শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জন কেইনস’র আজ জন্মদিন

বাংলা৭১নিউজ,ডেস্ক:
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

জন মেইনার্ড কেইনস। প্রভাবশালী ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ও আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomics) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ৫ই জুন, ১৮৮৩ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজের এক উচ্চ-শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা জন নেভিল কেইনসও ছিলেন একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং মা ফ্লোরেন্স অ্যাডা কেইনস ছিলেন কেমব্রিজের প্রথম নারী মেয়র। ২১শে এপ্রিল ১৯৪৬ সালে মাত্র  ৬২ বছর বয়সে তিনি মুত্যুবরণ করেন। তার যুগান্তকারী তত্ত্বগুলোর ওপর ভিত্তি করে ‘কেইনসীয় অর্থনীতি’ গড়ে ওঠে, যা বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসে।

কেইনসের জীবন এবং অর্থনৈতিক দর্শন

ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদদের বিপরীতে কেইনস বিশ্বাস করতেন যে, মুক্ত বাজার অর্থনীতি সবসময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে না। তার মতে, মন্দা বা অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে ব্যক্তিগত চাহিদা কমে যায়। এ সময় বেকারত্ব দূর করতে ও অর্থনীতি সচল রাখতে সরকারকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে এবং ঘাটতি বাজেটের (Deficit Financing) মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যয় বাড়াতে হবে। তার বিখ্যাত বই দ্য জেনারেল থিওরি অফ এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি (১৯৩৬)-এর মাধ্যমে তিনি সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

 উল্লেখযোগ্য অবদান

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি দ্য ইকোনমিক কনসিকুয়েন্স অফ দ্য পিস (১৯১৯) বইটি লেখেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, এটি ইউরোপের অর্থনীতিকে ধ্বংস করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনে তিনি ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন. তার ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) প্রতিষ্ঠিত হয়।

 দার্শনিক অন্যান্য পরিচয়

জন মেইনার্ড কেইনস অর্থনীতি ছাড়াও বুদ্ধিবৃত্তিক ‘ব্লুমসবারি গ্রুপ’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি শিল্প, সাহিত্য এবং থিয়েটারের প্রবল অনুরাগী ছিলেন এবং আর্টস কাউন্সিল অফ গ্রেট ব্রিটেনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনীতিতে আসার আগে কেইনসের মূল আগ্রহ ছিল দর্শনে। তাঁর দার্শনিক চিন্তাভাবনা তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

কেইনসের প্রথম বড় একাডেমিক কাজ ছিল দর্শনের ওপর। ১৯২১ সালে তাঁর “A Treatise on Probability” গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তিনি যুক্তি দেন যে, ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত এবং একে কেবল গাণিতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। মানুষের যৌক্তিক অনুমান ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাঁর এই ‘অনিশ্চয়তার দর্শন’ পরবর্তীতে তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বে (যেখানে তিনি বাজারের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলেছেন) বড় ভূমিকা রাখে।

কেইনস গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতো বিশ্বাস করতেন যে, জীবনের মূল লক্ষ্য হলো ‘ভালো জীবন’ (Good Life) যাপন করা। তাঁর মতে, অর্থ বা সম্পদ উপার্জনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে সুন্দর, সুসংস্কৃত এবং আনন্দময় করে তোলা, কেবল টাকা জমিয়ে রাখা নয়।

কেইনস তৎকালীন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ব্লুমসবারি গ্রুপ’ এর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এটি ছিল লন্ডনের মুক্তমনা লেখক, চিত্রশিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি দল (যার মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ ও ই. এম. ফরস্টার)। এই গ্রুপের প্রভাবে কেইনস ভিক্টোরিয়ান যুগের রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠেন। তিনি থিয়েটার, ব্যালে এবং চিত্রশিল্পের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। তিনি ব্রিটেনের ‘আর্টস কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যা আজও সেদেশে শিল্পচর্চায় সরকারি অনুদান দিয়ে থাকে। তিনি নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ সমসাময়িক চিত্রশিল্পীদের ছবি কিনে তাঁদের সাহায্য করতেন।

সফল বিনিয়োগকারী

তত্ত্বীয় আলোচনার পাশাপাশি কেইনস বাস্তব জগতেও একজন অত্যন্ত সফল আর্থিক ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি তাঁর নিজের কলেজ (কিংস কলেজ, ক্যামব্রিজ)-এর কোষাধ্যক্ষ বা ফান্ড ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জাদুকরী বিনিয়োগ কৌশলের কারণে কলেজের ফান্ডের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কেইনস নিজে স্টক মার্কেট, বৈদেশিক মুদ্রা এবং পণ্য বাজারে (Commodities) বিনিয়োগ ও ফাটকা ব্যবসা (Speculation) করতেন। ১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধসে তিনি বড় ধাক্কা খেলেও, পরবর্তীতে নিজের অর্থনৈতিক বুদ্ধি খাটিয়ে বিশাল সম্পত্তির মালিক হন। মৃত্যুর সময় তিনি সমসাময়িককালের অন্যতম ধনী অর্থনীতিবিদ ছিলেন।

রাষ্ট্রনায়ক সরকারি নীতিনির্ধারক

কেইনস পর্দার আড়ালে থেকে ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ ট্রেজারিতে (অর্থ মন্ত্রণালয়) যোগ দেন এবং যুদ্ধকালীন অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তিনি সরকারের অবৈতনিক উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিজয়ী রাষ্ট্রগুলো যখন জার্মানির ওপর অন্যায় ও ভারী ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দিচ্ছিল, কেইনস তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি প্রতিবাদস্বরূপ সরকারি পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং “The Economic Consequences of the Peace” নামে একটি বই লেখেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, জার্মানিকে এভাবে পঙ্গু করে দিলে ভবিষ্যতে আরেকটি বড় যুদ্ধ (যা পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে সত্যি হয়) ঘটবে।

গণিতবিদ সাংবাদিক

কেইনসের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু হয়েছিল গণিত দিয়ে। তাঁর বাবার ইচ্ছায় তিনি গণিত ট্রাইপস (ক্যামব্রিজের বিখ্যাত সম্মাননা) পরীক্ষা দেন এবং অত্যন্ত ভালো ফলাফল করেন। এই গাণিতিক ভিত্তিই তাঁকে পরবর্তীতে অর্থনীতিকে নতুন রূপ দিতে সাহায্য করেছিল। তিনি দীর্ঘ দিন (১৯১১-১৯৪৫) বিখ্যাত “The Economic Journal”-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় এই জার্নালটি বিশ্বের অর্থনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

পারিবারিক পটভূমি ও কেইনসের প্রেম

কেইনস ১৮৮৩ সালের ৫ই জুন ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে একটি অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত এবং বুদ্ধিজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশই তাঁর ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। তার পিতা জন নেভিল কেইনস, যিনি নিজে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা অর্থনীতিবিদ ও যুক্তিবিদ ছিলেন। মা ছিলেন  ফ্লোরেন্স অ্যাডা কেইনস, তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক এবং ক্যামব্রিজের প্রথম নারী মেয়রদের একজন। কেইনসের পরিবার ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং প্রগতিশীল ঘরানার। শৈশব থেকেই তিনি বাড়িতে অর্থনীতি, দর্শন ও রাজনীতি চর্চার পরিবেশ পেয়েছিলেন। ১৮৯৭ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ ইটন কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি গণিত, ইতিহাস ও ক্লাসিক্যাল বিষয়ে অসংখ্য পুরস্কার ও স্কলারশিপ লাভ করেন। ১৯০২ সালে তিনি ক্যামব্রিজের কিংস কলেজে গণিত পড়ার জন্য প্রবেশ করেন। গণিতে ডিগ্রি নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ গড়ে ওঠে দর্শনে।

অর্থনীতিবিদ হিসেবে কেইনস যতটা রক্ষণশীল বা হিসেবি ছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও জীবনসঙ্গী নির্বাচন ছিল ততটাই রোমান্টিক এবং চমকপ্রদ। ১৯২১ সালে কেইনসের সাথে পরিচয় হয় রাশিয়ার বিখ্যাত ব্যালে নৃত্যশিল্পী লিডিয়া লোপোকোভা এর সাথে।  লিডিয়ার সৌন্দর্য এবং নাচের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কেইনস ১৯২৫ সালে তাঁকে বিয়ে করেন। একজন নামকরা ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হয়ে একজন রুশ ব্যালে নৃত্যশিল্পীকে বিয়ে করাটা তৎকালীন উচ্চবিত্ত ব্রিটিশ সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কেইনসের ব্লুমসবারি গ্রুপের বন্ধুরাও প্রথমে লিডিয়াকে সহজে মেনে নিতে পারেনি।

সমস্ত সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেইনস ও লিডিয়ার দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুখী ও ভালোবাসাপূর্ণ। লিডিয়া কেইনসের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর মানসিক শক্তির বড় উৎস ছিলেন এবং কেইনসের অসুস্থতার দিনগুলোতে তাঁর নিবিড় যত্ন নিয়েছিলেন।

জন মেইনার্ড কেইনস এবং লিডিয়া লোপোকোভার কোনো সন্তান ছিল না।

বিয়ের পর লিডিয়া একবার গর্ভবতী হয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯২৭ সালে তাঁর গর্ভপাত (Miscarriage) ঘটে। এরপর এই দম্পতি আর কোনো সন্তানের জন্ম দিতে পারেননি। ফলে কেইনসের সরাসরি কোনো বংশধর বা উত্তরাধিকারী নেই।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com