ঢাকা ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ? Logo উড্ডয়নের আগমুহূর্তে বিমানের উইন্ডস্ক্রিনে ফাটল, নেপালে আটকা ১২৭ যাত্রী Logo ৬ মাস পূর্তি, গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা Logo ১০০তম জন্মদিন উদযাপনে নাতির সাথে আকাশ থেকে ঝাঁপ দাদির Logo ঘুমের মধ্যেই মারা গেলেন ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী Logo দেশের সব জেলা প্রশাসকের জন্য ১৪ নির্দেশনা Logo ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ Logo ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় চরম ধস নেমেছিল : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী Logo শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়নে ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী Logo ওমরাহ ভিসা থাকলেও যাওয়া যাবে না সৌদি, মানতে হবে শর্ত

আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ?

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দ। ব্যবিলনের রাজপ্রাসাদে তখন বসন্তের শেষ দিক। মাত্র ৩২ বছর বয়সি এক যুবক, যার পায়ের নিচে এসে লুটিয়ে পড়েছে অর্ধেক পৃথিবী, তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছেন।

বলছি মহাবীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা। টানা ১৩ দিন জ্বরে ভুগে, পেটে ব্যথা আর শারীরিক অসারতা নিয়ে তিনি যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, থমকে গিয়েছিল গোটা ইতিহাস। কিন্তু তার সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র! এই অমীমাংসিত প্রশ্নটি গত দুই হাজার বছর ধরে ইতিহাসবিদদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকের নতুন এক তত্ত্বে এই প্রাচীন রহস্যে যোগ হয়েছে বিজ্ঞানের নতুন মাত্রা। আলেকজান্ডারের মৃত্যু কি তবে কোনো পৌরাণিক অভিশাপ ছিল, নাকি প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মরণঘাতী বিষ?

আলেকজান্ডারের অসুস্থতার শুরুটা হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ এক ভোজসভায়। সারারাত আমোদ-প্রমোদের মাঝে হঠাৎ করেই তিনি যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠেন। এরপরই শুরু হয় জ্বর, পিঠে ব্যথা আর দুর্বলতা। দিন যত যাচ্ছিল, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। একসময় তার কথা বলার শক্তি হারিয়ে যায়, শরীর অবশ হয়ে আসে।

মজার ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর প্রায় ছয় দিন পর্যন্ত আলেকজান্ডারের মৃতদেহে পচনের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। তৎকালীন গ্রিকরা ভেবেছিল, আলেকজান্ডার সাধারণ মানুষ নন, বরং স্বয়ং ঈশ্বর; তাই তার শরীর পচছে না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে অন্য কথা। হতে পারে তিনি তখনও পুরোপুরি মারা যাননি, বরং কোমায় ছিলেন কিংবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় কেবল বেঁচে ছিলেন। তবে প্রাচীন কাল থেকেই একটি সন্দেহ ডালপালা মেলেছিল—তাকে ‘বিষ প্রয়োগে হত্যা’ করা হয়েছে।

প্রাচীন ইতিহাসবিদ দিওদোরাস বা প্লুতার্কের লেখায় বারবার একটি বিষের নাম উঠে এসেছে, স্টিয়াক্স নদীর জল। গ্রিক পুরাণে এই নদীটি ‘পাতালপুরী’ বা ‘নরকের প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত। বলা হতো, এই নদীর জল এতটাই বিষাক্ত যে তা পান করলে মৃত্যু অবধারিত। এমনকি এটি তামা বা মাটির পাত্রকেও গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক অ্যাড্রিয়েন মেয়র এই পৌরাণিক গল্পের ভেতরেই বিজ্ঞানের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তিনি দাবি করছেন, স্টিয়াক্স কোনো কাল্পনিক নদী নয়, বরং গ্রিসের মাভরোনেরি ঝরনাই হলো সেই ‘অভিশপ্ত’ জলধারা। প্রাচীন মানুষ বিশ্বাস করত, এই ঝরনার জলই আলেকজান্ডারকে মারার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ ঝরনার জল কীভাবে এতটা মরণঘাতী হতে পারে?

অ্যাড্রিয়েন মেয়রের গবেষণা বলছে, স্টিয়াক্স নদীর আশপাশের এলাকাটি চুনাপাথরে ঘেরা। এখানকার গুহা বা পাথরের গায়ে এক ধরনের আবরণ বা ‘ক্রাস্ট’ জমে থাকে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই চুনাপাথরের স্তরে এমন কিছু আণুবীক্ষণিক জীব বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে যা বিষাক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ উপাদানটির নাম ‘ক্যালিসিয়ামাইসিন’। এটি এমন এক শক্তিশালী বিষ যা ডিএনএ ধ্বংস করে দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক চিকিৎসায় এটি ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও, অপরিশোধিত অবস্থায় এটি সাপের বিষ বা রাইসিনের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক। এই বিষটি যদি মদের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ঠিক সেই উপসর্গগুলোই দেখা দেবে যা আলেকজান্ডারের হয়েছিল। প্রথমে পেটে ব্যথা, তারপর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়া এবং সবশেষে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু। এটি সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র আর যকৃতকে আক্রমণ করে, যার ফলে মৃত্যু হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগে। ইতিহাস বলে, আলেকজান্ডারও হঠাৎ মারা যাননি, বরং তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

মেয়রের গবেষণায় দ্বিতীয় আরেকটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, সেটি হলো বিষাক্ত লাইকেন বা শ্যাওলা। স্টিয়াক্স নদীর পাথরের গায়ে কালো রঙের এক ধরনের ছত্রাক বা শ্যাওলা জন্মায়। প্রাচীন বর্ণনায় এই নদীকে প্রায়ই ‘কালো জল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই শ্যাওলা থেকে নির্গত অক্সালিক অ্যাসিড ধাতব পাত্রকেও ক্ষয় করে ফেলতে পারে।

প্রাচীনকালের মানুষ হয়তো দেখেছিল যে, এই নদীর জল পান করার পর গবাদি পশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই তৈরি হয়েছে স্টিয়াক্স নদীর ‘মরণঘাতী’ গুঞ্জন। কোনো ষড়যন্ত্রকারী হয়তো পাহাড়ের গা থেকে সেই বিষাক্ত স্তর সংগ্রহ করে আলেকজান্ডারের মদের পাত্রে মিশিয়ে দিয়েছিল। কারণ ক্যালিসিয়ামাইসিন অ্যালকোহলে খুব সহজেই মিশে যায় এবং এর স্বাদ বা গন্ধ আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব।

আলেকজান্ডারকে বিষ দেওয়ার তালিকায় অনেকের নামই সন্দেহভাজন হিসেবে এসেছিল। কেউ আঙুল তুলেছিলেন তার সেনাপতি আন্তিপাতারের দিকে, কেউ বা সন্দেহ করেছিলেন তার শিক্ষক অ্যারিস্টটলকে। যদিও অ্যারিস্টটলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনি, কিন্তু বলা হয় তিনি আলেকজান্ডারের বদলে যাওয়া স্বৈরাচারী আচরণে ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, আলেকজান্ডারের মৃত্যুর দশ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। ডোমেনিকো ইন্দুানোর আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, অসুস্থ আলেকজান্ডার তার চিকিৎসক ফিলিপের দেওয়া ওষুধ খাচ্ছেন। অথচ সেনাপতি পারমেনিয়ানো তাকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছিলেন যে, ওই ওষুধে ‘বিষ’ মেশানো আছে। আলেকজান্ডার সেই সতর্কতা অগ্রাহ্য করে চিকিৎসকের ওপর আস্থা রেখেছিলেন এবং সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু দশ বছর পর ব্যবিলনে হয়তো তার সেই ভাগ্য আর সহায় ছিল না।

অ্যাড্রিয়েন মেয়রের এই গবেষণা কি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে আলেকজান্ডারকে বিষ প্রয়োগেই মারা হয়েছিল? গবেষক নিজেই বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন, না। তিনি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। আলেকজান্ডারের প্রকৃত মৃত্যুর রহস্য জানতে হলে প্রয়োজন তার দেহাবশেষের ফরেনসিক পরীক্ষা, যা আজ প্রায় অসম্ভব। কারণ তার সমাধিটিই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

তবে মেয়রের এই তত্ত্ব আমাদের একটি বড় সত্যের মুখোমুখি করে। তা হলো, প্রাচীন মানুষের পৌরাণিক গল্পের অন্তরালে অনেক সময় প্রাকৃতিক সত্য লুকিয়ে থাকে। যে স্টিয়াক্স নদীকে আমরা কেবল ‘নরকের নদী’ হিসেবে জানতাম, বিজ্ঞান দেখাচ্ছে সেটি আসলে এক ‘মরণঘাতী প্রাকৃতিক বিষের’ আধার হতে পারে।

আলেকজান্ডার কি টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া কিংবা লিভার সিরোসিসে মারা গিয়েছিলেন? নাকি তার সবচেয়ে কাছের কোনো মানুষ সেই স্টিয়াক্স নদীর বিষ তার পেয়ালায় ঢেলে দিয়েছিল? এই উত্তর হয়তো কোনোদিন পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্যবিলনের সেই অন্ধকার রাত আর বিশ্বজয়ী বীরের শেষ ১৩ দিনের আর্তনাদ আজও ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও লাইভ সায়েন্স

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ?

আলেকজান্ডারকে কি সত্যিই বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ?

আপডেট সময় ১২:১৫:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দ। ব্যবিলনের রাজপ্রাসাদে তখন বসন্তের শেষ দিক। মাত্র ৩২ বছর বয়সি এক যুবক, যার পায়ের নিচে এসে লুটিয়ে পড়েছে অর্ধেক পৃথিবী, তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছেন।

বলছি মহাবীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা। টানা ১৩ দিন জ্বরে ভুগে, পেটে ব্যথা আর শারীরিক অসারতা নিয়ে তিনি যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, থমকে গিয়েছিল গোটা ইতিহাস। কিন্তু তার সেই মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র! এই অমীমাংসিত প্রশ্নটি গত দুই হাজার বছর ধরে ইতিহাসবিদদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকের নতুন এক তত্ত্বে এই প্রাচীন রহস্যে যোগ হয়েছে বিজ্ঞানের নতুন মাত্রা। আলেকজান্ডারের মৃত্যু কি তবে কোনো পৌরাণিক অভিশাপ ছিল, নাকি প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মরণঘাতী বিষ?

আলেকজান্ডারের অসুস্থতার শুরুটা হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ এক ভোজসভায়। সারারাত আমোদ-প্রমোদের মাঝে হঠাৎ করেই তিনি যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠেন। এরপরই শুরু হয় জ্বর, পিঠে ব্যথা আর দুর্বলতা। দিন যত যাচ্ছিল, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। একসময় তার কথা বলার শক্তি হারিয়ে যায়, শরীর অবশ হয়ে আসে।

মজার ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর প্রায় ছয় দিন পর্যন্ত আলেকজান্ডারের মৃতদেহে পচনের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। তৎকালীন গ্রিকরা ভেবেছিল, আলেকজান্ডার সাধারণ মানুষ নন, বরং স্বয়ং ঈশ্বর; তাই তার শরীর পচছে না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে অন্য কথা। হতে পারে তিনি তখনও পুরোপুরি মারা যাননি, বরং কোমায় ছিলেন কিংবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় কেবল বেঁচে ছিলেন। তবে প্রাচীন কাল থেকেই একটি সন্দেহ ডালপালা মেলেছিল—তাকে ‘বিষ প্রয়োগে হত্যা’ করা হয়েছে।

প্রাচীন ইতিহাসবিদ দিওদোরাস বা প্লুতার্কের লেখায় বারবার একটি বিষের নাম উঠে এসেছে, স্টিয়াক্স নদীর জল। গ্রিক পুরাণে এই নদীটি ‘পাতালপুরী’ বা ‘নরকের প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত। বলা হতো, এই নদীর জল এতটাই বিষাক্ত যে তা পান করলে মৃত্যু অবধারিত। এমনকি এটি তামা বা মাটির পাত্রকেও গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক অ্যাড্রিয়েন মেয়র এই পৌরাণিক গল্পের ভেতরেই বিজ্ঞানের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তিনি দাবি করছেন, স্টিয়াক্স কোনো কাল্পনিক নদী নয়, বরং গ্রিসের মাভরোনেরি ঝরনাই হলো সেই ‘অভিশপ্ত’ জলধারা। প্রাচীন মানুষ বিশ্বাস করত, এই ঝরনার জলই আলেকজান্ডারকে মারার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সাধারণ ঝরনার জল কীভাবে এতটা মরণঘাতী হতে পারে?

অ্যাড্রিয়েন মেয়রের গবেষণা বলছে, স্টিয়াক্স নদীর আশপাশের এলাকাটি চুনাপাথরে ঘেরা। এখানকার গুহা বা পাথরের গায়ে এক ধরনের আবরণ বা ‘ক্রাস্ট’ জমে থাকে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই চুনাপাথরের স্তরে এমন কিছু আণুবীক্ষণিক জীব বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে যা বিষাক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ উপাদানটির নাম ‘ক্যালিসিয়ামাইসিন’। এটি এমন এক শক্তিশালী বিষ যা ডিএনএ ধ্বংস করে দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক চিকিৎসায় এটি ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও, অপরিশোধিত অবস্থায় এটি সাপের বিষ বা রাইসিনের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক। এই বিষটি যদি মদের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ঠিক সেই উপসর্গগুলোই দেখা দেবে যা আলেকজান্ডারের হয়েছিল। প্রথমে পেটে ব্যথা, তারপর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়া এবং সবশেষে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু। এটি সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র আর যকৃতকে আক্রমণ করে, যার ফলে মৃত্যু হতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগে। ইতিহাস বলে, আলেকজান্ডারও হঠাৎ মারা যাননি, বরং তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

মেয়রের গবেষণায় দ্বিতীয় আরেকটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, সেটি হলো বিষাক্ত লাইকেন বা শ্যাওলা। স্টিয়াক্স নদীর পাথরের গায়ে কালো রঙের এক ধরনের ছত্রাক বা শ্যাওলা জন্মায়। প্রাচীন বর্ণনায় এই নদীকে প্রায়ই ‘কালো জল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই শ্যাওলা থেকে নির্গত অক্সালিক অ্যাসিড ধাতব পাত্রকেও ক্ষয় করে ফেলতে পারে।

প্রাচীনকালের মানুষ হয়তো দেখেছিল যে, এই নদীর জল পান করার পর গবাদি পশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই তৈরি হয়েছে স্টিয়াক্স নদীর ‘মরণঘাতী’ গুঞ্জন। কোনো ষড়যন্ত্রকারী হয়তো পাহাড়ের গা থেকে সেই বিষাক্ত স্তর সংগ্রহ করে আলেকজান্ডারের মদের পাত্রে মিশিয়ে দিয়েছিল। কারণ ক্যালিসিয়ামাইসিন অ্যালকোহলে খুব সহজেই মিশে যায় এবং এর স্বাদ বা গন্ধ আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব।

আলেকজান্ডারকে বিষ দেওয়ার তালিকায় অনেকের নামই সন্দেহভাজন হিসেবে এসেছিল। কেউ আঙুল তুলেছিলেন তার সেনাপতি আন্তিপাতারের দিকে, কেউ বা সন্দেহ করেছিলেন তার শিক্ষক অ্যারিস্টটলকে। যদিও অ্যারিস্টটলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনি, কিন্তু বলা হয় তিনি আলেকজান্ডারের বদলে যাওয়া স্বৈরাচারী আচরণে ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, আলেকজান্ডারের মৃত্যুর দশ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। ডোমেনিকো ইন্দুানোর আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, অসুস্থ আলেকজান্ডার তার চিকিৎসক ফিলিপের দেওয়া ওষুধ খাচ্ছেন। অথচ সেনাপতি পারমেনিয়ানো তাকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছিলেন যে, ওই ওষুধে ‘বিষ’ মেশানো আছে। আলেকজান্ডার সেই সতর্কতা অগ্রাহ্য করে চিকিৎসকের ওপর আস্থা রেখেছিলেন এবং সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু দশ বছর পর ব্যবিলনে হয়তো তার সেই ভাগ্য আর সহায় ছিল না।

অ্যাড্রিয়েন মেয়রের এই গবেষণা কি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে আলেকজান্ডারকে বিষ প্রয়োগেই মারা হয়েছিল? গবেষক নিজেই বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন, না। তিনি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। আলেকজান্ডারের প্রকৃত মৃত্যুর রহস্য জানতে হলে প্রয়োজন তার দেহাবশেষের ফরেনসিক পরীক্ষা, যা আজ প্রায় অসম্ভব। কারণ তার সমাধিটিই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

তবে মেয়রের এই তত্ত্ব আমাদের একটি বড় সত্যের মুখোমুখি করে। তা হলো, প্রাচীন মানুষের পৌরাণিক গল্পের অন্তরালে অনেক সময় প্রাকৃতিক সত্য লুকিয়ে থাকে। যে স্টিয়াক্স নদীকে আমরা কেবল ‘নরকের নদী’ হিসেবে জানতাম, বিজ্ঞান দেখাচ্ছে সেটি আসলে এক ‘মরণঘাতী প্রাকৃতিক বিষের’ আধার হতে পারে।

আলেকজান্ডার কি টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া কিংবা লিভার সিরোসিসে মারা গিয়েছিলেন? নাকি তার সবচেয়ে কাছের কোনো মানুষ সেই স্টিয়াক্স নদীর বিষ তার পেয়ালায় ঢেলে দিয়েছিল? এই উত্তর হয়তো কোনোদিন পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্যবিলনের সেই অন্ধকার রাত আর বিশ্বজয়ী বীরের শেষ ১৩ দিনের আর্তনাদ আজও ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও লাইভ সায়েন্স

বাংলা৭১নিউজ/জেএস