পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আজ সোমবার (২৪ আগষ্ট) ইরানের রাজধানী তেহরান সফর করবেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত রবিবার এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য চলতি বছর এটি মুনিরের তৃতীয় ইরান সফর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা আল জাজিরাকে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সফরের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানাননি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই সফর আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে আরো এগিয়ে নেবে। তিনি জানান, তেহরানে অবস্থানকালে মুনির ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরের আগে মুনির ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে চার দিনের ব্যবধানে দুইবার ফোনে কথা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ফোনালাপে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
তৃতীয়বার তেহরান সফর
এ বছর এটি হবে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরানে তৃতীয় সফর। এর আগে এপ্রিলে প্রথমবার ইরান সফর করেন মুনির। এর কয়েক দিন আগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পর দুই দেশের মধ্যে ওই প্রথম সরাসরি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এরপর মে মাসে আবার তেহরান সফর করেন মুনির।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় ‘সামান্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। মুনিরের এবারের সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ সফরে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মক্কায় অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের বিষয়টিও ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুনিরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। হুতিদের হামলা বারবার জাহাজ চলাচলের পথে উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হুতিরা ইরানের কাছ থেকে সমর্থন পায় বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।
মুনিরের ইরান সফরে হুতি হামলা ও নতুন সামরিক নেতৃত্ব গুরুত্ব পেতে পারে
ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর হামলার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত ১১ আগস্ট বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিরা তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এতে তিন পাকিস্তানি নাবিক নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হন।
ওই সময় পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার হামলাটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে এর কঠোর নিন্দা জানান।
ইরানবিষয়ক সাংবাদিক রেজা আফজাল সামিরের মতে, মুনিরের এবারের সফরে ইরানের নতুন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেন নতুন আইআরজিসি প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সচিব। এসব পদে চলতি মাসের শুরুতেই নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদের হাতে কতটা ক্ষমতা আছে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কোনো সমঝোতা হলে সেটি বাস্তবায়ন করানোর ক্ষমতা ইসলামাবাদের সীমিত।
ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামার চিমা বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই পাকিস্তানকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখে, যার আলোচনায় কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। তার মতে, এ কারণে পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় অধ্যয়ন গোষ্ঠীর পরিচালক জাভেদ হেইরান-নিয়ার মতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পেছনে নিজেদের স্বার্থও রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে, এ নিয়ে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতা রয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ। তাই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি দুই-তারকা জেনারেল ও প্রতিরক্ষা কৌশলবিদ জাহিদ মেহমুদ আরও বলেন, মুনির এখনো তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তার মতে, পাকিস্তান এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
তবে সবাই পাকিস্তানকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী মনে করেন না। কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, এ ক্ষেত্রে কাতারই এখনো প্রধান মধ্যস্থতাকারী।
ক্রিগ বলেন, কাতার রাজনৈতিক মধ্যস্থতার নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করছে।
তার মতে, মুনিরের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তিনি মূলত ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছেন। ইরানে যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইআরজিসি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার গুরুত্ব বাড়ায় এই সামরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মুনির কী করতে পারেন, আর কী পারেন না
ইরানি সাংবাদিক রেজা আফজাল সামিরের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ, দুই পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় পাকিস্তান আলোচনার একটি কার্যকর পথ তৈরি করতে পারে।
সামির বলেন, ইরান পাকিস্তানের কথা শুনতে পারে, কারণ পাকিস্তানের এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাস্তব ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তার মতে, মুনিরের সফরের পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনায় দ্রুত অগ্রগতি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার সময়ও ঘনিয়ে আসতে পারে। মুনির যদি ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তাহলে এরপরই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
তবে মুনিরের সফর থেকে বড় ধরনের ফল পাওয়ার বিষয়ে সতর্ক কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ। তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হবে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো সমঝোতা মেনে চলার নিশ্চয়তা পাওয়া। পাশাপাশি ইয়েমেন বা ইরাকের মাধ্যমে নতুন করে উত্তেজনা না বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রিগের মতে, এমন কোনো সমঝোতা না হলে যোগাযোগের পথ খোলা থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও পাল্টাপাল্টি চাপ ও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল জাহিদ মেহমুদের মতে, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পাকিস্তানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরিতে পাকিস্তানই অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় সংকট
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তবে মুনিরের এবারের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
গত ১৭ জুন পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এর মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়নি।
ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে। দেশটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, বিদেশে থাকা ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করতে হবে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন এখনো এসব শর্ত পূরণ করেনি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত ঘোষণা করতে পারেন। মার্কিন কর্মকর্তারা এসব নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চলমান নৌ অবরোধের পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো ইরানের সরকারের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা এবং শেষ পর্যন্ত সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনাকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মুনিরের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
স্থবির হয়ে পড়া মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা আবার শুরু করতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি চলতি মাসের শুরুতে তেহরান সফর করেছিলেন। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল ছাড়াই তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য এলাকাতেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের ভূখণ্ড থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার শিকার হওয়ার দাবি করে সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই দাবি অস্বীকার করেছেন।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ



























