রাজনীতি শব্দটির গায়ে আজকাল খুব সহজেই লেগে যায় আরাম-আয়েশ, ক্ষমতা ও বিলাসী জীবনের ধুলোবালি। কিন্তু সুবিধার সমীকরণের বাইরেও রাজনীতির এক ভিন্ন রূপ আছে—যেখানে থাকে জীবনের সুসময় বিসর্জন দেওয়ার অদম্য স্পর্ধা, কারান্তরালের অন্ধকার আর স্বজন হারানোর অশ্রুসজল ইতিহাস। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ঠিক তেমনই এক পোড়খাওয়া, প্রতিবাদী ও ত্যাগী রাজনীতিকের প্রতিকৃতি।
প্রবাসের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে রাজপথের ধূলোয়
ক্যারিয়ারের সূর্য যখন তুঙ্গে, প্রবাসের বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানজনক শিক্ষকতার পেশা এবং আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাজারো হাতছানি—সবকিছুকে এক নিমেষে তুচ্ছ করেছিলেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। সুবিধার জীবনের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজপথের অনিশ্চয়তা ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। দল যখনই যেখানে দায়িত্ব দিয়েছে, নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়ে নিষ্ঠার সাথে দাঁড়িয়েছেন সেখানে।
২০০১-২০০৬: ক্ষমতার আলোতেও নিষ্কলঙ্ক
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। ১/১১-এর মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সময় যখন একের পর এক রাজনীতিকের নামে দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় জমছিল, তখনো আলালের দিকে দুর্নীতির কোনো আঙুল ওঠানো সম্ভব হয়নি। দুর্নীতির ছায়া না পেয়ে তৎকালীন সরকার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল বিএনপির হয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে ১/১১ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার। লালমাটিয়ার বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, আর তার পর শুরু হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে ঘোরানোর নিপীড়নকাব্য।
রংপুর জেলগেট ও মায়ের শেষ প্রস্থান: এক করুণ ট্র্যাজেডি
আইনি লড়াই শেষে হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দয়তা থামেনি। রংপুর জেলগেট থেকে পুনরায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। টেলিভিশনের পর্দায় সন্তানের ওপর নেমে আসা এই অন্যায় পুনর্গ্রেপ্তারের দৃশ্য দেখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তাঁর রত্নগর্ভা মা। সন্তানের নির্মম নির্যাতনের খবর সইতে না পেরে ওই রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি সন্তান মায়ের শেষ দেখাটুকুও সময়মতো পাননি। ঘটনার দীর্ঘ তিন দিন পর মাত্র ১ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন মায়ের কাফনের কাপড় সরিয়ে শেষ বিদায় জানাতে হয়েছিল। রাজনীতির পেছনের এই ব্যক্তিগত ও অপূরণীয় ক্ষতি আর করুণ মাশুল খুব কম মানুষই অনুধাবন করতে পারে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের অগ্নিপরীক্ষা ও অবিচল আনুগত্য
এর পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৭টি বছর। কখনো অন্ধকার কারাগারের চার দেয়াল, আবার কখনো রাজপথে টিয়ার শেল ও বুলেটের মুখোমুখি হওয়া—এই ছিল তাঁর প্রাত্যহিক জীবন। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর যখন নতুন ভোরের সূর্য উদিত হলো, তখনো রাজনীতিতে নিজের ব্যক্তিগত প্রত্যাশার চেয়ে দলের সিদ্ধান্তকেই তিনি উর্ধ্বে তুলে ধরলেন।
মনোনয়ন না পাওয়ার চাপা কষ্ট বুকে চেপেও তিনি পিছপা হননি; বরং হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীককে হৃদয়ে ধারণ করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গেছেন দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে।
ত্যাগ কখনো বেইমানি করে না
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের চেয়ে বেশি নির্যাতন ও ত্যাগের শিকার আর কেউ হয়নি। সেই ত্যাগের আদর্শেই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন খাঁটি রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটি জ্বলন্ত শিক্ষা। পদ-পদবি বা ক্ষমতার মোহে নয়, বরং “করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই স্লোগানকে ধারণ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাময়িক পদ-পদবির চেয়ে ইতিহাসের পাতায় একনিষ্ঠ ত্যাগীর নাম খোদাই হওয়া অনেক বেশি গৌরবের। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনীতিতে খাঁটি ত্যাগ কখনো বেইমানি করে না।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















