ঢাকা ১০:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo মেয়ের জন্মদিনে নেইমারের অদ্ভুত কাণ্ড, বিস্মিত সবাই Logo আগামী তিন মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী Logo ডিভাইসের আসক্তি থেকে শিশু-কিশোরদের মাঠে ফেরাতে হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী Logo সাংবাদিকরা সমাজ ও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী Logo সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন : আইনমন্ত্রী Logo হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু Logo ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৫০ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যু ১৪৩ Logo গুলশানে মিছিল : আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী ১০ দিনের রিমান্ডে Logo মধ্যপ্রাচ্যে ‘সর্বোচ্চ সংযমের’ আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করল ব্রিকস Logo দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইলিশ চায় ভারত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান

মাত্র ৫ মিনিটেই উধাও মূল্যবান চিত্রকর্ম, ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে কেন বাড়ছে দুঃসাহসী চুরি?

ফ্রান্সের একটি জাদুঘর থেকে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিয়ের-অগস্ত রেনোয়ারের চারটি চিত্রকর্ম চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ক্যাগনেস-সুর-মেরের রেনোয়ার জাদুঘরে ঢুকে তারা এসব চিত্রকর্ম নিয়ে যায়।

ছবিগুলোর মূল্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি ইউরোপের জাদুঘরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা (ইউরোপোল) সতর্ক করেছিল, ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরির ঘটনা বাড়ছে এবং চোরেরা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

রেনোয়ারের ছবি চুরির কয়েক দিন আগে শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড বিবিসিকে বলেছিলেন, সামনে বড় ধরনের চুরি হতে পারে।

গত বছরের অক্টোবরে প্যারিসের লুভর জাদুঘরে বড় ধরনের চুরির পর এই আশঙ্কা বেড়েছে। লুভর থেকে চুরি হওয়া প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ইউরো মূল্যের গয়না এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ব্র্যান্ডের মতে, লুভরের মতো বিখ্যাত জাদুঘরে সফল চুরি অন্য চোরদেরও উৎসাহিত করতে পারে।

লুভরের চুরির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্সের আরেকটি ছোট জাদুঘর থেকে মূল্যবান মুদ্রা চুরি হয়।

এরপর ভিয়েনা থেকে হীরার মালা, স্পেন থেকে ব্রোঞ্জ যুগের প্রত্নবস্তু এবং ইতালির দুটি জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা ঘটে। রেনোয়ার জাদুঘর থেকে চুরি হওয়া চিত্রকর্মের মধ্যে দুটি চোরেরা পালানোর সময় জাদুঘরের বাগানে ফেলে যায়। পরে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। বাকি চিত্রকর্মগুলো উদ্ধারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

ইউরোপোল জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে জাদুঘর চুরির ঘটনা প্রায় দুই বছর ধরে বাড়ছে।

চোরদের কৌশলও বদলে গেছে। এখন তারা সোনা, রুপা, মূল্যবান পাথর ও সহজে বহন করা যায় এমন দামি জিনিসকে বেশি লক্ষ্য করছে। শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বুলুত মনে করেন, লুভরের চুরির পর হওয়া অনেক ঘটনাই সেই চুরির অনুকরণে হতে পারে।

ব্র্যান্ড বলেন, ‘বিশ্বের প্রতিটি জাদুঘর এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে।’ শিল্পকর্ম চুরি নিয়ে গবেষণা করা সংস্থা এআরসিএ জানিয়েছে, চোরেরা এখন ছোট, মূল্যবান ও সহজে বহন করা যায়, এমন জিনিসের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এসব চুরি সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়।

এআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে জাদুঘর চুরির ঘটনা ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ছিল। ২০২৫ সালেও তা কিছুটা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব চুরি শুধু জাদুঘরের সম্পদের ক্ষতি করছে না, বরং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই ইউরোপের জাদুঘরগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হচ্ছে।

জাদুঘর কেন চোরদের লক্ষ্য?

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ডের মতে, ব্যাংক ও নিরাপত্তাবেষ্টিত গহনার দোকানের তুলনায় অনেক জাদুঘর চোরদের কাছে সহজ লক্ষ্য। কারণ ব্যাংক ও এসব দোকানে এখন আগের তুলনায় কম নগদ টাকা থাকে। অন্যদিকে, অনেক জাদুঘরে নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে না। নতুন প্রদর্শনী আয়োজনকে অনেক সময় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইউরোপের অনেক জাদুঘর আবার শত শত বছরের পুরোনো ভবনে অবস্থিত। এসব ভবনে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বসানোও কঠিন।

লুভরে চুরির কয়েক ঘণ্টা পর ফ্রান্সের ল্যাংগ্রেসে ডেনিস দিদরোর ‘মেজন দে লুমিয়ের’ জাদুঘরেও চুরি হয়। জাদুঘরটি ১৮ শতকের দুটি পুরোনো ভবনে অবস্থিত। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান একর সিকিউরিটির প্রধান নির্বাহী কুমার সোক্কা বলেন, জাদুঘর সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে এবং প্রবেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে চোরেরা সহজেই দর্শনার্থী সেজে ভেতরে ঢুকতে পারে।

ব্র্যান্ড বলেন, জাদুঘর থেকে চুরি হলে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে থাকা কিছু মূল্যবান সম্পদের ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ল্যাংগ্রেসের মেয়র থিও ক্যাভিয়েজেল বলেন, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নিয়ম মেনেই এসব কাজ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো নিরাপত্তা থাকলেও সশস্ত্র চোরদের পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। প্রতিটি গ্যালারিতে পুলিশ মোতায়েন করাও সম্ভব নয়। তাছাড়া জাদুঘরে চুরির ঘটনা সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে এবং পুলিশ পৌঁছানোর আগেই চোরেরা পালিয়ে যায়। রেনোয়ার জাদুঘরের চুরিটিও মাত্র পাঁচ মিনিটে সম্পন্ন হয়েছিল।

জাদুঘরে চুরির ধরন বদলেছে

ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে চুরির ঘটনা আগের তুলনায় সহিংস হয়ে উঠছে। চোরেরা জাদুঘরে ঢুকতে হাতুড়ি, কুঠার, শাবল এমনকি বিস্ফোরকও ব্যবহার করছে। প্যারিসের লুভর জাদুঘরে চোরেরা যান্ত্রিক লিফট ব্যবহার করে ভেতরে ঢোকে। পরে যন্ত্রের সাহায্যে জানালা কেটে নিরাপত্তাকর্মীদের হুমকি দিয়ে মূল্যবান গয়না নিয়ে পালিয়ে যায়।

ফ্রান্সের রেনোয়ার জাদুঘরেও চোরেরা বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে ভেতরে ঢোকে। এরপর করাত দিয়ে চিত্রকর্মের ফ্রেমের কাঠামো কেটে ছবি নিয়ে যায়। এ ধরনের সহিংস চুরির ঘটনায় জাদুঘরের দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসের পরিচালক লিলি হোলিন বলেন, কর্মঘণ্টায় কোনো সশস্ত্র হামলা হলে দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার।

কী চুরি করছে চোরেরা?

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড বলেন, আগে চোরেরা বেশি চিত্রকর্ম চুরি করত। কিন্তু এসব ছবি বিক্রি করা কঠিন হওয়ায় গত প্রায় ১০ বছর ধরে তারা সহজে বিক্রি করা যায়, এমন জিনিসের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ইউরোপোল জানিয়েছে, এখন চোরদের প্রধান লক্ষ্য সোনা-রুপার মতো মূল্যবান ধাতু, রত্নপাথর এবং চীনা চীনামাটির সামগ্রীসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নবস্তু।

মূল্যবান ধাতু গলিয়ে ফেললে তা শনাক্ত করা কঠিন। আবার গয়না থেকে রত্নপাথর খুলে আলাদাভাবে বিক্রি করা যায়। চীনা চীনামাটির সামগ্রীরও বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। ব্র্যান্ড বলেন, চুরির পর সন্দেহভাজনদের ধরতে পুলিশের হাতে সাধারণত চার থেকে ছয় দিন সময় থাকে।

তদন্তে তিনি তথ্যদাতা ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। তবে চোরদের গ্রেপ্তার করা গেলেও চুরি যাওয়া গয়না বা মূল্যবান ধাতু সবসময় উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। লুভরের চুরির ঘটনাই এর উদাহরণ। অন্যদিকে রেনোয়ারের চুরি হওয়া চিত্রকর্মগুলো উদ্ধারের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন ব্র্যান্ড। কারণ এসব ছবি প্রকাশ্যে বিক্রি করা কঠিন। তার ধারণা, চোরেরাও হয়তো বুঝতে পারছে না।

চুরি হওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধার কঠিন

চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধারের প্রতিষ্ঠান আর্ট রিকভারি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান ক্রিস্টোফার এ. মারিনেলো বলেন, চুরি হওয়া শিল্পকর্মের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাই ছোট জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা বেশি উদ্বেগজনক। তার মতে, মঙ্গলবারের চুরির ঘটনা ইউরোপের জাদুঘরগুলোর দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার আরেকটি উদাহরণ।

জাদুঘর কীভাবে নিরাপদ করা হচ্ছে?

লুভরের চুরির পর ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফ্রান্সের মেসোঁ দে লুমিয়ের জাদুঘরে নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেখানে উন্নত ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তাও শক্ত করা হচ্ছে। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হচ্ছে। ব্যাগ লকারে রাখতে হচ্ছে এবং নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরদের দ্রুত চুরি করে পালাতে না দেওয়াই নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। শক্ত দরজা, মোটা কাচ, অ্যালার্ম ও ধোঁয়া তৈরির বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে চোরদের কাজ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ করা যেতে পারে। এতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় পাবে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বুলুত বলেন, শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রশিক্ষণও জরুরি। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের শনাক্ত করে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান একর সিকিউরিটির প্রধান কুমার সোক্কা জানান, গত ১৮ মাসে জাদুঘরে কম্পন শনাক্তকারী প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। দেয়ালে ড্রিল করার মতো কাজ থেকেও এই প্রযুক্তি কম্পন শনাক্ত করতে পারে।

তবে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ ব্যয়বহুল। ছোট শহরের জাদুঘরগুলোর জন্য অর্থের জোগান দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মেয়র থিও ক্যাভিয়েজেল। তার মতে, ছোট শহরের জাদুঘরেও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান সংগ্রহ থাকতে পারে। তাই এসব জাদুঘরের নিরাপত্তায় সহায়তা প্রয়োজন।

তবে ইউরোপের সব দেশে জাদুঘর চুরি বাড়ছে না। সুইডেনে প্রায় এক দশক আগে বড় জাদুঘরে চুরির ঘটনা কমতে শুরু করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাদুঘরের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো উন্মুক্ত রাখাও জরুরি। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসের পরিচালক লিলি হোলিন বলেন, ‘জাদুঘরকে দুর্গে পরিণত করা যাবে না। তবে নতুন ধরনের হামলা মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থাও আধুনিক করতে হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

মেয়ের জন্মদিনে নেইমারের অদ্ভুত কাণ্ড, বিস্মিত সবাই

মাত্র ৫ মিনিটেই উধাও মূল্যবান চিত্রকর্ম, ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে কেন বাড়ছে দুঃসাহসী চুরি?

আপডেট সময় ১২:২৮:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফ্রান্সের একটি জাদুঘর থেকে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিয়ের-অগস্ত রেনোয়ারের চারটি চিত্রকর্ম চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ক্যাগনেস-সুর-মেরের রেনোয়ার জাদুঘরে ঢুকে তারা এসব চিত্রকর্ম নিয়ে যায়।

ছবিগুলোর মূল্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি ইউরোপের জাদুঘরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা (ইউরোপোল) সতর্ক করেছিল, ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরির ঘটনা বাড়ছে এবং চোরেরা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

রেনোয়ারের ছবি চুরির কয়েক দিন আগে শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড বিবিসিকে বলেছিলেন, সামনে বড় ধরনের চুরি হতে পারে।

গত বছরের অক্টোবরে প্যারিসের লুভর জাদুঘরে বড় ধরনের চুরির পর এই আশঙ্কা বেড়েছে। লুভর থেকে চুরি হওয়া প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ইউরো মূল্যের গয়না এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ব্র্যান্ডের মতে, লুভরের মতো বিখ্যাত জাদুঘরে সফল চুরি অন্য চোরদেরও উৎসাহিত করতে পারে।

লুভরের চুরির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্সের আরেকটি ছোট জাদুঘর থেকে মূল্যবান মুদ্রা চুরি হয়।

এরপর ভিয়েনা থেকে হীরার মালা, স্পেন থেকে ব্রোঞ্জ যুগের প্রত্নবস্তু এবং ইতালির দুটি জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা ঘটে। রেনোয়ার জাদুঘর থেকে চুরি হওয়া চিত্রকর্মের মধ্যে দুটি চোরেরা পালানোর সময় জাদুঘরের বাগানে ফেলে যায়। পরে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। বাকি চিত্রকর্মগুলো উদ্ধারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

ইউরোপোল জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে জাদুঘর চুরির ঘটনা প্রায় দুই বছর ধরে বাড়ছে।

চোরদের কৌশলও বদলে গেছে। এখন তারা সোনা, রুপা, মূল্যবান পাথর ও সহজে বহন করা যায় এমন দামি জিনিসকে বেশি লক্ষ্য করছে। শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বুলুত মনে করেন, লুভরের চুরির পর হওয়া অনেক ঘটনাই সেই চুরির অনুকরণে হতে পারে।

ব্র্যান্ড বলেন, ‘বিশ্বের প্রতিটি জাদুঘর এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে।’ শিল্পকর্ম চুরি নিয়ে গবেষণা করা সংস্থা এআরসিএ জানিয়েছে, চোরেরা এখন ছোট, মূল্যবান ও সহজে বহন করা যায়, এমন জিনিসের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এসব চুরি সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়।

এআরসিএর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে জাদুঘর চুরির ঘটনা ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ছিল। ২০২৫ সালেও তা কিছুটা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব চুরি শুধু জাদুঘরের সম্পদের ক্ষতি করছে না, বরং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই ইউরোপের জাদুঘরগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হচ্ছে।

জাদুঘর কেন চোরদের লক্ষ্য?

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ডের মতে, ব্যাংক ও নিরাপত্তাবেষ্টিত গহনার দোকানের তুলনায় অনেক জাদুঘর চোরদের কাছে সহজ লক্ষ্য। কারণ ব্যাংক ও এসব দোকানে এখন আগের তুলনায় কম নগদ টাকা থাকে। অন্যদিকে, অনেক জাদুঘরে নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে না। নতুন প্রদর্শনী আয়োজনকে অনেক সময় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইউরোপের অনেক জাদুঘর আবার শত শত বছরের পুরোনো ভবনে অবস্থিত। এসব ভবনে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বসানোও কঠিন।

লুভরে চুরির কয়েক ঘণ্টা পর ফ্রান্সের ল্যাংগ্রেসে ডেনিস দিদরোর ‘মেজন দে লুমিয়ের’ জাদুঘরেও চুরি হয়। জাদুঘরটি ১৮ শতকের দুটি পুরোনো ভবনে অবস্থিত। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান একর সিকিউরিটির প্রধান নির্বাহী কুমার সোক্কা বলেন, জাদুঘর সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে এবং প্রবেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে চোরেরা সহজেই দর্শনার্থী সেজে ভেতরে ঢুকতে পারে।

ব্র্যান্ড বলেন, জাদুঘর থেকে চুরি হলে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে থাকা কিছু মূল্যবান সম্পদের ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ল্যাংগ্রেসের মেয়র থিও ক্যাভিয়েজেল বলেন, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নিয়ম মেনেই এসব কাজ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো নিরাপত্তা থাকলেও সশস্ত্র চোরদের পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। প্রতিটি গ্যালারিতে পুলিশ মোতায়েন করাও সম্ভব নয়। তাছাড়া জাদুঘরে চুরির ঘটনা সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে এবং পুলিশ পৌঁছানোর আগেই চোরেরা পালিয়ে যায়। রেনোয়ার জাদুঘরের চুরিটিও মাত্র পাঁচ মিনিটে সম্পন্ন হয়েছিল।

জাদুঘরে চুরির ধরন বদলেছে

ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে চুরির ঘটনা আগের তুলনায় সহিংস হয়ে উঠছে। চোরেরা জাদুঘরে ঢুকতে হাতুড়ি, কুঠার, শাবল এমনকি বিস্ফোরকও ব্যবহার করছে। প্যারিসের লুভর জাদুঘরে চোরেরা যান্ত্রিক লিফট ব্যবহার করে ভেতরে ঢোকে। পরে যন্ত্রের সাহায্যে জানালা কেটে নিরাপত্তাকর্মীদের হুমকি দিয়ে মূল্যবান গয়না নিয়ে পালিয়ে যায়।

ফ্রান্সের রেনোয়ার জাদুঘরেও চোরেরা বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে ভেতরে ঢোকে। এরপর করাত দিয়ে চিত্রকর্মের ফ্রেমের কাঠামো কেটে ছবি নিয়ে যায়। এ ধরনের সহিংস চুরির ঘটনায় জাদুঘরের দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসের পরিচালক লিলি হোলিন বলেন, কর্মঘণ্টায় কোনো সশস্ত্র হামলা হলে দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার।

কী চুরি করছে চোরেরা?

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড বলেন, আগে চোরেরা বেশি চিত্রকর্ম চুরি করত। কিন্তু এসব ছবি বিক্রি করা কঠিন হওয়ায় গত প্রায় ১০ বছর ধরে তারা সহজে বিক্রি করা যায়, এমন জিনিসের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ইউরোপোল জানিয়েছে, এখন চোরদের প্রধান লক্ষ্য সোনা-রুপার মতো মূল্যবান ধাতু, রত্নপাথর এবং চীনা চীনামাটির সামগ্রীসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নবস্তু।

মূল্যবান ধাতু গলিয়ে ফেললে তা শনাক্ত করা কঠিন। আবার গয়না থেকে রত্নপাথর খুলে আলাদাভাবে বিক্রি করা যায়। চীনা চীনামাটির সামগ্রীরও বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। ব্র্যান্ড বলেন, চুরির পর সন্দেহভাজনদের ধরতে পুলিশের হাতে সাধারণত চার থেকে ছয় দিন সময় থাকে।

তদন্তে তিনি তথ্যদাতা ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। তবে চোরদের গ্রেপ্তার করা গেলেও চুরি যাওয়া গয়না বা মূল্যবান ধাতু সবসময় উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। লুভরের চুরির ঘটনাই এর উদাহরণ। অন্যদিকে রেনোয়ারের চুরি হওয়া চিত্রকর্মগুলো উদ্ধারের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন ব্র্যান্ড। কারণ এসব ছবি প্রকাশ্যে বিক্রি করা কঠিন। তার ধারণা, চোরেরাও হয়তো বুঝতে পারছে না।

চুরি হওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধার কঠিন

চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধারের প্রতিষ্ঠান আর্ট রিকভারি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান ক্রিস্টোফার এ. মারিনেলো বলেন, চুরি হওয়া শিল্পকর্মের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাই ছোট জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা বেশি উদ্বেগজনক। তার মতে, মঙ্গলবারের চুরির ঘটনা ইউরোপের জাদুঘরগুলোর দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার আরেকটি উদাহরণ।

জাদুঘর কীভাবে নিরাপদ করা হচ্ছে?

লুভরের চুরির পর ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফ্রান্সের মেসোঁ দে লুমিয়ের জাদুঘরে নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেখানে উন্নত ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তাও শক্ত করা হচ্ছে। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হচ্ছে। ব্যাগ লকারে রাখতে হচ্ছে এবং নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরদের দ্রুত চুরি করে পালাতে না দেওয়াই নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। শক্ত দরজা, মোটা কাচ, অ্যালার্ম ও ধোঁয়া তৈরির বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে চোরদের কাজ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ করা যেতে পারে। এতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় পাবে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বুলুত বলেন, শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রশিক্ষণও জরুরি। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের শনাক্ত করে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান একর সিকিউরিটির প্রধান কুমার সোক্কা জানান, গত ১৮ মাসে জাদুঘরে কম্পন শনাক্তকারী প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। দেয়ালে ড্রিল করার মতো কাজ থেকেও এই প্রযুক্তি কম্পন শনাক্ত করতে পারে।

তবে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ ব্যয়বহুল। ছোট শহরের জাদুঘরগুলোর জন্য অর্থের জোগান দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মেয়র থিও ক্যাভিয়েজেল। তার মতে, ছোট শহরের জাদুঘরেও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান সংগ্রহ থাকতে পারে। তাই এসব জাদুঘরের নিরাপত্তায় সহায়তা প্রয়োজন।

তবে ইউরোপের সব দেশে জাদুঘর চুরি বাড়ছে না। সুইডেনে প্রায় এক দশক আগে বড় জাদুঘরে চুরির ঘটনা কমতে শুরু করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাদুঘরের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো উন্মুক্ত রাখাও জরুরি। ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লাইড আর্টসের পরিচালক লিলি হোলিন বলেন, ‘জাদুঘরকে দুর্গে পরিণত করা যাবে না। তবে নতুন ধরনের হামলা মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থাও আধুনিক করতে হবে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ