ঢাকা ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo মন্ত্রিসভার নতুন প্রতিমন্ত্রীদের শপথ পড়ালেন রাষ্ট্রপতি Logo নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে হেফাজতে ইসলামের অভিনন্দন Logo তুরাগ নদ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের লাশ উদ্ধার Logo শপথ নিলেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর Logo রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তিতে বুড়িগঙ্গায় নৌকাবাইচ উৎসব Logo নয় মাসের অভিযান শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন Logo রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের নতুন সচিব সালাহউদ্দিন নাগরী Logo মির্জা ফখরুলের শপথ ঘিরে বঙ্গভবনে প্রবেশ করছেন ৩ বাহিনীর প্রধান Logo রাজবাড়ীতে প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি, দায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি Logo প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

যমুনা কেড়ে নিয়েছে ঘর-জমি, স্থায়ী বাঁধের দাবি

যমুনা নদী যেন আবারো তার ভয়াল রূপে ফিরে এসেছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদী তীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে ভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পানি ওঠা-নামায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

চৌহালীর চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের কাছে গত কয়েকদিন ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। ভূমিহীন এই মানুষের একমাত্র সম্বল ছিল ছোট একটি বসতঘর। গত (৪ জুন) রাতে সেই আশ্রয়টুকু গ্রাস করেছে যমুনা।

সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে উপজেলার অন্তত ছয় থেকে সাতটি গ্রামের বহু পরিবার বাড়ি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত পরিবার।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে।

চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছেন।

চরকানালিয়া গ্রামের আব্দুল মানিকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন তিনি। যমুনার ধারাবাহিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন তার কাছে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার (৯ জুন) আবেগঘন কণ্ঠে মানিক বলেন, ‍“বারবার ঘর করেছি, বারবার নদী নিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।”

চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিসের কণ্ঠেও একই আকুতি। তিনি বলেন, “আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।”

৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগম কয়েক বছর আগেই হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নদীর ভাঙন তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন হুমকির মুখে।

শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

নাটুয়ারপাড়ার কৃষক সেরু শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ জানান, যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় তাদের দুর্ভোগ কমছে না।

কাওয়াকোলা চরের কৃষক বাদশা শেখ বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে ফসল চাষাবাদ করি, কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেব।”

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।”

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ

Tag :

মন্ত্রিসভার নতুন প্রতিমন্ত্রীদের শপথ পড়ালেন রাষ্ট্রপতি

যমুনা কেড়ে নিয়েছে ঘর-জমি, স্থায়ী বাঁধের দাবি

আপডেট সময় ০৪:৫২:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

যমুনা নদী যেন আবারো তার ভয়াল রূপে ফিরে এসেছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদী তীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে ভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পানি ওঠা-নামায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

চৌহালীর চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের কাছে গত কয়েকদিন ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। ভূমিহীন এই মানুষের একমাত্র সম্বল ছিল ছোট একটি বসতঘর। গত (৪ জুন) রাতে সেই আশ্রয়টুকু গ্রাস করেছে যমুনা।

সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে উপজেলার অন্তত ছয় থেকে সাতটি গ্রামের বহু পরিবার বাড়ি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত পরিবার।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে।

চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছেন।

চরকানালিয়া গ্রামের আব্দুল মানিকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন তিনি। যমুনার ধারাবাহিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন তার কাছে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার (৯ জুন) আবেগঘন কণ্ঠে মানিক বলেন, ‍“বারবার ঘর করেছি, বারবার নদী নিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।”

চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিসের কণ্ঠেও একই আকুতি। তিনি বলেন, “আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।”

৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগম কয়েক বছর আগেই হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নদীর ভাঙন তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন হুমকির মুখে।

শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

নাটুয়ারপাড়ার কৃষক সেরু শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ জানান, যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় তাদের দুর্ভোগ কমছে না।

কাওয়াকোলা চরের কৃষক বাদশা শেখ বলেন, “সারা বছর কষ্ট করে ফসল চাষাবাদ করি, কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেব।”

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে, চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।”

বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ