ঢাকা ০২:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিনে কতটুকু চিনি গ্রহণ করা নিরাপদ?

মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস কিংবা সকালের কফি— নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় চিনির উপস্থিতি সাধারণ একটি বিষয়।

তবে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, অজান্তে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করার পাশাপাশি মারাত্মক সব দীর্ঘমেয়াদি রোগ ডেকে আনছে।

বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় চিনি গ্রহণের হার নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। রক্তে শর্করার ক্ষতিকর ওঠানামা রোধ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে চিনি খাওয়ার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সীমা জানা জরুরি।

দৈনিক কতটুকু চিনি খাওয়া নিরাপদ?

‘আমেরিকান ডায়েটারি গাইডলাইনস (ডিজিএ)’-এর পুষ্টিবিদেরা প্রতি বেলার খাবারে সংযুক্ত চিনির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, ‘আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ)-এর বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা অনুযায়ী:

সাধারণ পরিমাপ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোট ক্যালরির সর্বোচ্চ ৬ শতাংশের বেশি চিনি থেকে আসা উচিত নয়।

একটি সাধারণ ২,০০০ ক্যালরির খাদ্যাভ্যাসে এর পরিমাণ হল সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৯ চা-চামচ বা আনুমানিক ৩০ গ্রাম।

অথচ পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে একজন মানুষ দৈনিক প্রায় ১৭ চা-চামচ চিনি গ্রহণ করেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

প্রাকৃতিক বনাম যুক্ত চিনি

হেল্থ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ও পুষ্টি গবেষক ইসাবেল ভাসকুয়েজ বলেন, “ফলমূল, শাকসবজি বা আস্ত শস্যের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ক্ষতিকর নয়; কারণ এগুলোতে প্রচুর ফাইবার বা আঁশ ও খনিজ উপাদান থাকে।”

“আঁশ পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি বা ‘স্পাইক’ রোধ করে। তবে সাধারণ চিনি, সিরাপ বা প্রক্রিয়াজাত মিষ্টিতে থাকা ‘যুক্ত চিনি’ খুব দ্রুত রক্তে মিশে ইনসুলিনের ভারসাম্য ওলটপালট করে দেয়।”

অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের শারীরিক ঝুঁকি

ফ্যাটি লিভার রোগ: কোমল পানীয় বা চিনিযুক্ত খাবারে প্রচুর পরিমাণে ‘ফ্রুক্টোজ’ থাকে। এই ফ্রুক্টোজ যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমিয়ে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার’ রোগ তৈরি করে, যা পরে লিভারের কার্যক্ষমতা অবশ করে দেয়।

হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: অতিরিক্ত চিনি মানেই শরীরে বাড়তি ক্যালরি জমাকরণ। এই মেদ ধমনী সংকুচিত করে দেয়, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি: বিশেষ করে তরল মিষ্টি বা মিষ্টি পানীয় মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে দাঁতের এনামেল স্তর ধ্বংস করে এবং ডেন্টাল ক্যারিস বা ক্যাভিটির সৃষ্টি করে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস: নিয়মিত চিনিযুক্ত কফি, জুস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরের কোষগুলোর ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়, যা পরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

চিনি কমানোর ৫টি সহজ নিয়ম

লেবেল পড়ার অভ্যাস: যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার আগে বোতলের পুষ্টি লেবেলে ‘টোটাল সুগার’ এবং ‘অ্যাডেড সুগার’ আলাদাভাবে দেখে নেওয়া উচিত।

মিষ্টি পানীয় বর্জন: কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস বা রেডিমেইড চা-কফির বদলে সাধারণ ডাবের পানি, লেবুর রস বা চিনি ছাড়া চা বেছে নেওয়া নিরাপদ।

ঘরে তৈরি মিষ্টির ব্যবহার: বাজার থেকে মিষ্টি দই বা ক্যান্ডি না কিনে, টক দইয়ের সঙ্গে তাজা ফলমূল বা সামান্য খাঁটি মধু মিশিয়ে খাওয়া উপকারী।

প্রোটিন ও আঁশের বর্ম: সকাল বা বিকালের নাস্তায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভালো ফ্যাট বা চর্বি ও আঁশযুক্ত খাবার (যেমন বাদাম ও বীজ) রাখলে রাতে মিষ্টি খাওয়ার তীব্র বাতিক কমিয়ে দেয়।

আর্দ্র থাকা: মস্তিস্ক অনেক সময় পানিশূন্যতাকে ক্ষুধার সংকেত ভেবে মিষ্টির প্রতি প্রলোভন তৈরি করে; তাই কোষে কোষে সতেজতা ধরে রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

দিনে কতটুকু চিনি গ্রহণ করা নিরাপদ?

আপডেট সময় ১২:১৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস কিংবা সকালের কফি— নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় চিনির উপস্থিতি সাধারণ একটি বিষয়।

তবে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, অজান্তে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করার পাশাপাশি মারাত্মক সব দীর্ঘমেয়াদি রোগ ডেকে আনছে।

বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় চিনি গ্রহণের হার নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। রক্তে শর্করার ক্ষতিকর ওঠানামা রোধ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে চিনি খাওয়ার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সীমা জানা জরুরি।

দৈনিক কতটুকু চিনি খাওয়া নিরাপদ?

‘আমেরিকান ডায়েটারি গাইডলাইনস (ডিজিএ)’-এর পুষ্টিবিদেরা প্রতি বেলার খাবারে সংযুক্ত চিনির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, ‘আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ)-এর বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা অনুযায়ী:

সাধারণ পরিমাপ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোট ক্যালরির সর্বোচ্চ ৬ শতাংশের বেশি চিনি থেকে আসা উচিত নয়।

একটি সাধারণ ২,০০০ ক্যালরির খাদ্যাভ্যাসে এর পরিমাণ হল সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৯ চা-চামচ বা আনুমানিক ৩০ গ্রাম।

অথচ পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে একজন মানুষ দৈনিক প্রায় ১৭ চা-চামচ চিনি গ্রহণ করেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

প্রাকৃতিক বনাম যুক্ত চিনি

হেল্থ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ও পুষ্টি গবেষক ইসাবেল ভাসকুয়েজ বলেন, “ফলমূল, শাকসবজি বা আস্ত শস্যের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ক্ষতিকর নয়; কারণ এগুলোতে প্রচুর ফাইবার বা আঁশ ও খনিজ উপাদান থাকে।”

“আঁশ পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি বা ‘স্পাইক’ রোধ করে। তবে সাধারণ চিনি, সিরাপ বা প্রক্রিয়াজাত মিষ্টিতে থাকা ‘যুক্ত চিনি’ খুব দ্রুত রক্তে মিশে ইনসুলিনের ভারসাম্য ওলটপালট করে দেয়।”

অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের শারীরিক ঝুঁকি

ফ্যাটি লিভার রোগ: কোমল পানীয় বা চিনিযুক্ত খাবারে প্রচুর পরিমাণে ‘ফ্রুক্টোজ’ থাকে। এই ফ্রুক্টোজ যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমিয়ে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার’ রোগ তৈরি করে, যা পরে লিভারের কার্যক্ষমতা অবশ করে দেয়।

হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: অতিরিক্ত চিনি মানেই শরীরে বাড়তি ক্যালরি জমাকরণ। এই মেদ ধমনী সংকুচিত করে দেয়, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি: বিশেষ করে তরল মিষ্টি বা মিষ্টি পানীয় মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে দাঁতের এনামেল স্তর ধ্বংস করে এবং ডেন্টাল ক্যারিস বা ক্যাভিটির সৃষ্টি করে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস: নিয়মিত চিনিযুক্ত কফি, জুস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরের কোষগুলোর ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়, যা পরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

চিনি কমানোর ৫টি সহজ নিয়ম

লেবেল পড়ার অভ্যাস: যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার আগে বোতলের পুষ্টি লেবেলে ‘টোটাল সুগার’ এবং ‘অ্যাডেড সুগার’ আলাদাভাবে দেখে নেওয়া উচিত।

মিষ্টি পানীয় বর্জন: কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস বা রেডিমেইড চা-কফির বদলে সাধারণ ডাবের পানি, লেবুর রস বা চিনি ছাড়া চা বেছে নেওয়া নিরাপদ।

ঘরে তৈরি মিষ্টির ব্যবহার: বাজার থেকে মিষ্টি দই বা ক্যান্ডি না কিনে, টক দইয়ের সঙ্গে তাজা ফলমূল বা সামান্য খাঁটি মধু মিশিয়ে খাওয়া উপকারী।

প্রোটিন ও আঁশের বর্ম: সকাল বা বিকালের নাস্তায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভালো ফ্যাট বা চর্বি ও আঁশযুক্ত খাবার (যেমন বাদাম ও বীজ) রাখলে রাতে মিষ্টি খাওয়ার তীব্র বাতিক কমিয়ে দেয়।

আর্দ্র থাকা: মস্তিস্ক অনেক সময় পানিশূন্যতাকে ক্ষুধার সংকেত ভেবে মিষ্টির প্রতি প্রলোভন তৈরি করে; তাই কোষে কোষে সতেজতা ধরে রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস