জুলাইয়ের সূর্য তখন এক অবরুদ্ধ, রক্তাক্ত আর হাহাকার ছড়ানো বাংলাদেশের ওপর আলো ফেলছে। গণগ্রেপ্তার, গুম, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড আর বাষ্পরুদ্ধ এক উপত্যকার রূপ নিয়েছিল পুরো দেশ। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই, বুধবার—ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি কেবল একটি তারিখ ছিল না; এটি ছিল স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা শাসনের বিরুদ্ধে এক চরম প্রতিবাদ এবং বিপরীতে শাসকের মসনদ রক্ষার শেষ ও সবচেয়ে মারমুখী আক্রমণের দলিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা ৯ দফা দাবি এবং সহযোদ্ধাদের রক্তের হিসাব চাইতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এদিন ডাক দিয়েছিল ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ বা বিচারযাত্রার। কিন্তু শাসকের বন্দুক আর বুট সেই ন্যায়বিচারের আকুতিকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল হিংস্র নিষ্ঠুরতায়।
আদালতের আঙিনায় বুটের শব্দ: রাজপথ থেকে হাইকোর্ট
ন্যায়বিচারের যে প্রতীক—সেই সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ সেদিন রূপান্তরিত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। দুপুর ১২টা থেকেই হাইকোর্টের মাজার গেট, দোয়েল চত্বর এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন অকুতোভয় শিক্ষক, আইনজীবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাদা দল’-এর শিক্ষক লুৎফর রহমানদের মতো অভিভাবকরা যখন শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল আর লাঠিচার্জের শব্দে কেঁপে উঠেছিল চত্বর।
তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে চলেছিল অবস্থান ও প্রতিরোধ। বাধা পেরিয়ে আইনজীবীদের একটি দল ভেতরে মিছিল বের করলে আদালত প্রাঙ্গণের পবিত্রতা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে সেখানে ঢোকে সশস্ত্র পুলিশ। বেলা ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা দোয়েল চত্বর হয়ে শহীদ মিনারের দিকে এগোতে চাইলে রাজপথে নামানো হয় দাঙ্গা পুলিশ ও বিজিবির সাঁজোয়া যান। টিয়ারশেলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রাজপথ। রাজধানী ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেটে একই থাবা বসায় শাসকযন্ত্র। কেবল সিলেটেই কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডে রক্তাক্ত হন অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী। সারাদেশে একদিনেই আহত হন ৯০ জনের বেশি আর গ্রেপ্তার হন শতাধিক আন্দোলনকারী।
হাসপাতালের হাহাকার ও গ্রেপ্তারের মহোৎসব
৩১ জুলাই দেশের হাসপাতালগুলো ছিল স্বজনদের করুণ আর্তনাদ আর রক্তের গন্ধে ভারী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে কুর্মিটোলা—সবখানেই গুলিতে ঝাঁঝরা, টিয়ারশেলে অন্ধপ্রায় আর পুলিশের বুটের আঘাতে পঙ্গু হওয়া তরুণদের নীরব কান্না। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলেন আহতদের ক্ষত দেখতে নয়, বরং নিজের ক্ষমতার রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে। হাসপাতালে দাঁড়িয়েই তিনি ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে শোনান তার চিরচেনা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব—”শ্রীলঙ্কার মতো সরকার উৎখাতের চেষ্টা চলছে।”
অথচ বাস্তবে তখন দেশের ওপর চলছিল এক মহাতাণ্ডব। গত ১৫ দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৭৩৫ জনে। কেবল ৩০ জুলাই রাত থেকে ৩১ জুলাই দুপুর পর্যন্ত সারাদেশে আরও ৩৪১ জনকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় হাজতে। ডিবি কার্যালয়ে তখন বন্দী রাখা হয়েছিল আন্দোলনের ছয় প্রধান সমন্বয়ককে, যাদের ওপর চালানো হচ্ছিল মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রভাবশালী সিনেটর পর্যন্ত যখন এই বেআইনি আটকের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, শাসক তখন নতুন ছক কষছিল।
রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও আন্দোলন থামানোর ‘নীলনকশা’
রাষ্ট্রের সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলনকে পিষে মারার চূড়ান্ত নীলনকশা রচিত হচ্ছিল ওই দিনগুলোতে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবন থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারণী কেন্দ্রগুলোতে বসেছিল রুদ্ধদ্বার বৈঠক। আজ্ঞাবহ আমলা, বিভিন্ন বাহিনী প্রধান, ১৪ দলের শরিক নেতা এবং সুশীল সমাজের একটি সুবিধাভোগী অংশের সমন্বয়ে গঠিত অক্ষশক্তি তখন কীভাবে আন্দোলন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, তার রোডম্যাপ তৈরি করছিল।
একদিকে চলছিল দেখানোর জন্য ডিবি কার্যালয় থেকে নাটকীয় পরিবর্তন—তীব্র সমালোচনার মুখে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদকে ডিবির পদ থেকে সরিয়ে মো. আশরাফুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু মূল কৌশলে ছিল শুধুই বুলেট আর কঠোরতা। বিজিবি ও পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল ‘মারমুখী’ অবস্থান ধরে রাখার কড়া নির্দেশ। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতেও বিভাজন স্পষ্ট করে শাহ মঞ্জুরুল হকের মতো আওয়ামীপন্থী অংশ সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যদিও সভাপতি ব্যারিস্টার খোকন দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও জনরোষের বিস্ফোরণ
রাষ্ট্রীয় সমস্ত দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলনের আগুন তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ফলকার তুর্ক চিঠি পাঠিয়ে শেখ হাসিনাকে সতর্ক করেন এবং নিরাপত্তা খাতের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের দাবি জানান। বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের নতুন অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি সংক্রান্ত বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনা স্থগিত করে দেয়। পরিস্থিতি কতটা বেগতিক, তা বুঝে তৎকালীন অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা নিঃশব্দে ফ্লাইটের টিকিট কেটে পাড়ি জমাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, কানাডা ও দুবাইতে।
একদিকে ১৪ দিন পর সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ) সচল করে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা, অন্যদিকে রাজপথে আরও রক্ত ঝরানোর প্রস্তুতি—৩১ জুলাইয়ের এই দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করছিল যে, শাসক কতটা তাসের ঘরের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
পরদিনের জন্য (১ আগস্ট) আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছিল ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ বা শহীদদের স্মৃতিচারণ কর্মসূচি। দেওয়াল লিখন, গ্রাফিতি আর ডিজিটাল পোর্ট্রেটে পুরো দেশকে নতুন করে সাজানোর সেই ডাক মূলত বুঝিয়ে দিয়েছিল—৩১ জুলাই পুলিশের লাঠি, সাউন্ড গ্রেনেড আর গ্রেপ্তারের যে অন্ধকার শাসক ছড়াতে চেয়েছিল, তা ভেঙে পতন এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার।
মৃত্যু উপত্যকায় লাশের হিসাব
৩১ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ জন মারা যান। তাঁর নাম আবদুর রহমান (৪৪), পেশায় কৃষক। তিনি গত ২০ জুলাই নরসিংদীর পাঁচদোনা এলাকায় সংঘাতের মাঝে পড়ে কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
এছাড়া ৩১ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় দৈনিকগুলোর (যেমন প্রথম আলো) পাওয়া অনুসন্ধানী হিসাব অনুযায়ী কোটা সংস্কার আন্দোলনে মোট মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছিল ২১২ জনে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন অধিকার রক্ষা সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা ছিল ২৬৬ জনেরও বেশি।
তবে ২০২৪ এর ৩০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ১৫০ জন বলে তথ্য দিয়েছিলেন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি












