উৎসব মানেই আনন্দের সার্বজনীন বার্তা। তবে আমাদের দেশে উৎসব এলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের অপসংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
উৎসবের এই মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে এক অনন্য ও মানবিক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ প্রতিপাদ্যে চালু করা ‘ফেস্টিভ সেল’ কার্যক্রমের মাধ্যমে চট্টগ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের প্রকৃত আনন্দ। সামনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজাসহ অন্যান্য ধর্মের উৎসব উপলক্ষ্যে এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে উৎসবের সময় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সবাই আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করতে পারে।
কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক উল্টোটি হয়। বছরের অন্য সময় তো ব্যবসায়ীরা মুনাফা করেন, যে কোনো ধর্মীয় উৎসবে কেন সবাই এক সঙ্গে উৎসব পালন করতে পারবে না? আমরা পুরোনো ধারণা থেকে বের হতে উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছি। সামনে যে কোনো ধর্মের উৎসবে এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, খাতুনগঞ্জ নিয়ে বহুদিনের একটি বদনাম ছিল যে আমরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা করি ও দাম বাড়িয়ে দেই।
আমরা ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে ডিসিকে যে সহযোগিতা করেছি, তার ফল স্বরূপ আমরা সে বদনাম থেকে বের হতে পেরেছি। এ ধরনের সম্মাননা আমরা আগে কখনও পাইনি।
পটভূমি ও প্রাথমিক ভাবনা :
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও ভোগ্যপণ্যের প্রধান হাব হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও টেরিবাজারের ওপর নির্ভর করে দেশব্যাপী নিত্যপণ্যের বাজারদর। উন্নত বিশ্বে ক্রিসমাস সেল বা ব্ল্যাক ফ্রাইডের মতো উৎসবে দাম কমানোর যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা বাংলাদেশে চালুর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল কারিগর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক থাকাকালে ২০২৫ সালের ১ মার্চ তিনি প্রথম উৎসব উপলক্ষে মূল্যছাড়ের এ ধারণা সামনে আনেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামে যোগদানের পর ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খাতুনগঞ্জ পরিদর্শন এবং ধারাবাহিক অংশীজন বৈঠকের মাধ্যমে এই রূপকল্প বাস্তবে রূপ দেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও মূল্যছাড় :
জেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক উদ্যোগের পর গত ১৪ মে সর্বসম্মতিক্রমে দাম কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় এবং ১৮ মে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ফেস্টিভ সেল’ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এর পরদিনই চট্টগ্রামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বতঃস্ফূর্ত মূল্যছাড়ের হিড়িক পড়ে।
পাইকারি ও খুচরা বাজার :
আদা, রসুন, পেঁয়াজ ও মশলাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যে ১০% থেকে ৩৩% পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হয়। গত ২৫ থেকে ২৭ জুন সুপারশপ স্বপ্ন, আগোরা, শপিংব্যাগ ও বাস্কেট-এর ৩৩টি শাখায় ৩৯টি পণ্যে ৫% থেকে ১৫% মূল্যছাড় দেওয়া হয়। খুলশি মার্ট তাদের ৮৩টি পণ্যে ৫% থেকে ৪৭% পর্যন্ত মূল্যছাড় দেয়।
কঠোর মনিটরিং ও সমন্বিত পদক্ষেপ :
ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পুলিশ, র্যাব, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, কৃষি বিপণন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দপ্তরকে সাথে নিয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
একই সঙ্গে আদার বাজারে অস্থিরতা সামাল দিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় দ্রুততম সময়ে বন্দরে আটকে থাকা ৩৭ কনটেইনার আদা খালাসের ব্যবস্থা করে জেলা প্রশাসন। ফলে মাত্র দুদিনে খাতুনগঞ্জে আদার কেজিপ্রতি ২০০ টাকা থেকে কমে ১২০-১৩০ টাকায় নেমে আসে।
সর্বমহলে প্রশংসা ও সম্মাননা প্রদান :
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এবারের কোরবানির ঈদে বাজার পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক ভালো ও সহনীয় ছিল।
কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে অবদান রাখা ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননাপত্র প্রদান করে জেলা প্রশাসন। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে প্রথম ব্যবসায়ীদের দাম কমানোর জন্য সম্মাননা দেওয়া হলো। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার এ প্রথার পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন।
র্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান এই মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও শাস্তির বদলে সম্মাননা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের এই মানবিক ও বাজারবান্ধব মডেলটিকে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় এক ‘ঐতিহাসিক বাঁক বদল’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























