আজ ২৫শে জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে বাঙালির সমকালীন ইতিহাসে এক চরম বিষাদ, স্তব্ধতা আর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের রক্তিম অধ্যায় রচিত হয়েছিল। স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেওয়া এই দিনটিতে বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল বারুদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, চতুর্দিক আচ্ছন্ন ছিল কারফিউর কঠিন ও শ্বাসরুদ্ধকর শৃঙ্খলে, আর তল্লাশির অজুহাতে অন্দরমহলে অন্দরমহলে ছড়িয়ে পড়েছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক বিভীষিকাময় আতঙ্ক। যে কোটা সংস্কারের ন্যায়সংগত আন্দোলন একদা বৈষম্যহীন স্বপ্নের বার্তা নিয়ে শুরু হয়েছিল, তৎকালীন চক্রান্তকারী শাসকগোষ্ঠীর পাশবিক ও অমানবিক দমনপীড়নে তা রূপ নিয়েছিল এক উত্তাল, রক্তাক্ত জনরোষে। একদিকে যখন রাজপথজুড়ে তরুণদের ঝরে পড়া তাজা প্রাণের রক্ত আর শোকের মাতম, তখন অপরপ্রান্তে উন্মোচিত হয়েছিল এক অদ্ভুত, বিকারগ্রস্ত ও নির্মম রাজনৈতিক নাটকের কুৎসিত চিত্র।
হাসপাতালের স্বজনহারাদের আর্তনাদ
হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ তখন রূপ নিয়েছিল কোনো ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রের ফিল্ড হাসপাতালে। করিডোর থেকে শুরু করে মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত তরুণদের দেহ। কোথাও এক ফোঁটা অক্সিজেনের জন্য মুমূর্ষুর আকুতি, কোথাও বা চোখের সামনেই জীবনের আলো নিভে যাওয়ার নিদারুণ নীরবতা। কত শত জননীর কোল শূন্য হয়েছে, কত অসহায় পিতা সন্তানের নিথর ও রক্তাপ্লুত দেহ আঁকড়ে ধরে হাসপাতালের ঠাণ্ডা মেঝেতে মাথা কুটেছেন—তার কোনো হিসাব ছিল না। চিকিৎসার অধিকারটুকুও সেখানে ছিনিয়ে নিয়েছিল গ্রেপ্তার ও গুমের তীব্র ভয়াবহতা; ব্যাথানাশক ওষুধের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তার।
সাড়াশি অভিযা ও গণগ্রেপ্তার
সান্ধ্যআইনের অন্ধকার নামলেই শুরু হতো বিভীষিকাময় সাড়াশি অভিযান। হেলমেট আর ভারী বুটের শব্দে প্রতিটি পাড়া-মহল্লা কম্পিত হতো, চুরমার হয়ে যেত সাধারণ মানুষের নিশ্চিন্ত ঘুম। কেবল রাজধানী ঢাকাতেই দুই হাজারের বেশি মানুষকে নজিরবিহীনভাবে গ্রেপ্তার করা হয়, আর সারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল মিথ্যা মামলার অন্তহীন জাল। আদালতের স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকারাচ্ছন্ন বারান্দায় জমা হয়েছিল শত শত দিশেহারা ও নিঃস্ব স্বজনের নির্বাক প্রতীক্ষা। মায়েরা চোখের জল সংবরণ করে সন্তানকে একবার ছুঁয়ে দেখার আকুতি নিয়ে প্রহর গুনছিলেন, আর স্বজনরা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে ছুটছিলেন প্রিয় মানুষের অস্তিত্বটুকু শুধুই নিশ্চিত করার আশায়।
কংক্রিটের পিলার ও হাসিনার মেকি কান্না
২৫ জুলাইয়ের সবচাইতে পৈশাচিক ও মর্মান্তিক দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হয়েছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত মেট্রোরেল স্টেশনে। তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে কাঁচ ও ইট-পাথরের কাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি দেখে অশ্রুসিক্ত হন- যা ক্যামেরার সামনে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার জন্ম দেয়। অথচ, যে দেশে শত শত তরুণের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত, যেখানে অবুঝ নিষ্পাপ শিশুর বুকেও অনায়াসে বিদ্ধ হয়েছে ঘাতকের বুলেট, সেখানে ওই কাঁচের দেয়াল আর ইটের বেদনায় তৎকালীন সরকারপ্রধানের এই “মায়াকান্না” দেশবাসীর মনে তীব্র ধিক্কার ও ঘৃণার সঞ্চার করে। মানুষের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল- এই নির্মম শাসকের কাছে সহস্র তরুণের তাজা প্রাণের চেয়ে মেট্রোরেলের একটি কংক্রিটের পিলারের মূল্য অনেক বেশি। অহংকারে অন্ধ সেই শাসকের বিকারগ্রস্ত বক্তব্য আর মেকি কান্না জাতিকে কেবল ক্রুদ্ধই করেনি, বরং ইতিহাসের পাতায় তাদের চিরতরের জন্য চরম খলনায়কে পরিণত করেছিল।
শাসকের চাটুকারিতায় গণমাধ্যমের একাংশ
আন্দোলনকে নিঃশেষ করে দিতে তৎকালীন শাসকদল, পুলিশ, বিজিবি ও রাষ্ট্রীয় পেটুয়া বাহিনীর যৌথ তাণ্ডব পৌঁছেছিল বর্বরতার চরম শিখরে। এর সাথে যোগ দিয়েছিল ক্ষমতার গদি রক্ষা করতে মরিয়া একদল আজ্ঞাবহ আমলার গোপন আঁতাত। তথ্যপ্রবাহ পুরোপুরি অবরুদ্ধ করতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সীমিত এবং মোবাইল ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে পুরো দেশকে বিশ্ববিচ্ছিন্ন এক অন্ধকারের দ্বীপে পরিণত করা হয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন রাজপথে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করছিল, দেশের গণমাধ্যমের এক বিরাট অংশ তখন শাসকের চাটুকারিতায় ব্যস্ত ছিল। সত্যকে ধামাচাপা দিতে, ঘাতকের বুটের শব্দকে জায়েজ করতে এবং স্বৈরাচারের হাতকে শক্ত করতে তারা সাংবাদিকতার মূল নীতিকে বিকিয়ে দিয়ে ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায় রচনা করেছিল।
ইতিহাসের রক্তিম দায়বদ্ধতা
২০২৪ সালের ২৫ জুলাই কেবল পঞ্জিকার একটি সাধারণ দিন নয়; এটি ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত নগ্নতা ও নির্লজ্জতার এক অকাট্য দস্তাবেজ। রাজপথের তাজা রক্ত, হাসপাতালের ট্রমা, স্বজনহারাদের বুকফাটা হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে শাসকীয় মায়াকান্নার এই চরম বৈপরীত্য ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে রইল—যা এক অগ্নিগর্ভ গণঅভ্যুত্থানের সোপানকে কেবল ত্বরান্বিতই করেনি, বরং নিশ্চিত করেছিল একটি স্বৈরাচারের অনিবার্য পতন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















