বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৪:২৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ১৩৭ কোটি টাকার সহায়তা চুক্তি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে সরকার: মির্জা ফখরুল জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সংস্কার আনা হবে : প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বুলেট ট্রেনে’ ডালিয়ান থেকে বেইজিংয়ের পথে নকল পেলে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আইনের আওতায় আনা হবে : শিক্ষামন্ত্রী ‘সবাই তোমাকে ঘৃণা করে’— নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের তিরস্কার নিয়ে তোলপাড় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নওগাঁ সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের, কড়া পাহারায় বিজিবি স্কুল-কলেজের পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা

শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজরিত চৌক্কার খাল খনন: ৩ কোটির প্রকল্পে কাজের চেয়ে প্রশ্নই বেশি

গাজীপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

একসময় যে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে কোদাল চালিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সেই ঐতিহাসিক চৌক্কার খাল আজ আবার আলোচনায়। তবে উন্নয়নের সাফল্যের জন্য নয়, বরং পুনঃখননের নামে অনিয়ম, দায়সারা কাজ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগে।

৬ দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় কৃষি, পানি নিষ্কাশন ও জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রীপুরের ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ চৌক্কার খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। কিন্তু দেখা গেছে, খননকাজের বাস্তব চিত্র বরাদ্দের আকারের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোথাও কোথাও খালের মাঝখানে কয়েকজন শ্রমিককে কোদাল দিয়ে কাদা তুলতে দেখা গেলেও অধিকাংশ স্থানে খননের দৃশ্যমান কোনো চিহ্নই নেই।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরাসরি এলাকায় এসে চৌক্কার খাল খনন কার্যক্রমে অংশ নেন। প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন, এমনকি উড়িতে (মাটি পরিবহনের পাত্র) মাটি ভরে নিজের মাথায়ও বহন করেন।

তৎকালীন শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল হেলিম সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, “তখন আমি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিলাম। অতিবৃষ্টিতে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যেত। এ সমস্যা তুলে ধরে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলাম।

পরে খাল খননের বরাদ্দ হয়। ১৯৭৮ সালের দিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজে এলাকায় এসে শ্রমিকদের সঙ্গে মাটি কাটেন। আমি খাল খনন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আজ খাল খননের নামে যা হচ্ছে, তা ডাকাতির মতো মনে হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুর পৌরসভার দোখলা বাজার এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে পৌর এলাকার ভাংনাহাটি গ্রামে কৃষিজমিতে গিয়ে মিলিত হয়েছে চৌক্কার খাল। প্রায় এক মাস আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করা হয়।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের উদ্বোধন করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ছাড়াই নামমাত্র খনন করা হয়েছে। এক সপ্তাহ না যেতেই অধিকাংশ স্থানে খাল আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের অনেক অংশ ময়লা, বর্জ্য ও পলি জমে ভরাট হয়ে আছে। কোথাও কোথাও পাড়ে ফেলা কাঁদামাটি বৃষ্টির পানিতে আবার খালের ভেতরে নেমে গেছে। শিল্পকারখানার দখলে থাকা কিছু অংশে খননের কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, “খাল পুনঃখননের খবর শুনে আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল জলাবদ্ধতার সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবে যা দেখছি, তাতে হতাশ হয়েছি। খালের অবস্থা আগের মতোই। কোথাও কোথাও কোদাল দিয়ে খনন করতে দেখেছি। এটা হাস্যকর।”

একই অভিযোগ করেন খালপাড়ের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন। তার ভাষায়, “নামমাত্র খনন করে জনগণের টাকা লুটপাট করা হচ্ছে। খালের পাড়ে গেলে মনে হয় না খনন করা হয়েছে। সামান্য কিছু কাদা তোলা হয়েছিল, বৃষ্টিতে আবার খালে চলে গেছে। এখন সেই কাদাই কোদাল দিয়ে উঠানো হচ্ছে।”

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. খোরশেদ আলম মনে করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দখলদারিত্বের কারণে চৌক্কার খাল তার অস্তিত্ব হারানোর পথে।

তিনি বলেন, “চৌক্কার খাল এখন নগরায়নের মূল্য দিচ্ছে। তলানি জমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। খালের তীরবর্তী অনেক কারখানা খাল দখল করেছে এবং কেমিক্যালযুক্ত দূষিত পানি ছেড়ে দিচ্ছে। জিয়াউর রহমানের স্মৃতির কারণে খালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনঃখননের আওতায় এসেছে। কিন্তু বাস্তবে দুজন শ্রমিককে ছোট কোদাল দিয়ে মাটি তুলতে দেখা যাচ্ছে। প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হলে খালটি নতুন জীবন ফিরে পেত।”

অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম বলেন, “আমরা এখনো খননকাজ শেষ করিনি। যেখানে এক্সকাভেটর দিয়ে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে কোদাল দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়।”

প্রকল্প পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “খননের অনিয়মের তথ্য পেয়েছি। সরেজমিন পরিদর্শনের পর বিস্তারিত বলা যাবে। এক্সকাভেটর দিয়ে খননের সময় যে কাদা সম্পূর্ণ ওঠানো সম্ভব হয়নি, তা কোদাল দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে। তবে খালের মাঝখান থেকে কোদাল দিয়ে মাটি তোলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, “খাল খননে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। বর্তমান সরকার নদ-নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে গুরুত্ব দিচ্ছে। জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চৌক্কার খাল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন করা হচ্ছে। এখানে একচুল পরিমাণ নয়ছয় করার সুযোগ নেই।”

৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সে প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। খালের অনেক অংশে দৃশ্যমান পরিবর্তন না থাকা, অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং কোদাল দিয়ে খননের দৃশ্য ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

একসময় যে খালে রাষ্ট্রপতি নিজে নেমে মাটি কেটেছিলেন জনস্বার্থে, সেই খাল কি আজ প্রকল্পের কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? নাকি তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র-সেই উত্তর এখন খুঁজছে শ্রীপুরের মানুষ।

বাংলা৭১নিউজ/এআর

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2015-2026
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com