২০২৪ সালের ১ আগস্ট। শ্রাবণের বিষাদঘন আকাশে সেদিন কেবল বৃষ্টির মেঘ ছিল না, জমে উঠেছিল এক স্বৈরাচারী শাসনের অন্তিম পতনের মেঘ। জুলাইয়ের গণহত্যা ও তাণ্ডবের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই ১ আগস্টে এসে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার আঁকতে শুরু করে একের পর এক চক্রান্তের জাল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণবিস্ফোরণের মুখে স্বৈরাচারের কোনো নীলনকশাই টিকতে পারে না। ১ আগস্ট হয়ে উঠেছিল সেই ফ্যাসিবাদের নগ্ন চেহারা উন্মোচনের দিন এবং ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধগাথার এক অবিনাশী অধ্যায়।
গণভবনে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা ও ১৪ দলের ভূমিকা
জুলাই গণহত্যার পর যখন দেশজুড়ে বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ২৯ জুলাই রাতে গণভবনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের এক পাতানো গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক ট্যাগিং ও ভিন্নখাতে প্রবাহ: আন্দোলনের বিশালতাকে ‘তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র’ বা ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হয়।
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের নির্বাহী আদেশ: গণদাবি ও শিক্ষার্থীদের এই অরাজনৈতিক ও সতস্ফূর্ত আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদী কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ১ আগস্ট দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে সরানো এবং আন্দোলনকে দমনে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বৈধতা খোঁজা।
ডিবি কার্যালয়ের ড্রেস মহড়া ও বাধ্যতামূলক স্ক্রিপ্ট
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয় তখন পরিণত হয়েছিল ফ্যাসিবাদের সাইকোলজিক্যাল টর্চার সেলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুমসহ শীর্ষ ছয় সমন্বয়ককে তুলে এনে নির্যাতন চালিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের জোরপূর্বক ভিডিও বার্তা ধারণ করা হয়েছিল|
কিন্তু রাজপথের তরুণদের স্পর্ধাকে ঘরের ভেতর বন্দি রাখা যায়নি। দেশজুড়ে তীব্র চাপ, আইনজীবীদের আইনি লড়াই ও রাজপথের উত্তাপের মুখে ১ আগস্ট দুপুরের দিকে ডিবি হেফাজত থেকে এই সমন্বয়কদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় স্বৈরাচার। মুক্ত হয়েই তাঁরা ডিবি কার্যালয়ের সেই জোরপূর্বক জবানবন্দি ও অনশনের সত্য তুলে ধরে রাজপথে আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে ফিরে আসেন।
আন্দোলন দমানোর নিষ্ঠুরতা ও বাহিনীর প্রতি নির্দেশ
ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর কামানের মতো ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়।
পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবিকে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র টিয়ার শেল, রবার বুলেট ও শটগানের ছররা গুলির পাশাপাশি মারণাস্ত্র (লাইভ বুলেটের) সর্বাত্মক ব্যবহারের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
ঢাকার আকাশে চক্কর কাটতে শুরু করে র্যাব ও পুলিশের হেলিকপ্টার। উপর থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্যাস ছুড়ে সাধারণ মানুষের মনে ভীতির রাজত্ব কায়েম করার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়।
পাড়া-মহল্লায় গভীর রাতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্বজনদের তুলে নিতে ‘ব্লক রেইড’ চালানো হয়। ১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১৫ হাজার। হাসপাতালগুলোতে তখন হাজার হাজার গুলিবিদ্ধ ও আহত মানুষের আর্তনাদ।
নিহতের সংখ্যা ২০১ জনে দাঁড়ায়
১৮ জুলাই থেকে সর্বাত্মক ‘ব্ল্যাকআউট’ (ইন্টারনেট বন্ধ) এবং দেশজুড়ে কার্ফিউ জারি করে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়। প্রথম দফায় ১৮ থেকে ২৪ জুলাইয়ের ভয়াবহ রক্তপাতে মৃতের সংখ্যা একশত ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও অনেকের মৃত্যু এবং নিখোঁজদের লাশের সন্ধান মিললে ৩১ জুলাই ও ১ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন প্রথম সারির জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য গণনা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০১ জনে দাঁড়ায়।
এই ২০১ জনের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন তরুণ শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক এবং পথচারী।
ময়নাতদন্ত ও বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের সূত্রে জানা যায়, নিহতদের বড় একটি অংশেরই মৃত্যু হয়েছে মাথা, চোখ ও বুকে সরাসরি তাজা গুলির (লাইভ বুলেট) আঘাতের কারণে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু করে ছোঁড়া গুলিই ছিল এই মৃত্যুর প্রধান কারণ।
১৯ থেকে ২১ জুলাইয়ের সংঘাতের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল (মিটফোর্ড), সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শত শত আশঙ্কাজনক রোগী ভর্তি ছিলেন। জুলাইয়ের শেষ দিনগুলোতে এই আহতদের মধ্য থেকেই একে একে অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, যা মোট সংখ্যাকে ২০১-এ নিয়ে যায়।
১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী নিহতের এই সংখ্যা প্রকাশ পাওয়ার পর দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিশ্চিত করে যে তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনে “অপ্রয়োজনীয় ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাণঘাতী শক্তি” প্রয়োগ করেছিল।
শটগানের মেটালিক পিলেট (ছররা গুলি) থেকে শুরু করে অ্যাসাল্ট রাইফেলের বুলেটের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাসাবাড়ি ও বহুতল ভবনের ব্যালকনিতে থাকা নিষ্পাপ শিশুরাও (যেমন—আহনাফ রমিজ, সামীর, রিয়া গোপ) এই প্রাণঘাতী বুলেটের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়।
তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার ও তাদের বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। অনেক জায়গায় গুলিবিদ্ধদের তথ্য রেজিস্টারে তুলতে বাধা দেওয়া বা নিহতের কারণ গোপন রাখার চাপ দেওয়া হয়েছিল। পুলিশি ঝামেলা ও হয়রানির ভয়ে অনেক পরিবার পোস্টমর্টেম ছাড়াই লাশ দ্রুত দাফন করতে বাধ্য হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চল বা ঢাকার বাইরের মৃত্যুর খবরগুলো দেরিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও সরকারের অন্তর্দাহ
সরকার রাজপথে ছাত্র-জনতাকে স্তব্ধ করতে কারফিউ জারির পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল। তৎকালীন সরকারের মনস্তত্ত্ব ছিল সেনাবাহিনীকে দিয়ে রক্তক্ষয়ী দমনপীড়ন চালিয়ে আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু সেনাপ্রধান ও মাঠপর্যায়ের সেনাকর্মকর্তাদের একটা বড় অংশ নিজ দেশের নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। ১ আগস্টের দিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ এই দৃঢ় অবস্থান এবং ‘জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র না তোলার’ মানসিকতা তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের ক্ষমতার ভিত নড়িয়ে দেয়।
রাজপথে ছাত্র-জনতার দাবানল
সরকারের সব ধরনের ব্ল্যাকমেইল, নিষেধাজ্ঞা ও নির্যাতনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১ আগস্ট দেশজুড়ে পালিত হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচি ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’।
দেশের আনাচে-কানাচে শহীদদের স্মরণে দোয়া, গায়েবি জানাজা, ক্যানভাসে রক্তাঙ্কিত চিত্রাঙ্কন, দেওয়াল লিখন ও রিকশা র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
রাজধানীর ফার্মগেটে ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’-এর ব্যানারে দেশের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী, নির্দেশক ও সংস্কৃতি কর্মীরা বৃষ্টিভেজা রাজপথে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতা জানান। শিক্ষক, অভিভাবক ও আইনজীবীরা মিছিল নিয়ে যুক্ত হন শিক্ষার্থীদের সাথে।
১ আগস্ট বিকেলেই ১ দফার দিকে ধাবিত হওয়া আন্দোলনকে বেগবান করতে পরের দিন ২ আগস্টের জন্য দেশব্যাপী ‘দোয়া ও গণমিছিল’ (দ্রোহ যাত্রা)-এর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
ফ্যাসিবাদের পতনযাত্রার সূচনা
২০২৪ সালের ১ আগস্ট কেবল একটি পঞ্জিকার তারিখ ছিল না; এটি ছিল ফ্যাসিবাদের দেউলিয়াত্ব প্রমাণের দিন। যখন একটি সরকার নিজ দেশের তরুণদের ওপর বুলেটের ভাষা ব্যবহার করে, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মূল সংকট ঢাকতে চায়, তখন বুঝে নিতে হয় তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে এসেছে। ১ আগস্টের রাজপথের দ্রোহই জানান দিয়েছিল—অত্যাচারের দেয়াল আর বেশিদিন খাড়া থাকবে না, ফ্যাসিবাদের তাসের ঘর ভাঙতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি






















