ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ৭ জেলায় বন্যা : ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু বেড়ে ৫৪ Logo মডেল মসজিদ প্রকল্পে দুর্নীতি অত্যন্ত গর্হিত ও ন্যক্কারজনক কাজ Logo ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৩২৭ Logo ভিড়বে ৪ গুণ বড় জাহাজ, মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর Logo নিজেদের পরিবেশ নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী Logo বিদেশি বিনিয়োগে আরও অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলছে সরকার : আইসিটি মন্ত্রী Logo আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তুষ্ট আইএমএফ, নতুন ঋণেও ইতিবাচক অগ্রগতি Logo বন্যা মোকাবিলায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ও ৯ হাজার টন চাল বরাদ্দ Logo ছাত্রশিবির থেকে বিদায় নিলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম Logo কারাগারে বন্দিরা বানাচ্ছেন সাবান, নাম ‘প্রিজন ফ্রেশ’

‘ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, লাশ হইয়া ফিইরা আইলো’

সোমবার সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন ইউসুফ আলী (৫৫)। সঙ্গে ছিলেন মেয়ে, ভাতিজি ও ভাতিজি জামাই। সিলেটে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন বলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রা শুরু করেছিলেন। চার বছরের অসুস্থতা থেকে হয়তো এবার মুক্তি মিলবে- এমন আশা করেছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। সড়কেই থেমে গেছে বেঁচে থাকার যাত্রা। 

সোমবার (৪ মে) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার জালালপুর এলাকায় পৌঁছানোর পরই ঘটে দুর্ঘটনা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জগামী রিফাত পরিবহনের একটি বাস হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সবকিছু।

ঘটনাস্থলেই মারা যান তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের ইউসুফ আলী ও সিএনজি চালক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে মারা যান তার মেয়ে কেয়া আক্তার (১৫), ভাতিজি নিলুফা আক্তার (৩৫) এবং ভাতিজি জামাই মো. শাহাব উদ্দিন (৩৯)। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করছিল। চার বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন ইউসুফ আলী। অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। রোববার রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে তাকে সিলেটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যাত্রা পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর পথ।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে ইউসুফ আলীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে যাওয়া বাকি তিনজনের মরদেহ তখনো গ্রামে পৌঁছেনি। একের পর এক মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় শোকে স্তব্ধ পরিবার।

নিহত ইউসুফ আলীর বৃদ্ধা মা জাবেদা খাতুনের কান্না যেন থামছেই না। ভাঙা কণ্ঠে বললেন, ‘আমার ছেলেটা ৪টা বছর ধইরা অসুস্থ। ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, ছেলে আমার লাশ হইয়া ফিইরা আইলো।’

একসঙ্গে মেয়ে ও জামাই হারিয়ে দিশাহারা স্বপ্না বেগম। তার চোখেমুখে যেন এখন পাঁচ নাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে-জামাই একলগে মইরা গেল, আমি এখন ৫ জন নাতি নিয়া কই যাইমু?’

ইউসুফ আলীর শ্যালিকা মমতাজ বেগম বলেন, ‘টাকা না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। শেষমেশ মানুষজন চাঁদা তুলে পাঠাইল, কিন্তু সেই পথেই সবাই শেষ হইয়া গেল।’

প্রতিবেশী মো. সেবুল বলেন, ‘খুবই দরিদ্র পরিবার আছিল। সবাই মিলে সাহায্য কইরা সিলেট পাঠাইছিলাম। ভাবি নাই এভাবে লাশ হয়ে ফিরবো।’

প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, অভাবই ছিল এই পরিবারের সবচেয়ে বড় শত্রু। সময়মতো চিকিৎসা হলে হয়তো এই যাত্রা লাগতো না। একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো পাঁচটি প্রাণ। আর পেছনে রয়ে গেল ভাঙা একটি পরিবার, অনিশ্চিত কয়েকটি জীবন।

দুর্ঘটনার বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, সিএনজি চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।

বাংলা৭১নিউজ/এআরকে

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

৭ জেলায় বন্যা : ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ, মৃত্যু বেড়ে ৫৪

‘ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, লাশ হইয়া ফিইরা আইলো’

আপডেট সময় ০৫:৪২:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

সোমবার সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন ইউসুফ আলী (৫৫)। সঙ্গে ছিলেন মেয়ে, ভাতিজি ও ভাতিজি জামাই। সিলেটে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন বলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রা শুরু করেছিলেন। চার বছরের অসুস্থতা থেকে হয়তো এবার মুক্তি মিলবে- এমন আশা করেছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। সড়কেই থেমে গেছে বেঁচে থাকার যাত্রা। 

সোমবার (৪ মে) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছাতক উপজেলার জালালপুর এলাকায় পৌঁছানোর পরই ঘটে দুর্ঘটনা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জগামী রিফাত পরিবহনের একটি বাস হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সবকিছু।

ঘটনাস্থলেই মারা যান তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের ইউসুফ আলী ও সিএনজি চালক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে মারা যান তার মেয়ে কেয়া আক্তার (১৫), ভাতিজি নিলুফা আক্তার (৩৫) এবং ভাতিজি জামাই মো. শাহাব উদ্দিন (৩৯)। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করছিল। চার বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন ইউসুফ আলী। অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। রোববার রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে তাকে সিলেটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যাত্রা পথই হয়ে উঠল মৃত্যুর পথ।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে ইউসুফ আলীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে যাওয়া বাকি তিনজনের মরদেহ তখনো গ্রামে পৌঁছেনি। একের পর এক মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় শোকে স্তব্ধ পরিবার।

নিহত ইউসুফ আলীর বৃদ্ধা মা জাবেদা খাতুনের কান্না যেন থামছেই না। ভাঙা কণ্ঠে বললেন, ‘আমার ছেলেটা ৪টা বছর ধইরা অসুস্থ। ছেলেরে বাঁচানোর লাইগা সিলেটে পাঠাইলাম, ছেলে আমার লাশ হইয়া ফিইরা আইলো।’

একসঙ্গে মেয়ে ও জামাই হারিয়ে দিশাহারা স্বপ্না বেগম। তার চোখেমুখে যেন এখন পাঁচ নাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে-জামাই একলগে মইরা গেল, আমি এখন ৫ জন নাতি নিয়া কই যাইমু?’

ইউসুফ আলীর শ্যালিকা মমতাজ বেগম বলেন, ‘টাকা না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। শেষমেশ মানুষজন চাঁদা তুলে পাঠাইল, কিন্তু সেই পথেই সবাই শেষ হইয়া গেল।’

প্রতিবেশী মো. সেবুল বলেন, ‘খুবই দরিদ্র পরিবার আছিল। সবাই মিলে সাহায্য কইরা সিলেট পাঠাইছিলাম। ভাবি নাই এভাবে লাশ হয়ে ফিরবো।’

প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, অভাবই ছিল এই পরিবারের সবচেয়ে বড় শত্রু। সময়মতো চিকিৎসা হলে হয়তো এই যাত্রা লাগতো না। একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো পাঁচটি প্রাণ। আর পেছনে রয়ে গেল ভাঙা একটি পরিবার, অনিশ্চিত কয়েকটি জীবন।

দুর্ঘটনার বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, সিএনজি চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।

বাংলা৭১নিউজ/এআরকে