ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’

প্রায় কোমরসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে নিজের ভিটা দেখাচ্ছিলেন আশা খাতুন। কয়েক দিন আগেও সেখানে ছিল তার মাটির ঘর। এখন চারদিকে শুধু ঘোলা পানি। ঘর নেই, ধানের গোলা নেই, চাল নেই। হাঁস-মুরগি আর পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

ষাটোর্ধ্ব এই নারী অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’ (ও বাবা, আমার ঘর আর নেই। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো, কোথায় মাথা গুঁজবো, জানি না।) কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা আশা খাতুনের স্বামী আবদুর রাজ্জাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে চলছে তার সংসার। দিনমজুর দুই ছেলের আয়ে কোনোমতে টিকে থাকা পরিবারটির সবচেয়ে বড় সম্বল ছিল একটি মাটির ঘর। ভয়াবহ বন্যায় এটি বিলীন হয়ে গেছে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চারদিন আগে গভীর রাতে প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় এই বৃদ্ধাকে। পাহাড়ি ঢলের পানি মুহূর্তেই ঘরে ঢুকে পড়ায় কাপড়, চাল কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস নেওয়ার সুযোগও পাননি। এখন তিনি গ্রামের এক প্রতিবেশীর পাকা ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।

রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে আবার নিজের ভিটায় ফিরেছিলেন আশা খাতুন। হয়তো ভেবেছিলেন, কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা যাবে। কিন্তু পানির নিচে তলিয়ে থাকা বাড়িতে গিয়ে তিনি আর কিছুই খুঁজে পাননি।

ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এই এক কঅর (কাপড়) লই বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি।’

অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে আশা খাতুন বলেন, ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব।’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে আরও দেখা যায়, রাস্তাঘাট পানির নিচে। মাঠ, পুকুর, আঙিনা- সব একাকার। কোথাও মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও শুধু টিনের চালার অংশ পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। কেউ ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরিয়ে বসতভিটা পরিষ্কারের চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এত দ্রুত পানি বেড়ে যায় যে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সময়ই পাননি অনেকে। অনেকের গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, খাদ্যশস্য ও পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ১২ জুলাই বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামে এক হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। আগামী দুই থেকে তিনদিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

এই বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। ৬ জুলাই থেকে বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কয়েক দিন পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে বৃষ্টিতে আবারও পানি বাড়ছে।

বাংলা৭১নিউজ/এবি

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’

আপডেট সময় ১২:১২:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

প্রায় কোমরসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে নিজের ভিটা দেখাচ্ছিলেন আশা খাতুন। কয়েক দিন আগেও সেখানে ছিল তার মাটির ঘর। এখন চারদিকে শুধু ঘোলা পানি। ঘর নেই, ধানের গোলা নেই, চাল নেই। হাঁস-মুরগি আর পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

ষাটোর্ধ্ব এই নারী অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, ক্যানে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’ (ও বাবা, আমার ঘর আর নেই। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো, কোথায় মাথা গুঁজবো, জানি না।) কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা আশা খাতুনের স্বামী আবদুর রাজ্জাক কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে চলছে তার সংসার। দিনমজুর দুই ছেলের আয়ে কোনোমতে টিকে থাকা পরিবারটির সবচেয়ে বড় সম্বল ছিল একটি মাটির ঘর। ভয়াবহ বন্যায় এটি বিলীন হয়ে গেছে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চারদিন আগে গভীর রাতে প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় এই বৃদ্ধাকে। পাহাড়ি ঢলের পানি মুহূর্তেই ঘরে ঢুকে পড়ায় কাপড়, চাল কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস নেওয়ার সুযোগও পাননি। এখন তিনি গ্রামের এক প্রতিবেশীর পাকা ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।

রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে আবার নিজের ভিটায় ফিরেছিলেন আশা খাতুন। হয়তো ভেবেছিলেন, কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা যাবে। কিন্তু পানির নিচে তলিয়ে থাকা বাড়িতে গিয়ে তিনি আর কিছুই খুঁজে পাননি।

ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এই এক কঅর (কাপড়) লই বাইর অই। আর কিছু আনিত ন পারি। চিড়া আর পানি খাই আছি।’

অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে আশা খাতুন বলেন, ‘ঝড় থামে, আবার শুরু অয়। আল্লাহ জানে, আর কত দিন এই কষ্ট থাইব।’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে আরও দেখা যায়, রাস্তাঘাট পানির নিচে। মাঠ, পুকুর, আঙিনা- সব একাকার। কোথাও মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও শুধু টিনের চালার অংশ পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। কেউ ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরিয়ে বসতভিটা পরিষ্কারের চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এত দ্রুত পানি বেড়ে যায় যে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সময়ই পাননি অনেকে। অনেকের গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, খাদ্যশস্য ও পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ১২ জুলাই বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রামে এক হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। আগামী দুই থেকে তিনদিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

এই বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। ৬ জুলাই থেকে বাহারছড়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, কাথারিয়া, বৈলছড়ি ও ছনুয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কয়েক দিন পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে বৃষ্টিতে আবারও পানি বাড়ছে।

বাংলা৭১নিউজ/এবি