
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর পড়াশোনা করতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের লাশ পাওয়া গেলেও গতকাল পর্যন্ত তার বান্ধবী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির খোঁজ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী সংস্থার ধারণা, বৃষ্টিকে হত্যার পর তার দেহ কয়েক খণ্ড করে নদীতে ফেলা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে গ্রেপ্তার হওয়া জামিলের রুমমেট ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ এখনো মুখ খোলেনি। সূত্র : রয়টার্স।
পুলিশ জানিয়েছে, ২৪ এপ্রিল জামিলের লাশ উদ্ধার হলেও এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি বৃষ্টির লাশ। এখনো তল্লাশি অব্যাহত আছে। এ অভিযানে ‘উই আর দ্য অ্যাসেনশিয়ালস’ নামের স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগ দিয়েছেন। সূত্র জানায়, জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের মার্কিন যুবককে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারা অভিযুক্ত হিশামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস ও ফ্লোরিডা কনস্যুলেট। মার্কিন গণমাধ্যমও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের খবর।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ অনেক তথ্যই প্রকাশ করছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। কারণ ভুক্তভোগীদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিংবা তাঁদের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল- সে বিষয়ে এ পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তদন্তকারীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে তারা নির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখছে।
বৃষ্টির ডিএনএ উদ্ধার : ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, নিহত বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির ডিএনএ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রধান অভিযুক্ত হিশাম সালেহর বাসায় তল্লাশি চালিয়ে ডিএনএর আলামত উদ্ধার করা হয়।
শোকের মাতম, হত্যার বিচার দাবি : যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে মাদারীপুরের মেয়ে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে তার গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহত বৃষ্টি ওই এলাকার এটিএম বাজারের জহির উদ্দিন আকনের মেয়ে। তার মা আলভী বেগম। বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পিএইচডি করছিলেন। এর আগে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি দ্রুত তাঁর লাশ উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। বৃষ্টির বোন বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে হবে, পাশাপাশি এ ঘটনার বিচার চাই। বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, কত আনন্দ ছিল আমার মেয়ের মনে, জুলাইয়ে ওর দেশে আসার কথা ছিল। এ জন্যই নিজের এবং পরিবারের জন্য সময় পেলেই কেনাকাটার চেষ্টা করত। এখন আর কেউ ‘বাবা’ বলে ডাকবে না। তিনি বলেন, ওইদিনের (বৃহস্পতিবার) কথাই ছিল আমার মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা। আমার মেয়ে বৃষ্টিকে আমি ‘মা’ বলে ডাকতাম। এখন আমি আর কাউকে ‘মা বলে ডাকতে পারব না।’
উল্লেখ্য, বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর এলাকায়। তবে গত ২৫ বছর ধরে তার পরিবার ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরে থাকছে। বৃষ্টির বড় ভাই জাহিদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে স্বজনরা প্রথম তার মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন। বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন বলেন, ‘কীভাবে, কেন তাকে হত্যা করা হলো- তা আমরা কিছুই জানি না। তার এক সহপাঠীকেও হত্যা করা হয়েছে। শুনেছি তার লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু আপুর লাশ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। আর বৃষ্টির লাশ দেশে আনার দাবি জানাই।’
বিচার চায় বাংলাদেশ : যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুনের ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে ‘দায়ীদের’ খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সরকার। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘আমরা দাবি করব বাংলাদেশ থেকে এবং মন্ত্রণালয় থেকে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তটা ভালোমতো করে এবং দ্রুততার সঙ্গে করে। যারা এই নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে, তা বের করে যেন তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়।’
হত্যাকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়, ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট (মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর), এফবিআই থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব এজেন্সির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রাখছি প্রতিনিয়ত। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এটাতে সহযোগিতা করছে এবং আমরা চেষ্টা করছি ওদের লাশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনা যায়। কিন্তু এটা একটা লিগ্যাল ব্যাপার। সেই জায়গাটায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে গভীরভাবে যোগাযোগ রাখছি।’
বাংলা৭১নিউজ/জেএস