মহানগরী খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডের ২৬ নম্বরে ছয়তলা ভবন। আশপাশ বা অন্য কোনো ভবনের সঙ্গে এর মিল নেই।
শহরের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর অন্যতম এটি। গায়ে সাদামাটা ও আভিজাত্যের একটি সাইন বোর্ড; লেখা ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’।
স্থাপনাটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের গণহত্যা-নির্যাতনের চিহ্ন বহন করা দেশের একমাত্র আর্কাইভ ও জাদুঘর। প্রবেশ পথের ডান পাশে খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের সেই অভিশপ্ত ‘বয়লার’-এর বিধ্বস্ত অংশ।
‘পাক হানাদার বাহিনী’ মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করে এখানেই নির্মমভাবে হত্যা করে সেখানে।
গণহত্যার ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রায় একযুগ আগে খুলনায় যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে সুনসান নীরবতা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রধান ফটকে ভাঙচুরের পর আর তা চালু হয়নি। মিলছে না সরকারি অনুদান।
ফলে জাদুঘরে রক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নষ্ট হচ্ছে।
জাদুঘর সংশ্লিষ্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিরজিত খুলনায় ২০১৪ সালের ১৭ মে যাত্রা শুরু করে দেশের একমাত্র আর্কাইভ ও জাদুঘর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের উৎসাহে নগরীর ময়লাপোতাসংলগ্ন শেরেবাংলা রোডের একটি বাড়ি ভাড়া ছিল জাদুঘরের প্রথম ঠিকানা।
২০১৫ সালের আগস্টে তখনকার প্রধানমন্ত্রী নগরীর ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডের দ্বিতল একটি বাড়ি উপহার দেন। সংস্কারের পর ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সেই বাড়িতে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে স্থায়ী ঠিকানা পায় সংগ্রহশালাটি।
২০২৪ সালে সেখানে প্রায় ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর ছয়তলা ভবন নির্মাণ করে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাদুঘরটি স্থাপনা শৈলী ও নকশার দিক থেকে খুলনার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর অন্যতম। ওই বছরের মে মাসে জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। চালু ছিল মাত্র এক মাস।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই সংস্কারকাজ ও কারফিউয়ের কারণে জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে জাদুঘরের সামনে একটি হাসপাতালে ভাঙচুর চালানো হয়। ওই সময় জাদুঘরের মূল ফটকসহ বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকে নিরাপত্তা, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় জাদুঘরটির কার্যক্রম।
জাদুঘর সংশ্লিষ্টরা জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম বৃহৎ গণহত্যাটি সংঘটিত হয় খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে। ১৯৭১ সালের ২০ মে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের ওই গণহত্যার শিকার হন ভারতের সীমান্ত অতিক্রমের অপেক্ষায় নারী-শিশুসহ ১০-১২ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষ। সেই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে খুলনায় জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়। তবে শুধু খুলনা অঞ্চল নয়, মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন গণহত্যার নিদর্শন জায়গা পেয়েছে এই জাদুঘরে।
জাদুঘরে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি; শহীদুল্লা কায়সারের দুটি টাই ও ডায়েরি; বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দীন আহমেদের কোট; সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের কলম ও শাড়ি; সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও পাণ্ডুলিপি; জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার লেখা বই এবং ডা. আলীম চৌধুরীর ভিজিটিং কার্ড, ল্যাম্প, ডেন্টাল টুলকিট ও ডায়েরি।
এসব নিদর্শন শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখানে দান করেন। জাদুঘুরে আরো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, শহীদদের চিঠিসহ ১৯২ ধরনের নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাড়ে তিন শতাধিক ছবি। আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে ১০ হাজারের বেশি ছবি, দুই হাজারের মতো ভিডিওসহ অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য নথি। জাদুঘরটি বন্ধ থাকায় এসব নিদর্শন নষ্ট হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডে সম্পৃক্ত দুজন বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। ১১ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এ দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংসতার অন্যতম দলিল ‘গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’, এ দেশের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি চালু করার বিষয়ে কোনো সাড়া মিলছে না।
এদিকে গণপূর্ত বিভাগ বা জাদুঘর ও আর্কাইভ পরিচালনার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান মিলছে না। আর্থিক সংকটে প্রথম পর্যায়ে আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। নিরাপত্তা, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে জাদুঘর এখন বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ খুলনা জেলার সাবেক কমান্ডার ও আহ্বায়ক মো. আবু জাফর গণহত্যা-আর্কাইভ জাদুঘরটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এটি সংস্কার করে চালু করা হোক। দুষ্কৃতকারীরা ক্ষতি করে গেছে, তাই বলে হাত গুটিয়ে থাকা ঠিক হবে না। ইতোমধ্যে জাদুঘরটি চালুর দাবি জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে হয়তো অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, তাই সরকারকেই মুক্তিযুদ্ধের এ প্রতিষ্ঠানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।’
জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, ‘জাদুঘরটি চালু করতে ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে আলাপ করেছি। প্রতিষ্ঠানটিতে একাত্তরের পাশাপাশি নব্বই, চব্বিশসহ সব গণ-আন্দোলনের ইতিহাস রাখার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু তেমন সাড়া মিলছে না।’ তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল, স্টাফ বেতনসহ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ


























