শহরের ঘুম ভাঙার কথা ছিল চা-পাতার ঘ্রাণে, ফুটন্ত পানির টগবগ শব্দে কিংবা প্রাতরাশের ব্যস্ততায়। অথচ ভোরের আলো ফুটতেই রান্নাঘরে গিয়ে দেখা গেল এক হিমশীতল নীরবতা। নীল শিখা হারিয়ে গেছে; পড়ে আছে ধাতব চুলার প্রাণহীন কঙ্কাল।
হঠাৎ করেই দেশজুড়ে নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব ও তীব্র গ্যাস সংকট। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে সাধারণ মেসবাড়ির হেঁশেল—সবখানেই নেমে এসেছে হাহাকার। কোথাও নিভু নিভু শিখার উপহাস, কোথাওবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলার পাইপ থেকে ভেসে আসছে কেবল বাতাসের শব্দ। ভুক্তভোগীদের হাহাকারে ভারী হয়ে উঠছে সকালের বাতাস।
মিরপুরের গৃহিণী লায়লা বানু বলেন- “ভোরে উঠে বাচ্চার টিফিন বানাতে গিয়ে দেখি চুলা জ্বলছে না। সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য নেই, লাকড়ি ব্যবহারের উপায় নেই। বাধ্য হয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে পাউরুটি আর বিস্কুট কিনে খাইয়ে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হয়েছে। এই দুর্ভোগ যেন এক নিঃশব্দ যন্ত্রণা।”
অনুরূপ চিত্র রেস্তোরাঁ ও ফুটপাতের খাবার দোকানগুলোতেও। লাকড়ি কিংবা ইমার্জেন্সি কেরোসিনের স্টোভ যোগাড় করতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে শহরগুলোতে।
গ্যাসের এই আকস্মিক সংকটের নেপথ্যে মূলত কারিগরি জটিলতা এবং আমদানিনির্ভরতার বড় ধরনের ধাক্কা জড়িত। প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU)-এ আকস্মিক কারিগরি ত্রুটি ও সংযোগ লাইনে সমস্যা দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ থাকলেও ডলার সংকটের কারণে সময়মতো এলএনজিবাহী জাহাজের মূল্য পরিশোধ না করতে পারা এবং খোলা বাজার থেকে জরুরি এলএনজি ক্রয়ে বিলম্ব।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দিয়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর পলিসির দিকে ঝুকে পড়ায় আজ একটিমাত্র সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত হলেই পুরো দেশ অচল হয়ে পড়ছে।
গ্যাস সংকটের বিষাক্ত থাবা কেবল গৃহস্থালির হেঁশেলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ধস নামিয়েছে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধানই এই সংকটের স্থায়ী উৎস। দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান সরবরাহ রয়েছে দৈনিক মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর (যেমন- তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা) উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমান হারে উত্তোলন চললে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশীয় মজুদে বড় ধরনের টান পড়বে।
প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি হিসেবে আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো দেশ সংকটে পড়ে।
হঠাৎ নেমে আসা এই আঁধার কবে কাটবে? এনিয়ে পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আভাস হচ্ছে- এই সংকট কাটতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। টার্মিনালের ক্রুটি মেরামত শেষে বহিস্ফোটক এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে নতুন করে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, “কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে। আমরা দ্রুততম সময়ে মেরামতের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। সংকট নিরসনে স্পট মার্কেট থেকে জরুরি এলএনজি কার্গো আনা হচ্ছে। সাময়িক এই কষ্টের জন্য আমরা জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি।”
তবে জ্বালাননি বিশেষজ্ঞদের মতে- “দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব দেশীয় স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করা হয়েছে। অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর ভরসা করার মাশুলই আজ দেশবাসীকে দিতে হচ্ছে। সমন্বিত জেনুইন মাষ্টারপ্ল্যান ও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জোর না দিলে এই সংকট অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।”
বাংলা৭১নিউজ/এসএস






















