে ছুটির পরের প্রথম কর্মদিবসের সকালে ঢাকাবাসীর জীবন কাটছে এক চরম মানবিক ও দুঃসহ দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে।

বাংলা৭১নিউজ/এবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

জলমগ্ন রাজধানী: থমকে গেল জনজীবন, বন্ধ হলো স্কুলের পরীক্ষা

আপডেট সময় ১১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম মুষলধারে বৃষ্টিতে আজ রোববার সকাল নাগাদ এক অচেনা ও বিপর্যস্ত রূপ নিয়েছে রাজধানী ঢাকা। মাত্র ছয় ঘণ্টার টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে শহরের সিংহভাগ সড়ক ও অলিগলি। কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানিতে স্থবির হয়ে পড়েছে কোটি মানুষের এই ব্যস্ত মহানগরী। বৃষ্টির তীব্রতা ও জলাবদ্ধতার কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজকের পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দুর্ভোগের চরমে সাধারণ মানুষ

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানিয়েছেন, গতকাল রাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত রাজধানীতে রেকর্ড ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা চলতি জুলাই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহিমপুর, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, মণিপুর, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর এবং বিজয়নগরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। পান্থপথ, ক্রিসেন্ট রোড, কাঁঠালবাগান ও ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হতেই কোমরসমান পানির মুখোমুখি হন।

পরীক্ষা দিতে এসে ফিরল শিক্ষার্থীরা

সকালের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা। মিরপুরের বাসিন্দা জামাল উদ্দীন জানান, মিরপুর ১০ থেকে শেওড়াপাড়া এলাকার প্রধান সড়ক ও গলির পথগুলো এখন পানির নিচে।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে বনানী একটি স্কুলে পড়ে। সকালে তৈরি হওয়ার পর মোবাইল ফোনে পরীক্ষা স্থগিতের মেসেজ আসায় আমরা আর বের হইনি। কিন্তু মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিভিন্ন শাখার শিক্ষার্থীরা সকালে চরম দুর্ভোগের মধ্যে কষ্ট করে স্কুলে এসে জানতে পারে আজকের পরীক্ষা বন্ধ। নিরুপায় হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে তাদের বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে।” উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মণিপুর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত শাখার আজকের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।

জলমগ্ন পথে যুদ্ধের গল্প

সবকিছু থমকে গেলেও পেটের তাগিদে ও পেশাগত দায়িত্বে ঘরের বাইরে বের হতে হয়েছে চাকুরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষদের। গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশাও পানির কারণে বিকল হয়ে পড়ে রাস্তায়।

পুরান ঢাকা থেকে কারওয়ান বাজারে কর্মস্থলে আসার পথে চরম ভোগান্তির বর্ণনা দেন

গার্মেন্ট কর্মী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাট তরিয়ে গেছে। শেওড়াপাড়ার এক গার্মেন্টস-এ কাজ করেন তিনি ও তার স্ত্রী মর্জিনা বেগম। দুজনকেই ভিজে অফিসে যেতে হচ্ছে। 

পুরান ঢাকার আবদুল কাদের জানান, তার বাসা বংশালে।  তিনি বলেন, ভোর পৌনে ৭টার দিকে বংশাল থেকে রওনা দিয়েছিলাম। বংশাল পুরান চৌরাস্তা থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত পুরো পথেই পানি জমে ছিল। সেই নোংরা পানি ডিঙিয়ে, ভিজে ভিজেই কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়েছে।

অন্যদিকে শাহজাদপুর থেকে আসা রহিম বেপারী মতিঝিলের একটি ব্যাংকে কাজ করেন। তিনি জানান, আলীর মোড়সহ বেশ কিছু এলাকায় আজ পানি জমেছে, যেখানে সাধারণত কখনো পানি জমে না।

আকস্মিক এই জলাবদ্ধতা ঢাকার ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ভঙ্গুর রূপকে আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। একদিকে নোংরা পানির দুর্গন্ধ, অন্যদিকে যাতায়াতের চরম সংকট- সব মিলিয়ে ছুটির পরের প্রথম কর্মদিবসের সকালে ঢাকাবাসীর জীবন কাটছে এক চরম মানবিক ও দুঃসহ দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে।

বাংলা৭১নিউজ/এবি