সেদিন বাংলার আকাশ মেঘলা ছিল কি না, তা প্রকৃতির ডায়েরিতে হয়তো লেখা নেই; কিন্তু বাতাস যে স্বজনহারার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল, তা ইতিহাস কোনোদিন ভুলবে না। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, একটি সাধারণ শুক্রবার। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর দ্বিতীয় দিনটি রূপ নিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত উপাখ্যানে। চারদিকে শুধু বুলেটের শব্দ, বারুদের গন্ধ, আর পিচঢালা রাজপথে চাপ চাপ তাজা রক্তের দাগ। দিন শেষে গণমাধ্যমের পাতায় যখন হিসেব মিলল, তখন দেখা গেল ৬৭টি তাজা প্রাণ চিরতরে হারিয়ে গেছে এই বাংলার মাটি থেকে। যার মধ্যে কেবল তিলোত্তমা ঢাকা শহরের বুকেই নিভে গেছে ৬২টি প্রদীপের আলো! সাভার, রংপুর, সিলেট, নরসিংদী কিংবা মাদারীপুর—সবখানেই মায়ের কোল খালি হওয়ার করুণ আর্তি।
ভোরের আলোয় অধিকারের ডাক, বেলায় রণক্ষেত্র রাজধানী
ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা বুকভরা আশা আর অধিকারের দাবি নিয়ে নেমেছিল রাস্তায়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেলা ১১টার দিকে রাজপথে বাড়ে জনস্রোত। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী রূপ নিল একেকটি রণক্ষেত্রে। আন্দোলনরত তরুণদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। দুপুরের মধ্যেই এই সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা ও মহাখালীতে। অন্যদিকে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের রূপ নেয় প্রেস ক্লাব ও পল্টন এলাকা।
হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ মানুষের ঢল, চিকিৎসকদের চোখে জল
আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এদিন নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। পিচঢালা পথ নিমেষেই রাঙা হয়ে ওঠে তরুণের রক্তে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোর করিডোরে তখন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। একের পর এক গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত মানুষকে স্ট্রেচারে করে যখন আনা হচ্ছিল, তখন হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে আর্তনাদে। সাদা অ্যাপ্রন পরা চিকিৎসক আর নার্সদের চোখও সেদিন ভিজে উঠেছিল অশ্রুতে। এত এত মুমূর্ষু মানুষকে একসাথে বাঁচানোর আকুল চেষ্টায় তাঁরাও তখন দিশেহারা, হিমশিম খাচ্ছিলেন চিকিৎসার সরঞ্জাম আর শয্যার সংকটে।
আকাশে হেলিকপ্টারের গর্জন ও ধ্বংসস্তূপের নগরী
বাতাসে তখন এক অদ্ভুত আতঙ্ক। মাথার ওপরে চক্কর কাটছিল র্যা বের হেলিকপ্টার, যেখান থেকে গুলি ছোঁড়ার অভিযোগে কেঁপে উঠেছিল সাধারণ মানুষের বুক; যদিও বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল ওটা ছিল কেবলই আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও আটকা পড়াদের উদ্ধার অভিযান। কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখ তখন দেখছিল ভিন্ন এক ধ্বংসলীলা। আগুনে পুড়ছিল বনানীর বিআরটিএ ভবন, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পিবিআই কার্যালয়। রামপুরা থানা ও মিরপুরের পাঁচটি পুলিশ বক্সে চলে ভাঙচুর। এমনকি মিরপুরে বিআরটিএ অফিসে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ি ও স্বপ্নের মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনও রক্ষা পায়নি এই তাণ্ডব থেকে।
অচল যোগাযোগ, বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ
এই গোলযোগের রেশ ধরে বন্ধ হয়ে যায় দেশের চাকা। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকায় মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ডিএমপি। থমকে যায় গণপরিবহন, বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস ও সারা দেশের রেল যোগাযোগ। কাজীপাড়া স্টেশনে ভাঙচুরের পর মেট্রোরেল চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ঢাকার আকাশ থেকেও আন্তর্জাতিক অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পুরো দেশ যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত হলো। এর মাঝেই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে, রক্ষীদের জিম্মি করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।
শাহবাগে কান্নার রোল: ‘আমার সন্তানের বুকে গুলি কেন?’
এই সব রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে সবচেয়ে বড় যে দৃশ্যটি হৃদয়ে দাগ কেটে যায়, তা হলো শাহবাগের মোড়। যেখানে রাজনীতির কোনো রঙ ছিল না, ছিল কেবল সন্তানের প্রতি মা-বাবার চিরন্তন প্রেম। ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে সেদিন তপ্ত রোদ আর আতঙ্কের মুখে দাঁড়িয়েছিলেন সর্বস্তরের মা-বাবারা। যে মায়েরা প্রতিদিন সন্তানকে পরম মমতায় খাইয়ে দেন, যে বাবারা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনেন, তাঁরা সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন নিজেদের সন্তানদের ঢাল হয়ে, তাঁদের চোখে ছিল অশ্রু আর কণ্ঠে ছিল বিচারের দাবি।
রাজনৈতিক অনড় অবস্থান ও মধ্যরাতের কারফিউ
দিনভর যখন রক্ত ঝরছিল, রাজনীতির মাঠ তখনো উত্তপ্ত। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ডাক দেন ‘বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের’। বিজিবি প্রধানের কণ্ঠে ছিল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড শক্ত হাতে দমনের হুঁশিয়ারি। সরকারের সংলাপের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ছাত্ররা তখন আরও অনড়- নয় দফা দাবিতে বজ্রমুষ্টি তুলে তারা ঘোষণা করল আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। আর ঠিক সেই মধ্যরাতেই ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায় আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারি নাহিদ ইসলামকে।
স্তব্ধতার চাদরে ঢাকা এক মহাশ্মশান
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রাতে গণভবনে জরুরি বৈঠকে বসেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানেরা। এরপরই আসে চূড়ান্ত ঘোষণা—রাত ১২টা থেকে দেশজুড়ে জারি হয় কারফিউ এবং মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। বুটের আওয়াজে কেঁপে ওঠে রাজপথ। ১৯ জুলাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এঁকে যাওয়া এক চিরন্তন কান্নার নাম, এক অবিনশ্বর শোকের নদী- যা মনে করিয়ে দেয় অধিকারের দাবিতে কতটা সস্তা হয়েছিল এ দেশের তরুণদের রক্ত।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি






















