যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চেনা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে গিয়ে এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল ও পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সোমবার (১ জুন) তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সশরীরে গিয়ে তার লিখিত পদত্যাগপত্রটি হস্তান্তর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তা সদয় গ্রহণ করেছেন।
শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার এই আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে একটি ‘অনন্য নজির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) অন্যতম সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা। সোমবার দুপুরে মন্ত্রীর পদত্যাগের খবরটি অফিশিয়ালি নিশ্চিত হওয়ার পর, দুপুর ১টা ১৩ মিনিটে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এই ছাত্রনেতা।
ডাকসু নেতা সর্ব মিত্র চাকমা তার পোস্টে লিখেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আমাদের দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি সত্যিই এক বিরল ঘটনা, যেখানে সবাই যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, সেখানে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী মানসিকতা দেখিয়েছেন।”
পদত্যাগপত্রে কী লিখেছেন বিদায়ী মন্ত্রী?
দায়িত্বশীল এই মন্ত্রী হঠাৎ কী কারণে পদত্যাগ করলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন তৈরি হলেও তার মূল পদত্যাগপত্রের কপি থেকে পদত্যাগের আসল ও সুনির্দিষ্ট কারণটি জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো সেই চিঠিতে দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, ‘আমি দীপেন দেওয়ান, এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছি। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমি নানাবিধ জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছি। বর্তমানে আমার এই শারীরিক অসুস্থতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাবিধ দৃশ্যমান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধির স্বার্থেই তিনি স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে থাকা ঠিক হবে না, তাই বর্তমান পদ থেকে তাঁর অনতিবিলম্বে অব্যাহতি গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক।
কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে এক পরিচ্ছন্ন প্রতীক
দীপেন দেওয়ানের ব্যক্তিগত সততা ও মার্জিত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের উচ্চ প্রশংসা করে সর্ব মিত্র চাকমা তার পোস্টে আরও যোগ করেন, “মাননীয় মন্ত্রীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতদূর চিনেছি ও জেনেছি—তিনি অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত, রুচিশীল এবং স্বল্পভাষী একজন মানুষ। বর্তমান দেশের রাজনীতিতে যেখানে কাদা ছোড়াছুড়ি ও একে অপরকে ব্লেম গেম করা নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে তিনি তাঁর সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিরোধী পক্ষকে কখনো কোনো কটু বা কুরুচিপূর্ণ কথার মাধ্যমে আক্রমণ করেননি। বর্তমান বাংলাদেশের জন্য ঠিক এমন পরিচ্ছন্ন, নীতিবান ও আদর্শিক রাজনীতিবিদই আমাদের অত্যন্ত দরকার।”
শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজে দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত সক্রিয়, নিষ্ঠাবান ও আন্তরিক ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নেপথ্যের সমীকরণ নিয়ে প্রশ্ন
যদিও দীপেন দেওয়ান অসুস্থতাকেই পদত্যাগের প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন, তবুও এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সমীকরণ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রেখে ডাকসু নেতা লিখেছেন, “আমি ঠিক জানি না তিনি হুট করে এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছেন, এর পেছনে হয়তো কোনো অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক বিষয়ও থাকতে পারে। কিন্তু দেশ ও অবহেলিত পার্বত্যবাসীর সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে তার মতো একজন ব্যক্তিত্বের আসীন থাকা অত্যন্ত দরকার ছিল।” একই সাথে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তাঁকে আবারও অনুরোধ করেন, তবে দেশ ও মাটির টানে তিনি নিশ্চয়ই না করবেন না।”
রেকর্ড ভোটের জননন্দিত নেতা
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দেশের ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলের আসন থেকে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন দীপেন দেওয়ান। তার এই আকাশচুম্বী ও নজিরবিহীন জনপ্রিয়তার কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকে সরাসরি পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
কিছুদিন আগেই পর্যটন খাতের উন্নয়ন নিয়ে ছড়ানো কৃত্রিম ভীতি বা ‘জুজুর ভয়’ উপেক্ষা করে পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন এই প্রবীণ নেতা; তবে শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার কাছে নতি স্বীকার করে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হলো।
আজ সোমবার দুপুরে মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি অফিশিয়ালি নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, সম্পূর্ণ শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেই তার আবেদনটি সদয় গ্রহণ করেছেন। এক জননন্দিত ও রেকর্ড ভোটে জয়ী মন্ত্রীর এমন আকস্মিক স্বেচ্ছায় বিদায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি



























