
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে জেট ফুয়েলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। এতে আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে বিমানের জ্বালানির দাম, আর তার প্রভাব পড়ছে সরাসরি বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্পে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ও এয়ারলাইনগুলো জরুরি সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকেই জ্বালানি সংকট তীব্র হতে শুরু করে। খরচ সামাল দিতে এয়ারলাইনগুলো টিকিটের দাম বাড়িয়েছে, ফুয়েল সারচার্জ চালু করেছে এবং অনেক রুট কমিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় বিমান সংস্থা লুফথানসা ইতোমধ্যে ২৭টি বিমান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ বাজেট এয়ারলাইন ইজিজেট জানিয়েছে, তাদের বুকিং গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামনে আরও ফ্লাইট কমানো ও অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগারগুলো পুনরুদ্ধারে সময় লাগছে।
শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইজিজেটের শেয়ার প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে, রায়ানএয়ার ৬ শতাংশ এবং উইজ এয়ার ও লুফথানসা প্রায় ৩ শতাংশ করে দর হারিয়েছে।
অন্যদিকে নাইজেরিয়ার এয়ারলাইনগুলো সতর্ক করেছে, জ্বালানির দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ২৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় তারা ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারে। দেশটির এয়ারলাইন অপারেটরদের সংগঠন জানিয়েছে, বর্তমান আয়ে জ্বালানি খরচও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শোধনাগার পরিচালনাকারী ভিভা এনার্জি জানিয়েছে, এতে পেট্রোল ও এভিয়েশন গ্যাসোলিন উৎপাদন ব্যাহত হবে।
পর্যটন খাতেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রীরা এখন শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ গন্তব্যে ভ্রমণ করছেন। যদিও ধীরে ধীরে সাইপ্রাস, মিশর ও তুরস্কে ভ্রমণ আবার বাড়ছে।
চাহিদার এই পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে লুফথানসা এশিয়ামুখী নতুন ফ্লাইট চালু করলেও বিমান কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আগামী জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের জন্য এখনও মাত্র ৩০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা এয়ারলাইনগুলোর জন্য উদ্বেগজনক। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুম বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শোধনাগারের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, কারণ তাদের জেট ফুয়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে গিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ব্রুনাই ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন লিটার ডিজেল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, জেট ফুয়েল সংকট বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্পকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস