শ্রাবণের মেঘলা আকাশ আর বারুদের গন্ধে থমথমে বাতাসের বুক চিরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রচিত হয়েছিল এক রক্তস্নাত মহাকাব্য। আগের দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো জনতার সমুদ্র থেকে উচ্চারিত ‘এক দফা’ পদত্যাগের দাবির পরদিন—৪ আগস্ট ছিল সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম প্রহর। কিন্তু রাজপথ সেদিন কেবল কোনো সাধারণ বিক্ষোভের ময়দান ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল কোটি মুক্তিকামী জনতার সাথে এক পরাক্রমশালী স্বৈরাচারের মরণপণ যুদ্ধের ময়দানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার শেল-সাউন্ড গ্রেনেড, আর শাসকদলের সশস্ত্র ক্যাডারদের তাণ্ডবে একদিনেই রক্তের গঙ্গা বয়ে যায় সারা দেশে—ঝরে যায় ১১৪টিরও বেশি তাজা প্রাণ, আহত হন দুই হাজারের বেশি মানুষ।
অন্যদিকে, অবরুদ্ধ গণভবনের বন্ধ ঘরে স্বৈরশাসকের শেষ ধমক, আমলাদের বাঁচবার মরিয়া চক্রান্ত, হাসপাতালের বারান্দায় রক্তে ভেজা স্বজনহারাদের আহাজারি এবং সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে রচিত হয় পতনগাথা। ৪ আগস্টের এই অভূতপূর্ব রক্তপাত ও গণপ্রতিরোধের ওপর দাঁড়িয়েই সেদিন বিকেলে ঘোষিত হয় ‘লং মার্চ টু ঢাকা’, যা পরদিন ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এক শৃঙ্খলমুক্ত নতুন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
রাজপথে জনতার মহাসমুদ্র
৩ আগস্টের ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ ঘোষণার পর ৪ আগস্ট ভোর থেকেই দেশজুড়ে নেমে আসে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ট্যাক্স-খাজনা বন্ধ, সরকারি অফিস বয়কট এবং রাজপথ দখলের আহ্বানে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ।
যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডা, মগবাজার, সাইন্সল্যাব, শাহবাগ, উত্তরা, মিরপুর থেকে শুরু করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—ভয় ও মৃত্যুকে তুচ্ছ করে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ লাঠি আর জাতীয় পতাকা হাতে এক অভিন্ন লক্ষ্যে রাজপথে নেমে আসেন।
অবরুদ্ধ গণভবনে ষড়যন্ত্রের ছক
বাইরে যখন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে কোটি জনতার গর্জন, গণভবনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অবরুদ্ধ কামরায় তখন চলছিল শেষ রক্ষা পাওয়ার মরিয়া নীলকণশা।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সাথে একের পর এক জরুরি বৈঠক করেন। আন্দোলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ আখ্যা দিয়ে যেকোনো মূল্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে রাজপথ ফাঁকা করার নির্দেশ দেন।
খবর পৌঁছানো রোধ করতে সারা দেশে ফোরজি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জারি করা হয় অনির্দিষ্টকালের কার্ফু।
সচিবালয় ও প্রশাসনের অনুগত আমলারা তখন ব্যস্ত ছিলেন ভুয়া তথ্য ও নথিপত্র তৈরি করে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সামলাতে।
রক্তগঙ্গা ও পুলিশ-বিজিবি’র তাণ্ডবলীলা
জনতার বাঁধভাঙা প্রতিরোধ ভাঙতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির একটি অংশ তাজা বুলেট, ছররা গুলি, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ করে। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে পোড়া চামড়া আর বারুদের গন্ধে।
রামদা, পিস্তল ও লাঠিসোটা নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয় শাসকদলের অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র সাঙ্গপাঙ্গরা।
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
চরম এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালাতে স্পষ্ট অনীহা প্রকাশ করে। জওয়ানদের এই অবস্থান গণভবনের শাসকগোষ্ঠীকে গভীর শঙ্কার মুখে ফেলে দেয়।
২৫ জেলায় প্রাণহানি
৪ আগস্ট একক দিনেই সারা দেশে অন্তত ১৩০ থেকে ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান (যার মধ্যে জাতিসংঘের প্রাথমিক রিপোর্টে ৯৫ থেকে ১১৪ জন নিহতের কথা উল্লেখ করা হয়)। এর মধ্য দিয়ে ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী পর্বে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬শতাধিক জনেরও বেশি। (পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও আন্তর্জাতিক তদন্তে এই মোট নিহতের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়ে যায়)।
এদিন সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে ঢাকাসহ সারা দেশের অন্তত ২৫টি জেলা পরিণত হয়েছিল রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ময়দানে। রাজপথে নেমে আসা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে একদিনেই রক্তে ভেসে যায় দেশ।
সেদিনের সহিংসতার শীর্ষে ছিল সিরাজগঞ্জ জেলা। এনায়েতপুর থানায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংঘর্ষে ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ পুরো জেলায় একদিনেই প্রাণ হারান প্রায় ২৫ জন মানুষ। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও অন্যান্য এলাকাতেও চরম বিশৃঙ্খলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকাগুলোতে চলে দফায় দফায় বুলেটের তাণ্ডব। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, জিঞ্জিরা ও কেরানীগঞ্জে অগণিত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে তাজা বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ করা হয়। এতে কেবল ঢাকার রাজপথেই প্রাণ হারান অন্তত ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী ও পথচারী।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় সশস্ত্র রাজনৈতিক ক্যাডারদের প্রকাশ্য আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণে রক্তের গঙ্গা বয়ে যায়। ফেনীর মহীপাল ও শহরের অলিগলিতে গুলিতে প্রাণ যান ৮ থেকে ১০ জনের। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের ঝুমুর ও বাগবাড়ি এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ছাদ থেকে ও রাজপথে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে চার শিক্ষার্থীসহ প্রাণ হারান ৮ থেকে ১২ জন মানুষ, আহত হন শতাধিক।
শিল্পাঞ্চল নরসিংদীতে সংঘর্ষের তীব্রতা ছিল অত্যন্ত বেশি। মাধবদী ও বাসাইল এলাকায় রাজনৈতিক ক্যাডার ও আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি সংঘাত এবং গুলিবর্ষণে ৬ থেকে ৮ জন নিহত হন। উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার বগুড়ায় সাতমাথা ও রেলগুমটি এলাকায় পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও তাজা গুলিতে প্রাণ হারান ৫ থেকে ৭ জন।
একই দিনে রংপুর, সিলেট এবং মাগুরা জেলাতেও রাজপথ দখলে নেওয়ার লড়াইয়ে চারজন করে আন্দোলনকারী প্রাণ হারান। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা ও সিলেটের রাজপথে ছররা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হন অগণিত তরুণ।
এছাড়া পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ এবং শেরপুর জেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের টিয়ার শেল ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রতিটি জেলায় ৩ জন করে মোট ১৫ জন নিহত হন। মুন্সীগঞ্জের সুপারমার্কেট চত্বরে এবং শেরপুরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আহতদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
সংঘাতের এই দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও। গাজীপুর, জয়পুরহাট, বরিশাল, ভোলা, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে পৃথক মিছিল, থানা ঘেরাও ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে পুলিশ এবং শাসকদলের হামলার মুখে সম্মিলিতভাবে আরও ১২ থেকে ১৫ জন প্রাণ হারান।
আহত ও গণগ্রেপ্তার
৪ আগস্টের সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাজা বুলেট, রাবার বুলেট ও ছররা গুলিতে একক দিনেই আহত হন আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায়। ফলে আন্দোলনের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজারের বেশি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল গুলিবিদ্ধ ও রক্তে ভেজা তরুণদের চিকিৎসায় হিমশিম খায়।
কারফিউ ও অনির্দিষ্টকালের জন্য ফোরজি ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেই ৪ আগস্ট এক দিনেই দেশজুড়ে সহস্রাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মাধ্যমে ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা বিশ হাজারের কোঠায়। অগণিত অজ্ঞাতনামা আসামির নামে মামলা দায়ের করে ছাত্র ও তরুণদের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে এক আতঙ্কের রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল।
হাসপাতাল ও আদালত প্রাঙ্গণ
৪ আগস্টের সহিংসতার চিত্র দেশের হাসপাতাল ও আদালতগুলোতে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির রূপ নেয়।
ঢাকা মেডিকেল, পঙ্গু হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ পূর্ণ হয়ে ওঠে তাজা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত তরুণদের দেহ। করিডোর থেকে বারান্দা—সর্বত্র রক্তের দাগ আর স্বজনহারাদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল চারপাশ।
অন্যদিকে, ‘ব্লক রেইড’ চালিয়ে গ্রেপ্তার করা শত শত শিক্ষার্থীকে হাতকড়া পরিয়ে আনা হচ্ছিল আদালতে। প্রিজন ভ্যানের গরাদের ওপাশ থেকে সন্তানের অশ্রু আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের আহাজারিতে আদালত প্রাঙ্গণ এক হৃদয়বিদারক রূপ নেয়।
নতুন ভোরের পূর্বাভাস
৪ আগস্টের এই অভূতপূর্ব রক্তপাত ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ছাত্র-জনতাকে পিছু হটাতে পারেনি; বরং সেদিন বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষিত হয় চূড়ান্ত কর্মসূচি—‘লং মার্চ টু ঢাকা’।
৪ আগস্টের রক্তস্নাত আত্মত্যাগই প্রমাণ করেছিল, ফ্যাসিবাদের তাসের ঘর ভেঙে পড়েছে। অদম্য মুক্তিকামী জনতার এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামই পরদিন ৫ আগস্টে কোটি মানুষের ঢাকায় আসার পথ সুগম করে এবং শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে এক নতুন, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















