অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের জোরালো প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কোনো ‘আইনি বৈধতা নেই’ এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’।
আল জাজিরায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৭ জুলাই) গুতেরেস এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। ইসরায়েলি সরকারের এমন একটি সিদ্ধান্ত যখন এসেছে, যখন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা চরমে পৌঁছেছে। ইসরায়েল সরকার একদিকে যেমন বিদ্যমান বেশ কিছু বসতিকে বৈধতা দিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বসতি স্থাপনের জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে।
গুতেরেস মনে করেন, ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং একটি ‘ন্যায়সঙ্গত, টেকসই ও সার্বিক শান্তি’ প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের এমন বসতি নীতির সমালোচনা করে আসছে। তারা বারবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে এবং একই সঙ্গে সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত শুক্রবার সাফ জানিয়ে দেন, তার সরকার পশ্চিম তীরে অবৈধ কৃষিভিত্তিক আউটপোস্টগুলোকে খুব দ্রুত বৈধতা দেবে এবং একই সঙ্গে নতুন নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করবে।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-ও এক পরামর্শমূলক মতামতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চলমান দখলকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আউটপোস্ট বলতে সাধারণত সরকারি অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠা ছোট ছোট বসতিগুলোকে বোঝায়, যা ইসরায়েলের নিজস্ব আইনেই অবৈধ।
গত বৃহস্পতিবার থেকে পশ্চিম তীরে শুরু হওয়া সহিংসতায় অন্তত আট ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় দুইজন ইসরায়েলিও নিহত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা, অনেক ক্ষেত্রে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর প্রকাশ্য সুরক্ষায়, ফিলিস্তিনিদের বেসামরিক অবকাঠামো, জনপরিসর ও কৃষি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এই সহিংসতার কারণে অন্তত ১০টি ফিলিস্তিনি পরিবার বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে শনিবার পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৮ শিশুসহ মোট ৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় তিনজন ইসরায়েলি প্রাণ হারিয়েছেন।
ওসিএইচএ আরও জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির অন্তত ১,৩৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলি বাহিনী পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ জরুরি চিকিৎসাসেবা ও জীবিকার সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলে ওসিএইচএ জানিয়েছে।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী রূপ দেবে।
চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা যেভাবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা গাজায় ইসরায়েলি হামলার ভয়াবহতার সমান্তরালে ঘটছে। এতে উভয় অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতি ও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েই চলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বাংলা৭১নিউজ/এসকে

























