আজকের দিনে জন্মেছিলেন সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর। তিনি ছিলেন ভারতের ১৫তম মুঘল সম্রাট। তাঁর আসল নাম ছিল আজিজ-উদ-দ্বীন। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি তাঁর প্রপিতামহ সম্রাট আওরঙ্গজেবের নামানুসারে ‘আলমগীর’ (যার অর্থ ‘বিশ্ববিজেতা’) উপাধি গ্রহণ করেন। তবে নামের অর্থ বিশ্ববিজেতা হলেও, বাস্তবে তিনি ছিলেন তাঁর উজিরের হাতের পুতুল এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের যুগের এক করুণ চরিত্র। আজিজ-উদ-দ্বীনের জন্ম হয়েছিল ১৬৯৯ সালের ৬ই জুন। তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট জাহান্দার শাহের পুত্র। ১৭৫৯ সালের ২৯শে নভেম্বর তাকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল।
প্রারম্ভিক জীবন এবং বন্দিদশা
আজিজ-উদ-দ্বীনের জীবনের এক বিশাল অংশ কেটেছে চরম সংকটে। মুঘল দরবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে তিনি প্রায় ৩৬ বছর দিল্লির লাল কেল্লায় বন্দি জীবনযাপন করেন। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি ধর্মতত্ত্ব এবং সুফিবাদের প্রতি গভীরভাবে ঝুঁকে পড়েন। তিনি একজন অত্যন্ত ধার্মিক ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ১৭৫৪ সালে যখন তাঁকে সিংহাসনে বসানো হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫৫ বছর। দীর্ঘকাল রাজকার্যের বাইরে থাকায় দেশ শাসনের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না।
সিংহাসনে আরোহণ এবং উজির ইমাদ–উল–মূলক
১৭৫৪ সালে দিল্লির প্রভাবশালী ও ষড়যন্ত্রকারী উজির ইমাদ-উল-মূলক তৎকালীন সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরকে অন্ধ করে সিংহাসনচ্যুত করেন। এরপর তিনি বয়োবৃদ্ধ এবং শান্ত স্বভাবের আজিজ-উদ-দ্বীনকে ‘দ্বিতীয় আলমগীর উপাধি দিয়ে দিল্লির সিংহাসনে বসান। দ্বিতীয় আলমগীর কেবল নামমাত্র সম্রাট ছিলেন। সমস্ত প্রশাসনিক, সামরিক এবং আর্থিক ক্ষমতা ছিল উজির ইমাদ-উল-মূলকের হাতে। সম্রাটের নিজের সুরক্ষার জন্য বা সামান্য খরচের জন্যও উজিরের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হতো।
আহমদ শাহ আবদালীর আক্রমণ (১৭৫৭)
দ্বিতীয় আলমগীরের শাসনকালের একটি বড় বিপর্যয় ছিল আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণ। উজির ইমাদ-উল-মূলকের চালচলনে ক্ষুব্ধ হয়ে আবদালী ১৭৫৬-৫৭ সালে দিল্লি আক্রমণ করেন। আফগান বাহিনী দিল্লি ও মথুরায় ব্যাপক লুটপাট চালায়। উজির শহর ছেড়ে পালিয়ে যান এবং সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর আবদালীর সামনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। আবদালী দ্বিতীয় আলমগীরকে নামমাত্র সম্রাট হিসেবে বহাল রাখেন, তবে নিজের বিশ্বস্ত রুহেলা নেতা নজিব-উদ-দৌলাকে দিল্লির প্রধান মীর বকশী (সেনাপতি) বানিয়ে যান, যা উজির ইমাদ-উল-মূলকের ক্ষমতা কেড়ে নেয়।
বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পলাশীর যুদ্ধ
দ্বিতীয় আলমগীরের শাসনকালেই উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদলটি ঘটেছিল—১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধ। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং লর্ড ক্লাইভের চক্রান্তে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন ঘটে এবং বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরোক্ষ শাসন শুরু হয়।
তত্ত্বগতভাবে বাংলা তখনো মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা বা প্রদেশ ছিল। কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রীয় শক্তি এতটাই দুর্বল ছিল যে, সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর তাঁর নিজের সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশটি হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
দ্বিতীয় আলমগীরের পারিবারিক জীবন
দ্বিতীয় আলমগীরের বিবাহ এবং সন্তানাদির ইতিহাসও মুঘল দরবারের রাজনীতি এবং তৎকালীন সংকটের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। তিনি একাধিক বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে তাঁর উত্তরাধিকারী শাহ আলম (দ্বিতীয়) ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে পরিচিত।
বিবাহ ও বেগমগণ
দ্বিতীয় আলমগীর তাঁর জীবনে বেশ কয়েকটি বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-বেগম জিনাত মহল (বিলাল কুয়ার)। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় আলমগীরের প্রধানা মহিষী বা প্রধান স্ত্রী। তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বুদ্ধিমতী নারী ছিলেন। দ্বিতীয় আলমগীরের মৃত্যুর পর যখন দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তাল, তখন জিনাত মহল তাঁর পুত্র শাহ আলমকে সিংহাসনে বসাতে এবং আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালীর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাসে তিনি ‘মহল-ই-খাস’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
ফয়জুন নেসা বেগম ছিলেন সম্রাটের অন্যতম প্রিয় স্ত্রী। জোহরা বেগম ছিলেন মুঘল রাজপরিবারেরই একজন সদস্য, যার সাথে রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে সম্রাটের বিয়ে হয়েছিল।
সন্তানাদি
দ্বিতীয় আলমগীরের বেশ কয়েকজন সন্তান ছিল। মুঘল নথিপত্র অনুযায়ী তাঁর অন্তত চারজন পুত্র এবং বেশ কয়েকজন কন্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের মধ্যে ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহজাদা আলী গৌহর (পরবর্তীকালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম)। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় আলমগীর ও বেগম জিনাত মহলের জ্যেষ্ঠ পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর তিনি ‘দ্বিতীয় শাহ আলম’ নাম নিয়ে মুঘল সিংহাসনে বসেন (শাসনকাল: ১৭৫৯-১৮০৬)।
তাঁর আমলেই ঐতিহাসিক বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) সংঘটিত হয়েছিল এবং তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৪৭ বছর রাজত্ব করেন, যা পতনের যুগে মুঘলদের জন্য দীর্ঘ সময়।
শাহজাদা মির্জা বাবা ছিলেন দ্বিতীয় আলমগীরের দ্বিতীয় পুত্র। দিল্লির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মারাঠাদের সাথে সমঝোতার ক্ষেত্রে তাঁর নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়। ১৭৫৭ সালে আহমদ শাহ আবদালী যখন দিল্লি আক্রমণ করেন, তখন দিল্লির সাথে আফগানদের রাজনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য শাহজাদা হেদায়ত বখশকে আফগান রাজপরিবারের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। শাহজাদা মির্জা জিলানী সম্পর্কে খুব বেশি রাজনৈতিক তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ তিনি মূলত লাল কেল্লার অভ্যন্তরীণ জীবনযাপনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন।
দ্বিতীয় আলমগীরের কন্যাদের তৎকালীন রাজনৈতিক চুক্তি বা সন্ধির অংশ হিসেবে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৭৫৭ সালে। আহমদ শাহ আবদালী যখন দিল্লি জয় করেন, তখন সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের এক কন্যা তহমিদা বেগম (বা ইফরৎ-উন-নেসা)-এর সাথে আহমদ শাহ আবদালীর পুত্র তৈমুর শাহ আবদালীর বিয়ে দেওয়া হয়। এটি ছিল মূলত মুঘল ও আফগানদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বৈবাহিক চুক্তি।
নির্মম হত্যাকাণ্ড ও নির্মম অবসান
উজির ইমাদ-উল-মূলক যখন দেখলেন যে সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর ধীরে ধীরে মারাঠা এবং আফগানদের সাথে গোপনে যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন, তখন তিনি সম্রাটকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ১৭৫৯ সালের ২৯শে নভেম্বর, উজির সম্রাটকে মিথ্যা আশ্বাস দেন যে কোটলা ফাতেহ শাহ নামক স্থানে একজন মহান সুফি সাধক এসেছেন, যিনি সম্রাটের সাথে দেখা করতে চান।
ধার্মিক সম্রাট উজিরের পাতা ফাঁদে পা দেন এবং সেখানে যাওয়া মাত্রই উজিরের আততায়ীরা তাঁকে নির্মমভাবে ছুরি মেরে হত্যা করে। তাঁর মরদেহ লাল কেল্লার পেছনে যমুনা নদীর তীরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে সাধারণ মানুষ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে হুমায়ুনের সমাধিতে সমাহিত করে।
পারিবারিক ট্র্যাজেডি
দ্বিতীয় আলমগীরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসে। উজির ইমাদ-উল-মূলক সম্রাটের পরিবারের অনেককেই বন্দি করেন। তবে জ্যেষ্ঠ পুত্র আলী গৌহর (দ্বিতীয় শাহ আলম) আগেই দিল্লি থেকে পালিয়ে বিহার ও বাংলার দিকে চলে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান এবং পরবর্তীতে মারাঠা ও সুজা-উদ-দৌলার সহায়তায় নিজের অধিকার ফিরে পান।
ইতিহাসে তাঁর মূল্যায়ন
দ্বিতীয় আলমগীর ব্যক্তিগতভাবে কোনো নিষ্ঠুর বা মন্দ শাসক ছিলেন না। তবে তিনি এমন এক সময়ে সিংহাসনে বসেছিলেন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত সম্পূর্ণ ধসে পড়েছিল। মারাঠা, আফগান এবং ব্রিটিশদের ত্রিমুখী চাপ এবং ঘরের শত্রু উজির ইমাদ-উল-মূলকের ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি ইতিহাসের অন্যতম এক অসহায় ও করুণ মুঘল সম্রাট হিসেবে রয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শাহ আলম (দ্বিতীয় শাহ আলম) দিল্লির পরবর্তী সম্রাট হন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি