প্রতি বছর ৪ঠা জুন বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্ব ও বেদনার সাথে পালিত হয় “International Day of Innocent Children Victims of Aggression” বা ‘আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস’। যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত এবং বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসনের কারণে যেসব শিশু শারীরিক, মানসিক এবং আবেগগতভাবে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তাদের অধিকার রক্ষা এবং সুরক্ষার বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতেই এই বিশেষ দিনটি উৎসর্গ করা হয়েছে। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। এই দিবসটি বিশ্ব সমাজকে মনে করিয়ে দেয় যে, যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাতে সবচেয়ে নিরীহ এবং অরক্ষিত ভুক্তভোগী হলো শিশুরা।
দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই দিবসটি ঘোষণার পেছনে রয়েছে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৮২ সালের জুন মাসে লেবানন যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর আগ্রাসনে অসংখ্য ফিলিস্তিনি ও লেবাননি শিশু হতাহত হয়। এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
পরবর্তীতে, ১৯৮২ সালের ১৯শে আগস্ট সাধারণ পরিষদের এক জরুরি বিশেষ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব (Resolution ES-8/2) পাস করা হয়। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি বছর ৪ঠা জুন তারিখটিকে ‘আগ্রাসনের শিকার নিষ্পাপ শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেন এই দিবসটি এত জরুরি?
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও এই দিবসের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি, বরং বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে আফ্রিকা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধাঞ্চলে প্রতিদিন শিশুরা নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে:
শারীরিক সহিংসতা ও প্রাণহানি: আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এবং গোলাগুলিতে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু প্রাণ হারাচ্ছে অথবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করছে।
মানসিক আঘাত: যুদ্ধের ভয়াবহতা, ঘরবাড়ি হারানো এবং চোখের সামনে আপনজনদের মৃত্যু দেখে বেঁচে যাওয়া শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা বা ‘PTSD’-তে ভোগে।
শিশু সৈনিক: অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী জোরপূর্বক শিশুদের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করছে, যা তাদের শৈশবকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া: সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের ভূমিকা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
জাতিসংঘ এই দিবসের মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাতে যুদ্ধকালীন সময়েও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) মেনে চলা হয় এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
এছাড়া, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০-এর ১৬ নম্বর লক্ষ্যটিতে (শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান) স্পষ্ট বলা হয়েছে—শিশুদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণ অবসান করতে হবে। ৪ঠা জুনের এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম মূলত সেই লক্ষ্য অর্জনেরই একটি অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি
দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ সহিংসতার কারণে শিশুরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের দেশগুলোর পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:
আফগানিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শিশুরা সবচেয়ে বেশি আগ্রাসন ও সশস্ত্র সংঘাতের শিকার এই দেশটিতে। ইউনিসেফের দীর্ঘমেয়াদি রিপোর্টে দেখা গেছে, বিশ্বে সংঘাতের কারণে শিশু মৃত্যুর হারের দিক থেকে আফগানিস্তান অন্যতম শীর্ষে (বৈশ্বিক শিশু হতাহতের প্রায় ৩০% এই অঞ্চলে ঘটেছিল)। এছাড়া, চরম দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ শিশু পুষ্টিহীনতা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
পাকিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের শিশুরা রাজনৈতিক অস্থিরতা, উগ্রপন্থা, সশস্ত্র সংঘাত এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সবচেয়ে জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে শিশুরা ত্রিমুখী আগ্রাসনের শিকার—প্রথমত, সীমান্ত অঞ্চলের উগ্রপন্থা ও সশস্ত্র সংঘাত; দ্বিতীয়ত, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও জলবায়ু বিপর্যয়জনিত অপুষ্টি; এবং তৃতীয়ত, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও শিক্ষার অভাবজনিত সামাজিক আগ্রাসন। দেশটির শিশুদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামো থাকলেও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানের মতো সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র ও চরমপন্থী গোষ্ঠী শিশুদের ওপর সরাসরি আগ্রাসন চালায়। এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ ছিল ২০১৪ সালের পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে জঙ্গি হামলা, যেখানে ১৩২ জন নিষ্পাপ শিশু শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আজও এই অঞ্চলের স্কুলগুলোতে মাঝেমধ্যেই হামলা বা হুমকির ঘটনা ঘটে, যা শিশুদের শিক্ষার অধিকার হরণ করে।
আফগান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযান এবং ড্রোন হামলার কারণে বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার শিশু গভীর মানসিক ট্রমা বা ‘PTSD’-তে ভুগছে।
পাকিস্তানি সমাজে বিদ্যমান দারিদ্র্য এবং রক্ষণশীলতার কারণে শিশুরা মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়। পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ (২৬ মিলিয়ন) শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই শিশুরা খুব সহজেই সস্তা শ্রম বা উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হয়।
দারিদ্র্যের কারণে লাখ লাখ শিশু কয়লা খনি, ইটভাটা, চামড়া শিল্প এবং গাড়ি মেরামতের কারখানার মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে উপজাতীয় এলাকাগুলোতে, কন্যা শিশুদের শিক্ষার অধিকার তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত হয় (যেমনটি ঘটেছিল নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের সাথে)। এছাড়া সেখানে অনার কিলিং (Honor Killing), জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক আগ্রাসনের শিকার হতে হয় কন্যা শিশুদের।
২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা এবং পরবর্তী বছরগুলোর জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে পাকিস্তানের কোটি কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ শিশু এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পে বা খোলা আকাশের নিচে বাস করছে, যেখানে তারা অপুষ্টি, অনিরাপদ পানি এবং পানিবাহিত রোগের শিকার। এটি প্রকৃতির এক ধরণের পরোক্ষ আগ্রাসন, যা শিশুদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, পাকিস্তানের প্রায় ৮১% শিশু ঘরে বা মাদরাসা/স্কুলে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নামে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়। এছাড়া গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত শিশুদের ওপর (বিশেষ করে ধনী পরিবারগুলোতে) নির্মম নির্যাতন ও হত্যার খবর প্রায়শই পাকিস্তানের গণমাধ্যমে উঠে আসে।
ভারত: দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতে শিশুদের ওপর আগ্রাসন, সহিংসতা এবং অধিকার লঙ্ঘনের চিত্রটি বেশ জটিল এবং বহুমাত্রিক। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে অঞ্চলভেদে শিশুদের সমস্যার ধরনও ভিন্ন। জাতিসংঘ (UN), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং ভারতের ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’ (NCRB)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের শিশুদের পরিস্থিতি সেখানকার এলাকাভেদে একেকরকম।
জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের ভূ-পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কড়া সামরিক নজরদারি, মাঝেমধ্যে ঘটা সংঘর্ষ, কারফিউ এবং ইন্টারনেটের অচলাবস্থার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ব্যাহত হয়। বিগত বছরগুলোতে পেলেট গানের আঘাতে বেশ কিছু শিশুর চোখ নষ্ট হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোর আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মাওবাদী বিদ্রোহী এবং সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ের মাঝে শিশুরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মাওবাদীরা অনেক সময় শিশুদের ‘বাল দস্তা’ বা শিশু বাহিনীতে ব্যবহার করে, যা সরাসরি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন।
ভারতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যক শিশুশ্রমিক রয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে লাখ লাখ শিশু পড়ালেখা ছেড়ে ইটভাটা, কলকারখানা, হোটেল বা গৃহকর্মী হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়। এছাড়া, প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুকে গ্রামীণ এলাকা থেকে বড় শহরগুলোতে পাচার (Human Trafficking) করা হয় জোরপূর্বক শ্রম বা যৌন শোষণের জন্য।
ভারতের কিছু অংশে এখনও কন্যা শিশুদের প্রতি তীব্র সামাজিক বৈষম্য ও আগ্রাসন দেখা যায়। ‘কন্যা ভ্রূণ হত্যা’ এবং বাল্যবিয়ের হার ভারতের কিছু রাজ্যে (যেমন বিহার, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গ) এখনও বেশ উদ্বেগজনক। বাল্যবিয়ে কন্যা শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়, যা এক ধরণের পরোক্ষ সামাজিক আগ্রাসন।
ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে শিশুদের শাসনের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের হার অত্যন্ত উচ্চ। ২ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৬০% থেকে ৭০% শিশু ঘরে বা স্কুলে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক হেনস্থার মুখোমুখি হয়। স্কুলে ‘কর্পোরাল পানিশমেন্ট’ বা শারীরিক নির্যাতন আইনত নিষিদ্ধ হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর প্রয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
ভারতে শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিতে POCSO (Protection of Children from Sexual Offences) আইন রয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর এই আইনের অধীনে হাজার হাজার মামলা নথিভুক্ত হয়, যার বড় অংশই ঘটে চেনা পরিচিত বা পারিবারিক পরিমণ্ডলে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে ভারতের শিশুরা ব্যাপকভাবে সাইবার বুলিং, অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিং এবং চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো আধুনিক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে।
মিয়ানমার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হলেও প্রতিবেশী হিসেবে প্রাসঙ্গিক): বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে লাখ লাখ শিশু বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে, যারা মিয়ানমারে চরম সামরিক আগ্রাসনের শিকার।
শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কার শিশুদের ওপর আগ্রাসনের ইতিহাসকে দুটি ভাগে দেখা হয়—অতীতের গৃহযুদ্ধ এবং বর্তমানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। শ্রীলঙ্কায় প্রায় ২৬ বছর ধরে চলা (১৯৮৩-২০০৯) এলটিটিই (LTTE) বা তামিল টাইগারদের সাথে সরকারি বাহিনীর গৃহযুদ্ধে শিশুরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই যুদ্ধে হাজার হাজার শিশু প্রাণ হারায় এবং অঙ্গহানি ঘটে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এলটিটিই কর্তৃক বিপুল সংখ্যক শিশুকে “শিশু সৈনিক” (Child Soldiers) হিসেবে জোরপূর্বক যুদ্ধে ব্যবহার করা হতো।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। যুদ্ধ না থাকলেও এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শিশুদের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ আগ্রাসন তৈরি করেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটের কারণে দেশটিতে শিশুদের তীব্র অপুষ্টি (Wasting) আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কায় শিশু পুষ্টির পরিস্থিতি বেশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কায় ২-১৪ বছর বয়সী প্রায় ৭৩.৪% শিশু ঘরে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনো ধরণের শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার (Violent Discipline) শিকার হয়।
নেপাল: নেপালের সমাজ ও রাজনীতিতেও দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের একটি বড় প্রভাব রয়েছে, যা শিশুদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নেপালের এক দশকের গৃহযুদ্ধে (১৯৯৬-২০০৬) শিশুরা সরাসরি সহিংসতার শিকার হয়েছিল। মাওবাদী বিদ্রোহীরা শত শত শিশুকে তাদের বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছিল। অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর অভিযানেও বহু শিশু নিখোঁজ ও নিহত হয়। ২০০৬ সালে শান্তি চুক্তি হলেও অনেক শিশু দীর্ঘকাল সেই ট্রমা থেকে বের হতে পারেনি। নেপালের শিশুরা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে চরম মাত্রায় পাচারের শিকার হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার নেপালি শিশুকে জোরপূর্বক শ্রম, সার্কাসে কাজ করানো বা যৌন শোষণমূলক আগ্রাসনের উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নেপালে বাল্যবিয়ের হার অন্যতম উচ্চ (প্রায় ৩৩%)। কম বয়সে বিয়ে এবং এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক সহিংসতা নেপালি কন্যা শিশুদের ওপর এক ধরণের কাঠামোগত আগ্রাসন হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালের প্রায় ৮১.৭% শিশু পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সহিংস শৃঙ্খলার (শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন) মুখোমুখি হয়।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এই মুহূর্তে কোনো সরাসরি আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘাত নেই। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের বোমাবর্ষণ বা সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের শিকার শিশুর সংখ্যা এখানে নেই বললেই চলে। তবে বাংলাদেশ দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার সম্মুখীন:
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু বাস করছে, যারা মিয়ানমারের সামরিক আগ্রাসন, সহিংসতা এবং জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই শিশুরা সরাসরি যুদ্ধের আগ্রাসন, ট্রমা এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে শিশুরা মূলত রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতন এবং সাইবার আগ্রাসনের শিকার হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল, দাঙ্গা বা বিক্ষোভের সময় ককটেল বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষে প্রতি বছর বেশ কিছু শিশু হতাহত হয়।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত বালিকাদের মধ্যে প্রায় ৪৭% কোনো না কোনোভাবে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের (যা এক প্রকার সামাজিক আগ্রাসন) শিকার হয়। এছাড়া গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত শিশুদের ওপরও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
সংক্ষেপে
বিশ্বজুড়ে আগ্রাসনের শিকার শিশুর সংখ্যা কোটি কোটি (প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউক্রেনে)। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এই তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশে সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসনের শিকার লাখ লাখ শরণার্থী শিশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক সহিংসতার কারণে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও এই অঞ্চলে পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে “সহিংস শৃঙ্খলা” বা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের (Violent Discipline) শিকার হয় প্রায় ৬৪% শিশু। যেমন, আফগানিস্তানে ২-১৪ বছর বয়সী প্রায় ৭৪% শিশু কোনো না কোনো বৈরী আচরণ বা আগ্রাসনের মুখোমুখি হয়।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইবি