উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে মর্মান্তিক যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় বড় বোনকে হারিয়ে দীর্ঘদিন বিষাদে আচ্ছন্ন থাকা শিশু তাহসিন আবদুল্লাহর মুখে অবশেষে এক চিলতে হাসি ফুটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তোলা একটি ভাইরাল ছবির পেছনের হৃদয়বিদারক গল্প জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নেন তাহসিন ও তার বাবাকে। আকস্মিক এই ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত তাহসিন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে উপহার গ্রহণ করে, কিছু সময় তাঁর সঙ্গে কাটায় এবং সেলফি তোলে।
বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ শেষে বিস্তারিত সাংবাদিকদের জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
তিনি বলেন, তাহসিন জানত না যে আজ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেই তার সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। তাহসিন ও তার বাবাকে বাসা থেকে শুধু বলা হয়েছিল একটি বিশেষ জায়গায়, অর্থাৎ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যেতে হবে। গাড়িতে চড়ে সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে প্রবেশের পর তাহসিন জানতে পারে, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কক্ষে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রীকে দেখেই তাহসিন খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। সালাম দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, আজকে আমার সবচেয়ে খুশির দিন! প্রধানমন্ত্রীকে এত কাছ থেকে দেখছি!
অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনী অনুষ্ঠানে গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি আলোকচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। গ্যালারিতে শত শত শিশুর ভিড়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোরের প্রধানমন্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া দুটি হাত আর চোখেমুখের উচ্ছ্বসিত হাসি স্পর্শ করে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও দৃষ্টি কাড়ে ছবিটি। এরপরই তিনি নির্দেশ দেন শিশুটিকে খুঁজে এনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর।
এদিকে বুধবার ভাইরাল সেই ছবি নিয়ে একটি গণমাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বোন হারানোর কষ্ট ভুলে হাসল ছোট্ট তাহসিন শিরোনামের প্রতিবেদনে তাহসিনের পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ট্র্যাজেডির কথা তুলে ধরা হয়।
জানা গেছে, সকালে আমরা বিএনপি পরিবার-এর সদস্যসচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন তাহসিনের বাসায় যান এবং বাবাসহ তাহসিনকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে কিছু সময় কাটান ও গল্প করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আরও জানান, সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনকে একটি ড্রোন সেট ও একটি বাস্কেটবল উপহার দেন। উপহার পেয়ে তাহসিন খুশিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরেকটি আবদার করে বসে—বাস্কেটবলে একটি অটোগ্রাফের। প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে কলম দিয়ে তার সেই আবদারও পূরণ করেন।
মাইলস্টোন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিনের পুরো নাম তাহসিন আবদুল্লাহ। তার বাবা নাজমুল হক একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে তাসমিয়া ২০২৫ সালে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তাসমিয়া ও তাহসিন একই স্কুলে পড়ত।
সেদিনের ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে করে তাহসিনের বাবা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, সেদিন দুই সন্তান দুটি আলাদা ভবনে ছিল। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, আর তাসমিয়া পড়ত অষ্টম শ্রেণিতে। যুদ্ধবিমানটি আছড়ে পড়ে তাসমিয়াদের ভবনে। বিকট শব্দ শুনে ছোট্ট তাহসিন দৌড়ে যায় বোনকে খুঁজতে। কেউ একজন বলেছিল, স্যালাইন ও পানি লাগবে। তাই দুই হাতে পানির বোতল ও স্যালাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিন্তু বোন আর ফেরেনি। বোনকে হারানোর পর থেকে তাহসিন আর আগের মতো প্রাণখোলা হাসত না। এক হিলিং সেশনে সে কাগজে লিখেছিল, আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। ওকে অনেক মিস করি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।
উল্লেখ্য, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর গত দুই বছর ধরে রোটারি ক্লাব অব বনানীর তত্ত্বাবধানে শিশুদের কষ্ট ভুলে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে হিলিং সেশনের আয়োজন করা হয়। প্রথম বছর পূর্বাচলের ছুটি রিসোর্টে এবং এ বছর গাজীপুরের ছুটি রিসোর্টে এই সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে বন্ধুদের সঙ্গেই ছিল তাহসিন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন মাঠ প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখন তাঁর কাছাকাছি আসার মুহূর্তে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে। সেই নির্মল মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, ছবির ওই হাসিমাখা মুখটির পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক পারিবারিক ইতিহাস। বিষয়টি জানার পরপরই প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ মানবিক উদ্যোগ নেন।
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং বড় হয়ে কী হতে চায়, তা জানতে চান। তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়, যাতে মানুষের উপকার করতে পারে। তাহসিনের এই ভাবনার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তাকে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা ও নিয়মিত খেলাধুলা করার পরামর্শ দেন।
একপর্যায়ে প্রিয় খেলা ফুটবলের কথা জানালে প্রধানমন্ত্রী নিজের স্বাক্ষর করা একটি ফুটবলও তাহসিনের হাতে তুলে দেন।
সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন বলে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এভাবে দেখা করতে পারব, তা কল্পনাও করিনি। পুরো বিষয়টি আমার জন্য বড় সারপ্রাইজ ছিল। আজকের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের এই গল্প শোনাব। তারা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
তাহসিন আরও যোগ করে, প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে একদম পরিবারের মানুষের মতো কথা বলেছেন। একটুও নার্ভাস লাগেনি। আমি কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেছি। সেখানে রাখা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকা দেখে খুব ভালো লেগেছে। বাবার মোবাইল দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তুলেছি।
সাক্ষাৎকালে মাইলস্টোনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো তাহসিনের বাবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিকিৎসক শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এবং আমরা বিএনপি পরিবার-এর সদস্যসচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস






















