ঢাকা ১১:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ইসলামী ব্যাংকের শ্যামলী শাখায় গ্রাহক সমাবেশ অনুষ্ঠিত Logo বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ভারতের Logo ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চার গাড়ির সংঘর্ষ, ২ শিক্ষার্থী নিহত Logo বিরামপুর সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা ব্যর্থ করলো বিজিবি Logo দুপুরের মধ্যে সাত জেলায় বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা Logo ফ্রান্স-স্পেনে দাবানল: দুই লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে Logo সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: অস্থায়ী চেয়ারে স্পিকার ও ৯০ দিনের সমীকরণ Logo বঙ্গভবনে নতুন সূর্যাস্ত: ইস্তফায় শেষ হলো এক বিতর্কিত অধ্যায় Logo সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরলেন স্পিকার Logo ভাটারায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, দগ্ধ একই পরিবারের দুজনের মৃত্যু

বঙ্গভবনে নতুন সূর্যাস্ত: ইস্তফায় শেষ হলো এক বিতর্কিত অধ্যায়

বাংলাদেশ রাজনীতির নাট্যমঞ্চে গুঞ্জন যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন তা কেবল গুঞ্জন হয়ে থাকে না- পরিণত হয় ইতিহাসের কোনো মোড় ঘোরানো সত্যে। বেশ কয়েকদিনের জল্পনা-কল্পনা, পর্দার পেছনের নানামুখী আলোচনা আর নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক ব্যাধিকে সামনে রেখে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের মারফতে স্পিকারের দরবারে পৌঁছাল তাঁর পদত্যাগপত্র। বঙ্গভবনের সেই চিরচেনা বারান্দায় শেষ হলো একটি বিতর্কিত ও ঝঞ্ঝাবাজময় অধ্যায়; আর ৫৪ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক ধারাপাতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির চেয়ারে আসীন হলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

অসুস্থতার আড়ালে এক রাজনৈতিক বিদায়

শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা। জাতীয় সংসদ ভবনের সংবাদ সম্মেলনে স্পিকারের কণ্ঠে যখন পদত্যাগপত্রের হরফগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জটিলতার যবনিকাপাত। পদত্যাগপত্রে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর গুরুতর শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কথা উল্লেখ করেন। হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতার পাশাপাশি ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক জটিল ব্যাধির কথা জানিয়েছেন তিনি- যে ব্যাধির প্রভাবে মাঝেমধ্যে ক্ষণিক অচেতনতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি।

তবে কেবল শারীরিক অসুস্থতাই কি এই বিদায়ের একমাত্র পাণ্ডুলিপি? ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে আপিল বিভাগের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় নিজের “সুদৃঢ় ও ইতিবাচক” ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। মাফিয়া আমলের ধারাবাহিকতায় মনোনীত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রতি তিনি তাঁর আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধের স্বাক্ষর রেখে গেলেন।

থাইল্যান্ড থেকে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন সাংবিধানিক সমাধান

কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতির ইস্তফা নিয়ে গুঞ্জন ডালপালা মেলছিল রাজনীতি ও গণমাধ্যমের অন্দরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য এবং থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নির্ধারিত সময়ের আগেই তড়িঘড়ি দেশে ফেরা—সব মিলিয়ে নাটকের শেষ দৃশ্যটি যেন আগেই প্রস্তুত করা হচ্ছিল। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্পিকার কূটনৈতিক নীরবতা বজায় রাখলেও, শুক্রবারের সূর্য ডোবার আগেই পাঁচটা এক মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র।

এই পদত্যাগের মাধ্যমে দেশে যাতে কোনো প্রকার সাংবিধানিক শূন্যতা বা বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্পিকার জানান, পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্ধারণ করবে বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক কে হতে যাচ্ছেন।

গোধূলির আলোয় বঙ্গভবন

২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করা মো. সাহাবুদ্দিনের পাঁচ বছরের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালে। কিন্তু ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মেই পথ চলে। রাজনৈতিক ডামাডোল, জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল স্মৃতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে তিন বছর তিন মাসের এই বঙ্গভবনবাসের সমাপ্তি ঘটল।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সব সময়ই এক গম্ভীর ও দূরপ্রসারী ঘটনা। সকল ধোঁয়াশা ও কুয়াশা ভেদ করে রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত বিদায় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার এক নতুন রূপরেখা। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৯০ দিনের এই সাংবিধানিক মেয়াদের শেষান্তে কার হাতে ওঠে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকত্বের ঐতিহ্যবাহী ব্যাটন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইসলামী ব্যাংকের শ্যামলী শাখায় গ্রাহক সমাবেশ অনুষ্ঠিত

বঙ্গভবনে নতুন সূর্যাস্ত: ইস্তফায় শেষ হলো এক বিতর্কিত অধ্যায়

আপডেট সময় ০৫:৩৯:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ রাজনীতির নাট্যমঞ্চে গুঞ্জন যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন তা কেবল গুঞ্জন হয়ে থাকে না- পরিণত হয় ইতিহাসের কোনো মোড় ঘোরানো সত্যে। বেশ কয়েকদিনের জল্পনা-কল্পনা, পর্দার পেছনের নানামুখী আলোচনা আর নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক ব্যাধিকে সামনে রেখে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের মারফতে স্পিকারের দরবারে পৌঁছাল তাঁর পদত্যাগপত্র। বঙ্গভবনের সেই চিরচেনা বারান্দায় শেষ হলো একটি বিতর্কিত ও ঝঞ্ঝাবাজময় অধ্যায়; আর ৫৪ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক ধারাপাতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির চেয়ারে আসীন হলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

অসুস্থতার আড়ালে এক রাজনৈতিক বিদায়

শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা। জাতীয় সংসদ ভবনের সংবাদ সম্মেলনে স্পিকারের কণ্ঠে যখন পদত্যাগপত্রের হরফগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জটিলতার যবনিকাপাত। পদত্যাগপত্রে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর গুরুতর শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কথা উল্লেখ করেন। হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতার পাশাপাশি ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক জটিল ব্যাধির কথা জানিয়েছেন তিনি- যে ব্যাধির প্রভাবে মাঝেমধ্যে ক্ষণিক অচেতনতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি।

তবে কেবল শারীরিক অসুস্থতাই কি এই বিদায়ের একমাত্র পাণ্ডুলিপি? ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে আপিল বিভাগের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় নিজের “সুদৃঢ় ও ইতিবাচক” ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। মাফিয়া আমলের ধারাবাহিকতায় মনোনীত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রতি তিনি তাঁর আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধের স্বাক্ষর রেখে গেলেন।

থাইল্যান্ড থেকে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন সাংবিধানিক সমাধান

কয়েক দিন ধরেই রাষ্ট্রপতির ইস্তফা নিয়ে গুঞ্জন ডালপালা মেলছিল রাজনীতি ও গণমাধ্যমের অন্দরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য এবং থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নির্ধারিত সময়ের আগেই তড়িঘড়ি দেশে ফেরা—সব মিলিয়ে নাটকের শেষ দৃশ্যটি যেন আগেই প্রস্তুত করা হচ্ছিল। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্পিকার কূটনৈতিক নীরবতা বজায় রাখলেও, শুক্রবারের সূর্য ডোবার আগেই পাঁচটা এক মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র।

এই পদত্যাগের মাধ্যমে দেশে যাতে কোনো প্রকার সাংবিধানিক শূন্যতা বা বিপর্যয় সৃষ্টি না হয়, সে কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্পিকার জানান, পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্ধারণ করবে বঙ্গভবনের পরবর্তী অভিভাবক কে হতে যাচ্ছেন।

গোধূলির আলোয় বঙ্গভবন

২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করা মো. সাহাবুদ্দিনের পাঁচ বছরের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালে। কিন্তু ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মেই পথ চলে। রাজনৈতিক ডামাডোল, জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল স্মৃতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে তিন বছর তিন মাসের এই বঙ্গভবনবাসের সমাপ্তি ঘটল।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সব সময়ই এক গম্ভীর ও দূরপ্রসারী ঘটনা। সকল ধোঁয়াশা ও কুয়াশা ভেদ করে রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত বিদায় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার এক নতুন রূপরেখা। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৯০ দিনের এই সাংবিধানিক মেয়াদের শেষান্তে কার হাতে ওঠে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকত্বের ঐতিহ্যবাহী ব্যাটন।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি