পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা মুসলিমরা প্রতিদিন নবীজি (স.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করেন। কেউ নামাজের পর, কেউ তাঁর নাম শুনে, আবার কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় দরুদ পাঠ করেন। কিন্তু দূরদেশ থেকে পাঠ করা সেই দরুদ ও সালাম কীভাবে নবীজি (স.)-এর কাছে পৌঁছে?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নবীজি (স.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর রহমত পাঠান। হে মুমিনরা, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা আহজাব: ৫৬)
হাদিসে জানা যায়, আল্লাহ তাআলা এমন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন, যারা পৃথিবীতে বিচরণ করেন এবং উম্মতের পক্ষ থেকে পাঠানো সালাম নবীজি (স.)-এর কাছে পৌঁছে দেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর এমন কিছু ফেরেশতা রয়েছেন, যারা পৃথিবীতে বিচরণ করেন এবং আমার উম্মতের পক্ষ থেকে পাঠানো সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন।’ (সহিহ ইবনু হিব্বান: ৯১৪)
অর্থাৎ নবীজি (স.)-এর ওপর সালাম পাঠানোর জন্য তাঁর রওজা মোবারকের কাছে উপস্থিত থাকা জরুরি নয়। উম্মতের কেউ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, তাঁর পাঠানো সালাম আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা নবীজি (স.)-এর কাছে পৌঁছে দেন।
এ বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার ওপর দরুদ পাঠ করো। তোমরা যেখানেই থাকো, তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২০৪২)
জুমার দিনে দরুদের বিশেষ গুরুত্ব
দরুদ পাঠের জন্য জুমার দিনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নবীজি (স.) এ দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে উৎসাহিত করেছেন।
আওস ইবনু আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দিনসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হলো জুমার দিন। এদিন আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিলো, এদিনই তাঁর রুহ কবজ করা হয়েছিলো, এদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এদিনই বিকট শব্দ করা হবে। কাজেই এদিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)
তাই জুমার দিন নবীজি (স.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ আমল।
এক দরুদে ১০ রহমত
দরুদ পাঠের প্রতিদানও অনেক বড়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৪০৮)
অল্প সময়ে করা যায় এমন এই আমলের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এত বড় প্রতিদান মুমিনের জন্য নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয়।
নবীজির নাম শুনে দরুদ না পড়া কৃপণতা
নবীজি (স.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর ওপর দরুদ পাঠের ব্যাপারেও হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে।
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার কাছে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না।’ (জামে তিরমিজি: ৩৫৪৬)
তাই নবীজি (স.)-এর নাম শুনলে তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা একজন মুমিনের জন্য ভালোবাসা ও সম্মানের অন্যতম প্রকাশ।
নবীজি (স.) যেভাবে দরুদ শিখিয়েছেন
সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (স.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁরা কীভাবে তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করবেন। তখন নবীজি (স.) তাঁদের দরুদ পাঠের একটি পদ্ধতি শিখিয়ে দেন, যা ‘দরুদে ইবরাহিম’ নামে পরিচিত। এটি নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করা হয়।
কাব ইবনু উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবিরা বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর সালাম কীভাবে দিতে হয়, তা আমরা জানি। আপনার ওপর কীভাবে দরুদ পাঠ করব?’ তখন নবীজি (স.) তাঁদের দরুদ পাঠের পদ্ধতি (দরুদে ইবরাহিম) শিখিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৭০)
তবে, অন্যান্য হাদিসে আরও অনেকভাবে দরুদ পাঠের শিক্ষা রয়েছে। মুমিনরা যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন।
নবীজি (স.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুমিনের জন্য মর্যাদাপূর্ণ একটি আমল। দূরত্ব এ আমলের পথে কোনো বাধা নয়। উম্মতের পক্ষ থেকে পাঠানো সালাম আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা নবীজি (স.)-এর কাছে পৌঁছে দেন। আর একবার দরুদ পাঠের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করেন। তাই নবীজি (স.)-এর নাম উচ্চারিত হলে দরুদ পাঠ করা এবং জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
তথ্যসূত্র: কোরআন: ৩৩:৫৬; আবু দাউদ: ১০৪৭, ২০৪২; মুসলিম: ৪০৮; তিরমিজি: ৩৫৪৬; বুখারি: ৩৩৭০
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























