ঢাকা ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয় Logo ঝুঁকিপূর্ণ লিবিয়া-গ্রিস রুট: প্রাণ হাতে ইউরোপের পথে বাংলাদেশি ও সুদানিরা Logo ঈদে মিলাদুন্নবীতে আজ দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে নানা আয়োজন Logo আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে সীমান্ত Logo পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ Logo প্রতিটি বিভাগে মডেল খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার Logo ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন Logo যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ ভিসা বাতিলের মুখে: ঝুঁকিতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা Logo স্রষ্টার করুণা যখন মানবরূপে: নিঃস্বদের আশ্রয়দাত্রী মাদার তেরেসা Logo একাকিত্ব নয়, আধুনিক জীবনধারার নতুন ব্যাকরণ নির্জনতা

স্রষ্টার করুণা যখন মানবরূপে: নিঃস্বদের আশ্রয়দাত্রী মাদার তেরেসা

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট। মেসিডোনিয়ার স্কোপিয়ে শহরে যখন প্রথম আলো ফুটল, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি—ছোট্ট এক শিশু একদিন বিশ্বমানচিত্রের বিষাদগ্রস্ত কোণগুলোতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আলো ছড়াবে। পিতৃদত্ত নাম ছিল অ্যাগনেস গনঝা বোজাক্সিউ। কিন্তু ইতিহাস তাকে ধারণ করেছে ‘মাদার তেরেসা’ নামে—একটি নাম, যা কেবল কোনো মানবীর নয়, বরং করুণা ও আর্তমানবতার এক চিরন্তন প্রতীক।

শৈশবেই মানবপ্রেম
অ্যাগনেসের বেড়ে ওঠার দিনগুলো খুব মসৃণ ছিল না। মাত্র আট বছর বয়সে বাবা নিকোলা বোজাক্সিউকে হারিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তার পরিবার। তবে মা ড্রানাফিলের অকৃত্রিম ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবপ্রেম অ্যাগনেসের কচি মনে গভীর দাগ কেটেছিল। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই বালিকা শৈশব থেকেই অনুভব করতেন—স্রষ্টার আরাধনা কেবল চার্চের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তার আসল রূপ লুকিয়ে আছে নিপীড়িত মানুষের সেবায়। ১৮ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে তিনি আয়ারল্যান্ডের ‘সিস্টার্স অব লরেটো’-তে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় সুদূর ভারতের উদ্দেশ্যে।

কলকাতার রাজপথে 
ভারতে এসে তিনি দার্জিলিং ও কলকাতায় শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সেন্ট মেরি’র চার দেয়ালের সুশোভিত শ্রেণিকক্ষ তার আত্মার তীব্র ব্যাকুলতা মেটাতে পারেনি। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, দার্জিলিংগামী এক ট্রেনে চেপে যাওয়ার সময় তিনি যেন শুনতে পেলেন সেই দৈব আহ্বান—”দরিদ্রদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্রদের সেবা করো।”

পবিত্র সিস্টারহুডের পোশাক ত্যাগ করে তিনি গায়ে জড়িয়ে নিলেন নীল সীমানার একটি সাধারণ সাদা সুতির শাড়ি। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’। কলকাতার ফুটপাত, নর্দমার পাশ থেকে কুড়িয়ে আনা মুমূর্ষু, কুষ্ঠরোগী ও অনাথ শিশুদের নিজের হাতে পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘নির্মল হৃদয়’ ও ‘শিশু ভবন’। যার কেউ নেই, মাদার তেরেসা হলেন তার আশ্রয়।

সংগ্রাম, প্রতিবন্ধকতা
মাদার তেরেসার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। প্রথম দিকে তার হাতে কোনো অর্থ ছিল না, ছিল না কোনো স্থায়ী ঠিকানা। রাজপথে ভিক্ষা করার মতো অভিজ্ঞতাও তাকে অর্জন করতে হয়েছে কেবল আশ্রয়হীনদের একবেলা খাবারের জন্য। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ভিড়ে একজন বিদেশি নারীর এই কাজকে শুরুতে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু তার অস্ত্র ছিল দুটি—অসীম ধৈর্য আর শর্তহীন ভালোবাসা। কুষ্ঠরোগের মতো ছোঁয়াচে ব্যাধিতে যখন স্বজনেরাও রোগীকে ত্যাগ করত, মাদার তখন তাদের ক্ষত ধুইয়ে দিয়ে কপালে হাত রাখতেন। কোনো সমালোচনার ঝড় তার বিশ্বাসের প্রদীপকে নেভাতে পারেনি।

শেষ যাত্রার অমলিন স্মৃতি
জগতের অবহেলিত মানুষকে দেওয়া তার এই ভালোবাসার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। ১৯৭৯ সালে তিনি লাভ করেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। নোবেল কমিটি যখন তাকে মহামূল্যবান নৈশভোজের প্রস্তাব দেয়, মাদার বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে সেই অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া ভারতরত্নসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননায় তিনি ভূষিত হন, কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মুমূর্ষু কোনো মানুষের মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি।

১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই আলোর প্রদীপটি নিভে যায়। তবে তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন এক অমলিন দর্শন।

 জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ তার জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হয় তার সেই অমর বাণী—”আমরা হয়তো সবাই বড় বড় কাজ করতে পারব না, কিন্তু ছোট ছোট কাজগুলো করতে পারব পরম ভালোবাসা দিয়ে।” মাদার তেরেসা কোনো ধর্ম বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নন; তিনি মানবতার সেই শাশ্বত সুর, যা আমাদের শেখায়—হাতে হাত রেখে ভালোবাসার একটি ছোট দীপ জ্বেলে কীভাবে ধরণীর সমস্ত অন্ধকার দূর করা যায়। মহীয়সী এই জননীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএাচিবি

Tag :

কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয়

স্রষ্টার করুণা যখন মানবরূপে: নিঃস্বদের আশ্রয়দাত্রী মাদার তেরেসা

আপডেট সময় ০৫:০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট। মেসিডোনিয়ার স্কোপিয়ে শহরে যখন প্রথম আলো ফুটল, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি—ছোট্ট এক শিশু একদিন বিশ্বমানচিত্রের বিষাদগ্রস্ত কোণগুলোতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আলো ছড়াবে। পিতৃদত্ত নাম ছিল অ্যাগনেস গনঝা বোজাক্সিউ। কিন্তু ইতিহাস তাকে ধারণ করেছে ‘মাদার তেরেসা’ নামে—একটি নাম, যা কেবল কোনো মানবীর নয়, বরং করুণা ও আর্তমানবতার এক চিরন্তন প্রতীক।

শৈশবেই মানবপ্রেম
অ্যাগনেসের বেড়ে ওঠার দিনগুলো খুব মসৃণ ছিল না। মাত্র আট বছর বয়সে বাবা নিকোলা বোজাক্সিউকে হারিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তার পরিবার। তবে মা ড্রানাফিলের অকৃত্রিম ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবপ্রেম অ্যাগনেসের কচি মনে গভীর দাগ কেটেছিল। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই বালিকা শৈশব থেকেই অনুভব করতেন—স্রষ্টার আরাধনা কেবল চার্চের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তার আসল রূপ লুকিয়ে আছে নিপীড়িত মানুষের সেবায়। ১৮ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে তিনি আয়ারল্যান্ডের ‘সিস্টার্স অব লরেটো’-তে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় সুদূর ভারতের উদ্দেশ্যে।

কলকাতার রাজপথে 
ভারতে এসে তিনি দার্জিলিং ও কলকাতায় শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সেন্ট মেরি’র চার দেয়ালের সুশোভিত শ্রেণিকক্ষ তার আত্মার তীব্র ব্যাকুলতা মেটাতে পারেনি। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, দার্জিলিংগামী এক ট্রেনে চেপে যাওয়ার সময় তিনি যেন শুনতে পেলেন সেই দৈব আহ্বান—”দরিদ্রদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্রদের সেবা করো।”

পবিত্র সিস্টারহুডের পোশাক ত্যাগ করে তিনি গায়ে জড়িয়ে নিলেন নীল সীমানার একটি সাধারণ সাদা সুতির শাড়ি। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’। কলকাতার ফুটপাত, নর্দমার পাশ থেকে কুড়িয়ে আনা মুমূর্ষু, কুষ্ঠরোগী ও অনাথ শিশুদের নিজের হাতে পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘নির্মল হৃদয়’ ও ‘শিশু ভবন’। যার কেউ নেই, মাদার তেরেসা হলেন তার আশ্রয়।

সংগ্রাম, প্রতিবন্ধকতা
মাদার তেরেসার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। প্রথম দিকে তার হাতে কোনো অর্থ ছিল না, ছিল না কোনো স্থায়ী ঠিকানা। রাজপথে ভিক্ষা করার মতো অভিজ্ঞতাও তাকে অর্জন করতে হয়েছে কেবল আশ্রয়হীনদের একবেলা খাবারের জন্য। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ভিড়ে একজন বিদেশি নারীর এই কাজকে শুরুতে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু তার অস্ত্র ছিল দুটি—অসীম ধৈর্য আর শর্তহীন ভালোবাসা। কুষ্ঠরোগের মতো ছোঁয়াচে ব্যাধিতে যখন স্বজনেরাও রোগীকে ত্যাগ করত, মাদার তখন তাদের ক্ষত ধুইয়ে দিয়ে কপালে হাত রাখতেন। কোনো সমালোচনার ঝড় তার বিশ্বাসের প্রদীপকে নেভাতে পারেনি।

শেষ যাত্রার অমলিন স্মৃতি
জগতের অবহেলিত মানুষকে দেওয়া তার এই ভালোবাসার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। ১৯৭৯ সালে তিনি লাভ করেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। নোবেল কমিটি যখন তাকে মহামূল্যবান নৈশভোজের প্রস্তাব দেয়, মাদার বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে সেই অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া ভারতরত্নসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননায় তিনি ভূষিত হন, কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মুমূর্ষু কোনো মানুষের মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি।

১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই আলোর প্রদীপটি নিভে যায়। তবে তিনি শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন এক অমলিন দর্শন।

 জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজ তার জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হয় তার সেই অমর বাণী—”আমরা হয়তো সবাই বড় বড় কাজ করতে পারব না, কিন্তু ছোট ছোট কাজগুলো করতে পারব পরম ভালোবাসা দিয়ে।” মাদার তেরেসা কোনো ধর্ম বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নন; তিনি মানবতার সেই শাশ্বত সুর, যা আমাদের শেখায়—হাতে হাত রেখে ভালোবাসার একটি ছোট দীপ জ্বেলে কীভাবে ধরণীর সমস্ত অন্ধকার দূর করা যায়। মহীয়সী এই জননীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলা৭১নিউজ/এসএাচিবি