২০২৪ সালের ৮ জুলাই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের রাজধানী বেজিংয়ে যান। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ১১ জুলাই সকালে তাঁর দেশে ফেরার কথা । কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি ফিরলেন ১০ জুলাই গভীর রাতে। তার এই সফর সংক্ষিপ্ত করে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে আসাটা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
কেন তড়িঘড়ি ফিরে আসলেন?
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক প্রত্যবর্তনের পেছনে দুটি ভিন্ন কারণ সামনে আসে। এই দু’টির মধ্যে একটি কারণ তুলে ধরেণ তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং অন্যটি চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আশানুরূপ প্রটোকল না পাওয়ায় শেখ হাসিনার ক্ষুব্ধ হওয়া। ওই সময় শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী ছিলেন তাদেরই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা৭১নিউজে-কে জানান, চীন সফরে যেয়ে শেখ হাসিনা অপমানিত হয়েছেন। শেখ হাসিনা ওই সময় তার বিশ্বস্ত সফরসঙ্গী কয়েকজনের কাছে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ছিল- চীন থেকে আমরা সবকিছু কেনাকাটা বন্ধ করে দেব। তাদের কাছ থেকে কোন সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয় করবো না। এমনকি বাংলাদেশে চীন যেসব ম্যাগা প্রকল্পে কাজ করছে- তা নিয়ে অন্য কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কিনা? এটা ভেবে দেখার জন্যও আমলাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। তার সফর সঙ্গী একজনের এমন বক্তব্য শুনে বুঝতে পানি শেখ হাসিনার চীন সফর কতটা অসন্মানের ছিল।
চীন সফর নিয়ে সরকারি ব্যাখ্যা: তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের হঠাৎ অসুস্থতার কারণে একজন মা হিসেবে সময় দিতে তিনি ক্ষণকালও বিলম্ব না করে রাতের ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন। তবে শেখ হাসিনার চীন সফরকালীন কোনো কূটনৈতিক কর্মসূচি বাদ যায়নি।
পর্দার আড়ালের সত্য: আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা যে বিশাল অর্থনৈতিক প্রত্যাশা নিয়ে বেজিংয়ে গিয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় শেখ হাসিনা তীব্র অসন্তুষ্ট হয়ে সফর সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। বাংলাদেশ আশা করেছিল এই সফরে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার সমমানের ঋণ বা আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ নিশ্চিত হবে। কিন্তু চীন মাত্র ১ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ডলার) বা তার কাছাকাছি অঙ্কের নামমাত্র আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ব্যবধান এবং চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আশানুরূপ প্রটোকল না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে আসেন।
কেন চীনের সাথে টানাপোড়েন
শেখ হাসিনার সফরে বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের এক বড় ধরনের শীতলতা বা টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়। এর মূল নিয়ামক ছিল তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রজেক্ট। ভারতের সাথে অতিমাত্রার ঘনিষ্টতা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রজেক্ট: চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে অর্থায়ন ও কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে বাংলাদেশ এই প্রজেক্টে চীনকে বাদ দিয়ে ভারতকে যুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়।
অথচ তিস্তা নদীর পানির সংকট নিরসনে চীন কয়েক বছর ধরে প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলারের একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করছিল। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে শেখ হাসিনার জুন মাসের ভারত সফরে, যেখানে ঘোষণা করা হয় যে, ভারতের টেকনিক্যাল টিম এসে তিস্তা প্রকল্প মূল্যায়ন করবে। অর্থাৎ, চীনকে বাদ দিয়ে প্রকল্পটি ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়। চীনের দীর্ঘদিনের একটি প্রস্তাবকে এভাবে ভারতের চাপে পাশে সরিয়ে রাখা বেইজিংকে চরম ক্ষুব্ধ করেছিল।
এরপর চীন সফর থেকে ফেরার পরপরই (১৩ জুলাই) শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানান, ভূরাজনৈতিক কারণে তিস্তা প্রকল্প ভারতকে দেওয়া হতে পারে। চীনের এই বড় ভূরাজনৈতিক চাওয়া পূরণ না হওয়া ছিল অন্যতম বড় ধাক্কা।
প্রটোকল ও গুরুত্ব হ্রাস: চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার এই সফরের কভারেজ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এমনকি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক না হওয়া এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকটি মাত্র ৩০ মিনিটের মতো সংক্ষিপ্ত হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে যত টাকা ঋণ পাওয়ার আশা করেছিল (৫ বিলিয়ন ডলার), বাস্তবে চীন তার চেয়ে অনেক কম আর্থিক সহায়তা বা অনুদান (১৩.৭ কোটি ডলার) ঘোষণা করেছিল। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ব্যবধান বা ঘাটতি শেখ হাসিনাকে ক্ষুদ্ধ করে তুলে।
ঋণের ক্ষেত্রে চীনের কঠিন শর্ত
বাংলাদেশ চেয়েছিল ৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ যেন তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে সরাসরি যোগ হয় (কারেন্সি সোয়াপ বা বাজেট সাপোর্ট হিসেবে)। যাতে ডলার সংকট মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু চীন শর্ত দেয় যে এই ঋণ তারা তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘ইউয়ান’ বা আরএমবি (RMB)-তে দেবে এবং এই অর্থ দিয়ে কেবল চীন থেকেই পণ্য আমদানি করা যাবে। বাংলাদেশ এতে রাজি হলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, এই বিশাল ঋণের সুদ ও পরিশোধের শর্ত বাংলাদেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতির জন্য আরও বড় ঋণের ফাঁদ তৈরি করত। ফলে শেষ মুহূর্তে এই আলোচনা ভেস্তে যায়।
ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে চীনের সংশয়
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চরম সংকটে ছিল। চীনের থিংক-ট্যাংক এবং ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিল। বেইজিং আশঙ্কা করেছিল, এই বিপুল পরিমাণ ঋণ দিলে বাংলাদেশ তা সময়মতো ফেরত দিতে পারবে না।
ওইসময় দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যপক আলোচনা ছিল- এত বড় একটি কৌশলগত ঋণের জন্য সফরের আগে যে ধরনের নিবিড় ও পেশাদার কূটনৈতিক ও টেকনিক্যাল দরকষাকষির প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। কোনো সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর ভরসা করে এত বড় অঙ্কের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, যা চীনের মতো হিসাবনিকাশ করা দেশের সাথে খাপ খায়নি।
অতিমাত্রার ভারত প্রীতিই কি সর্বনাশ ঘটালো!
কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতিমাত্রার ভারত প্রীতি বা ভারতের প্রতি অতিরিক্ত কৌশলগত ঝুঁকে পড়াটাই ছিল তার সর্বনাশের মূল কারণ। বেইজিং এতে চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়েছিল। চীন সাধারণত কোনো দেশকে বড় অঙ্কের ঋণ বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার আগে সেই দেশের কৌশলগত অবস্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা গভীরভাবে যাচাই করে। এই ঘটনার পেছনে ভারতের প্রভাব শেখ হাসিনার বিপর্যয় ডেকে আনে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফরকে ভালভাবে নেয়নি বেইজিং। ওই বছর শেখ হাসিনা ২১-২২ জুন ভারত সফর করেন এবং তার ঠিক দুই সপ্তাহ পর ৮ জুলাই চীন সফরে যান। বেইজিংয়ের কাছে বার্তাটি পরিষ্কার ছিল- বাংলাদেশের কাছে ভারতই প্রথম অগ্রাধিকার এবং চীনের অবস্থান দ্বিতীয় সারিতে। চীন মনে করেছিল, বাংলাদেশ ভারতের সাথে সব মূল সমঝোতা শেষ করে কেবল ‘টাকা’ নেওয়ার জন্য চীনের কাছে এসেছে।
ভারত সফরে বাংলাদেশকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে রেল ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার চুক্তি হয়, যা ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এছাড়া, ভারতের সাথে সমুদ্র নিরাপত্তা ও উপগ্রহ ট্র্যাকিংয়ের মতো সামরিক ও কৌশলগত সমঝোতা স্মারক সই হয়। বেইজিং মনে করেছিল, ভারতের এই সামরিক ও কৌশলগত বলয়ে বাংলাদেশের ঢুকে পড়া বঙ্গোপসাগর এবং এই অঞ্চলে চীনের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” নীতি মেনে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে আসছিল। কিন্তু ওই সময়ে তৎকালীন সরকারের নীতি পুরোপুরি ভারত-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। বেইজিং বুঝতে পেরেছিল যে, বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা চাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে চীনকে কোনো কৌশলগত বা ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা ঢাকার নেই, কারণ ঢাকা ভারতের নারাজির ভয় পাচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
চীনকে কেবল “টাকা ধার দেওয়ার ব্যাংক” হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না—বেইজিংয়ের এই কঠোর বার্তাই ছিল সেই সফর সংক্ষিপ্তকরণ এবং নামমাত্র ঋণ ঘোষণার মূল কারণ। শেখ হাসিনা সরকারকে চীন বোঝাতে চেয়েছিল যে, কৌশলগত ও স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলো ভারতকে দিয়ে কেবল অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে চীনের কাছে বিশাল অঙ্কের সাহায্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
হাসিনা সরকারের পতন
চীন সফর থেকে শেখ হাসিনা ফিরে আসেন ১০ জুলাই ২০২৪ তারিখে। এর ঠিক পরেই বাংলাদেশে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ নেয় এবং তা একপর্যায়ে একদফা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।
চরম গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। অর্থাৎ, চীন সফর থেকে ফিরে আসার মাত্র ২৬ দিনের মাথায় শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতন ঘটে এবং তাঁর ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















