বাংলাদেশে যে কয়টি জমিদার বাড়ি রয়েছে তাদের মধ্যে করটিয়া জমিদার বাড়ি অন্যতম। ইতিহাসের সঙ্গে কালের সাক্ষী হয়ে ২শ’ বছর ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এ জমিদার বাড়িটি। জানা যায়, পন্নী পরিবারের সন্তান সা’দত আলী খান পন্নী ১৭ শতকের প্রথমদিকে করটিয়ায় বসবাস শুরু করেন। তখন থেকেই তারা করটিয়ার জমিদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে আগমন করেন। তার ছেলে সাইদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি স্থাপন এবং ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আটিয়ার বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ করেন। সা’দত আলী খান পন্নী টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে জমিদার সা’দত আলী খান পন্নী সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে জটিলতায় মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার জমিদার খাজা আলীমুল্লাহর সহায়তায় তিনি পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করেন, কিন্তু শর্ত ভঙ্গের কারণে পাল্টা মামলা করে খাজা আলিমুল্লাহ ভোগ-স্বত্বের ডিক্রি লাভ করেন।
সেসময় সা’দত আলী খান সম্পত্তি রক্ষার জন্য স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানমের নামে তা দানপত্র করে দেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে আপস মীমাংসা হয়। সা’দত আলী খান সম্পত্তির সাত আনা অংশ খাজা আলীমুল্লাহকে ছেড়ে দেন। অতঃপর বাংলা ১২২৭ সনের ৯ পৌষ সা’দত আলী খান এবং তার স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানম যৌথভাবে একটি দলিল করেন।
ওয়াকফ্ সম্পত্তি দেখাশুনা করার জন্য মুতাওয়াল্লী নিয়োগের বিধান রাখা হয়। সা’দত আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর তার ছেলে হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী মুতাওয়াল্লী ছিলেন। মাহমুদ আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর মুতাওয়াল্লী কে হবেন এ নিয়ে তার ছেলে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) এবং পিতামহী জমরুদুন্নেসা খানমের মধ্যে বিবাদ ও মামলা মোকদ্দমা সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী জয়ী হন এবং দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন।
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ছিলেন করটিয়া জমিদারকুলের সবচেয়ে স্বনামধন্য। বিভিন্ন সুকীর্তির জন্য তিনি আতিয়া চাঁদ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কারাবদ্ধ হন। ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং বাংলার আলীগড় নামে খ্যাত ১৯২৬ সালে করটিয়ায় সা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে করটিয়া জমিদার বাড়িটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রেমী দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। জমিদার বাড়ির মহলগুলোর স্থাপত্যশৈলী দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে এবং বিস্মতও করে। এর স্থাপত্যকর্মে মূলত মোগল ও চৌনিক স্থাপত্য রীতি মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। পুরো জমিদার বাড়িটি দেয়াল দ্বারা ঘেরা। এর ভেতরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ প্রাচীন ফলজ ও ভেষজ বৃক্ষ।
জমিদার বাড়ির ভেতর মোগল আমলের দামী আসবাবপত্রসহ জমিদারদের ব্যবহার্য নানান সামগ্রী রয়েছে। ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়ার স্মৃতিবিজড়িত টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদারবাড়িটি টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শহর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই স্থানটির পরিবেশ অত্যন্ত প্রাকৃতিক এবং নিরিবিলি।
সরেজমিনে দেখা যায়, জমিদার বাড়ির চারপাশ জুড়েই সবুজের প্রকৃতি। প্রবেশ করতেই যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে। এছাড়া জমিদারের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রও দেখা যায়। এছাড়া হরিণের মাথা ও গ্রামোফোন (কলের গান) দেখা যায়।
দর্শনার্থীদের একজন বলেন, ‘জমিদার বাড়িতে জমিদারের ব্যবহৃত অনেক জিনিস রয়েছে। জমিদার বাড়ি দেখে আমাদের খুব ভালো লেগেছে। ঈদ ছাড়া বছরের অন্য সময়ে জমিদার বাড়ি বন্ধ থাকে। আমাদের দাবি প্রতিদিনই যেন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।’
দর্শনার্থী সুমাইয়া আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বাড়ি একটি ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান। এখানে একবার হলেও সবার আসা উচিত। বিশেষ করে এখানকার পরিবশে অনেক সুন্দর।’
আরেক দর্শনার্থী কবির হোসেন বলেন, ‘পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এখানে জমিদারের পুরোনো বাড়িঘর, জমিদারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, হরিণের মাথা দেখেছি। জমিদার বাড়িটি সব সময়ই খোলা রাখার দাবি করছি।’
দর্শনার্থী মরিয়ম বেগম বলেন, ‘এখানে জমিদারের ইতিহাস সর্ম্পকে জানতে পারলাম। একইসঙ্গে তাদের পরিবারের ইতিহাস সর্ম্পকেও জানতে পেরেছি। এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। পরিবার পরিজন নিয়ে সবাই জমিদার বাড়িতে ঘুরতে আসতে পারেন।’
এ প্রসঙ্গে জমিদার বাড়ির ম্যানেজার কাদির খান বলেন, ‘জমিদারের ইতিহাস সর্ম্পকে জানার জন্য ঈদের সময় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। আশা করছি সামনের দিনগুলোতে সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে জমিদার হায়দার আলী খান পন্নীর নাতনি উম্মুত তিজান মাখদুমা পন্নী বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি আবহমানকাল থেকেই বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে রয়েছে। সবাইকে এখানে স্বাদরে গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা মনে করি এখানে সবারই আসার অধিকার রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জমিদার বাড়ি নিয়ে আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের কাছে দাবি করছি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে এটি যেন সংরক্ষণ করা হয়। সারা বছরই যেন উন্মুক্ত থাকে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
জমিদার বাড়িতে যা দেখা যাবে
প্রথমেই করটিয়া জমিদার বাড়ির বাহিরে অবস্থিত সুন্দর একটি মসজিদ দেখতে পাবেন। এটি জমিদার বাড়ির মসজিদ হলেও সর্ব সাধারণের জন্যই উন্মুক্ত। আর জমিদার বাড়িটির চারদিক প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীরের ভেতরে রয়েছে লোহার ঘর, রোকেয়া মহল যা আগে জমিদার বাড়ির অন্দর মহল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আরও রয়েছে রানির পুকুর ঘাট, ছোট তরফ দাউদ মহল ও মোগল স্থাপত্যে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।
টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বাড়ি যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়কপথে টাঙ্গাইলের দূরত্ব প্রায় ৮৪ কিলোমিটার। টঙ্গী হয়ে টাঙ্গাইল যেতে প্রায় ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নিরালা, বিনিময়, ঝটিকা, ধলেশ্বরী ইত্যাদি বাস টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে ছেড়ে যায়। এই সব বাসে চড়ে করটিয়া বাইপাসের কাছে বাস থেকে নেমে রিকশায় করটিয়া জমিদার বাড়িতে সহজেই যেতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন প্রাপ্ত থেকে ট্রেনযোগেও আসতে পারবেন এখানে।
কোথায় থাকবেন
টাঙ্গাইলে থাকার জন্য পল্লী বিদ্যুৎ ও এলজিইডির, গর্ণপূর্তের সরকারি রেস্ট হাউজ আছে। সেগুলোতে যোগাযোগ করে থাকতে পারবেন। আর যদি হোটেলে রাত্রিযাপন করতে চান তবে টাঙ্গাইল শহরের দিকে বেশ কিছু বিভিন্ন মানের হোটেলে রাতে থাকতে পারবেন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএন























