ইসলামাবাদের আদিয়ালা জেল থেকে হঠাৎ স্থানান্তরিত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে পুনরায় কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল থেকে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করার পর চিকিৎসকরা তাকে ফের হেফাজতে রাখার সবুজ সংকেত দিলে তাকে কড়া নিরাপত্তায় নিজের সেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পিটিআই মুখপাত্র ও স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শীর্ষ আদালতের নির্দেশে ইমরান খানকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেল থেকে ইসলামাবাদে অবস্থিত শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এক আদেশে বলা হয়েছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের অবনতিজনিত উদ্বেগ বিবেচনা করে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের উপযোগী হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। আদালতের এই নির্দেশনায় তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ একাধিক চিকিৎসকের একটি বিশেষ প্যানেল গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারারুদ্ধ থাকা ৭৩ বছর বয়সী এই নেতার আইনজীবীরা বেশ কিছুদিন ধরেই আদালতে অভিযোগ করে আসছিলেন যে, কারাগারে অবস্থানকালে তার স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এমনকি তিনি তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে হারিয়েছেন। যদিও শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন সাবেক এই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তবে পাকিস্তানের বর্তমান সরকার এবং প্রশাসন সেই দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
সুপ্রিম কোর্ট যখন ইমরানকে শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তখন শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রথম দিকে নির্দেশ কার্যকর করার ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা চেয়ে শীর্ষ আদালতে একটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করে। সরকারপক্ষের তরফ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের রিপোর্ট অনুযায়ী ইমরান খানের এমন কোনো জরুরি শারীরিক অবস্থা নেই যার জন্য তাকে অবিলম্বে বেসরকারী কোনো হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার এ বিষয়ে বলেছিলেন, প্রচলিত আইন ও কারাবিধি অনুযায়ী একজন সাজাপ্রাপ্ত বন্দির চিকিৎসা হয় জেলের ভেতরেই হওয়া উচিত, নতুবা তাকে যেকোনো সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা যেতে পারে। তিনি আরও আবেদন করেছিলেন, কোনো বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বদলে সরকারি হাসপাতালে নিয়েই ইমরানের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হোক। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিলম্বিত করার চেষ্টার প্রেক্ষাপটে বিরোধী দল পিটিআই চরম হুঁশিয়ারি জারি করে জানায়, আদালতের নির্দেশিত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হাসপাতালে স্থানান্তর না করা হলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করবে। এই আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মুখেই অবশেষে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ত্বরান্বিত হয় এবং পরবর্তীতে দেশটির সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী জানান যে, আদালত অবমাননা বা নির্দেশ অমান্য করার কোনো ইচ্ছা সরকারের ছিল না এবং তারা আদালতের পূর্ণ আদেশ মানতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে ইমরান খানকে হাসপাতালটিতে নেয়া হয়। সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকদের বিশেষ দলটি দীর্ঘ সময় ধরে তার স্বাস্থ্যের সার্বিক পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে। পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকদের প্যানেল তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো নিরাপদ বলে জানানোর সাথে সাথেই তাকে দ্রুত কড়া প্রহরায় আডিয়ালা জেলে ফিরিয়ে আনা হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে স্থানান্তরের পুরো সময়জুড়ে হাসপাতালের বাইরে এবং আশপাশের এলাকায় পিটিআই-এর বিপুলসংখ্যক সমর্থক ও দলীয় কর্মী জড়ো হন, যারা শেষরাত পর্যন্ত তাদের নেতার স্বাস্থ্যের খবর পেতে উদ্বেলিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকেন।
সূত্র: ডন
বাংলা৭১নিউজ/জেএস
























