অধিক লাভের আশায় নরসিংদীর কৃষকরা সরিষা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। সামান্য পরিচর্যা আর স্বল্প খরচে চাষ লাভ বেশি হওয়ায় বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তারা। সরিষার হলুদ ফুল ও সবুজ গাছে ছেয়ে গেছে ফসলের মাঠ।
অগ্রহায়ণে শুরু হয় সরিষা চাষ এবং পৌষ-মাঘ মাসে ফসলি জমিগুলোয় দেখা যায় শুধু হলুদ আর হলুদ। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে সরিষার ক্ষেত। আমন ধান কাটার পর কয়েক মাসের জন্য পরিত্যক্ত থাকে কৃষকের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই কৃষিজমি।
আর সেই জমিতেই অতিরিক্ত ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন নরসিংদীর কৃষকরা। সরিষা ফুলের হলুদ রাজ্যে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত যেমন মাঠ, তেমনি ভালো ফলনের হাতছানিতে কৃষকের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। যেন সরিষার হলুদ হাসিতে স্বপ্ন দেখছে কৃষক।
আমন ধান কাটা শেষ হলে ফসলি জমিতে বীজ ছিটিয়ে আর হালকা চাষ দিয়ে করা যায় সরিষার আবাদ। এই শস্য আবাদের পর এ জমিতে অন্য ফসল বেশ ভালো হয়ে থাকে। আমন আর বোরো ধান আবাদের মাঝে যে সময় জমি পতিত থাকে, সে সময় আবাদ হওয়া সরিষার তেমন উৎপাদন খরচ নেই।
এছাড়াও একই সময়ে ক্ষেতে জৈব সারের অভাবও পূরণ হয়ে যায়, ফলে বাড়তি খরচ থেকে রক্ষা পায় কৃষক। কারণ বোরো আবাদে প্রচুর সারের প্রয়োজন হয়। সরিষার আবাদের ফলে পরবর্তী ফসলে খরচ কমে আসে।
চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে উন্নত জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। বেড়ে ওঠা গাছ আর ফুল দেখে বেশি ফলনের স্বপ্ন দেখছেন জেলার কৃষকরা। গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা এবারও সরিষা চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর প্রত্যেক চাষি বেশি মুনাফা লাভ করবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এই জেলা সরিষা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলার ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্য মাত্রার বেশি সরিষা আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। কৃষকরা অধিকাংশ জমিতে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) বারি-১৪, বিনা-৯, বারি-১৭, বারি-১৮ সরিষা আবাদ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছরের পর বছর স্থানীয় জাতের সরিষা চাষ করে ফলন কম হওয়া ও উৎপাদনে সময় বেশি লাগার কারণে কৃষকরা সরিষা চাষ অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতে উপজেলা কৃষি বিভাগ ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট’ উদ্ভাবিত বেশি ফলনশীল বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে।
এ জাতের সরিষা মাত্র ৭৫-৮০ দিনে ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টরে ফলন হয় প্রায় দেড় হাজার কেজি। সরিষা কেটে ওই জমিতে আবার বোরো ধানের আবাদ করা যায়। এতে কৃষি জমির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
সদর উপজেলার বালুসাইর গ্রামের সরিষা চাষি ইকবাল জানান, তিনি এ বছর ১ বিঘা জমিতে বারি-১৪ জাতের সরিষার আবাদ করেছেন। বিঘা প্রতি তার প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সরিষা ভালো হয়েছে, তিনি আশা করছেন ভালো ফলন হবে।
রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর বাজারে সরিষার দাম ভালো পাওয়ায় এবারও সরিষা চাষ করেছেন। ফলন ভালো ও দাম পেলে আগামী বছর সরিষা চাষে অনেকেই ঝুঁকে পড়বেন।
শিবপুর উপজেলার চৈতন্য গ্রামের কৃষক মজিবুর জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে এই সরিষা চাষ করছি। অন্যান্য ফসল থেকে সরিষা চাষ তুলনামূলক লাভজনক। আমন ধান কাটার পর আমরা সরিষার বীজ বুনি। আর এই সরিষা চাষের পর সেই জমিতে বোরো ধান চাষে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় সরিষা একটি দ্রুত অর্থকরী ফসল। নরসিংদী জেলায় বর্তমানে দুই ধরনের সরিষার আবাদ হচ্ছে। একটি দেশীয় জাতের সরিষা ও অন্যটি উন্নত জাতের সরিষা। উন্নত জাতের মধ্যে বারি-১৪, ১৭ ও ১৮ জাতের সরিষা এখানে আবাদ হচ্ছে। এছাড়া দেশি জাতের সরিষার আবাদ করা হচ্ছে। দেশি জাতের সরিষা থেকে উন্নত জাতের সরিষায় দ্বিগুণের বেশি ফলন হয়।
কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। বারি-১৪, ১৭, ১৮ সহ অন্যান্য সরিষা বপনের মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে এর ফলন পাওয়া যায়। এ সরিষা উঠিয়ে আবার বোরো আবাদ করতে পারেন বলে একে কৃষকরা ‘লাভের ফসল’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএকে








