ঢাকা ০১:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকৃতির রুদ্ররূপে লণ্ডভণ্ড সাত জেলা

৫১ প্রাণহানি, ১০ লাখের বেশি মানুষ বিপন্ন

টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বানের জলের তোড়ে ভেসে গেছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, আর পাহাড়ধসের নিচে চাপা পড়েছে বহু তাজা প্রাণ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যা ও বন্যা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একটা বড় অংশই প্রাণ হারিয়েছেন মাটি চাপা পড়ে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন একজন। আর পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

পানিবন্দি ১০ লাখ প্রাণ

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই ৭টি জেলার ৫৯টি উপজেলার অন্তত ৩৮০টি এলাকা এখন পানির নিচে। পানিবন্দি ও অতিবৃষ্টির কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয়েছে হাজার হাজার পরিবারের। সরকারি হিসেবে, দুর্গতদের জন্য খোলা ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এই মুহূর্তে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ।

কক্সবাজারে লাশের মিছিল, চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ক্ষতি

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলের নিষ্ঠুর থাবায় জেলাটিতে রেকর্ড ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা হলেও বাকি ১৩ জন আশ্রিত রোহিঙ্গা নাগরিক, যারা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে, ভৌগোলিক ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি লণ্ডভণ্ড হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলার প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কক্সবাজারেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

বরাদ্দের তুলনায় বিতরণে ধীরগতি

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারিভাবে এ পর্যন্ত দুর্গত জেলাগুলোতে ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

ক্ষতির তীব্রতা বিবেচনায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে সব জেলাতেই ত্রাণ পৌঁছানোর গতি এখনও ধীর।

কক্সবাজার: ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৩৩০ প্যাকেট শুকনো খাবার। এছাড়া ৩০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চল: খাগড়াছড়িতে ৪০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৬৭.৬ মেট্রিক টন, রাঙামাটিতে ৫০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে ২৩৫ মেট্রিক টন এবং বান্দরবানে ৪০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে মাত্র ৬৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চল: মৌলভীবাজারে ৯০ মেট্রিক টন ও হবিগঞ্জে ৭০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

জরুরি মানবিক সহায়তার আহ্বান

বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। নিরাপদ পানির অভাব, শুকনো খাবারের সংকট এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অনেক মানুষের কাছে এখনও পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত জরুরি খাদ্য সহায়তা। এই মুহূর্তে দুর্গতদের বাঁচাতে এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজের সামর্থ্যবান প্রতিটি মানুষকে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসা জরুরি।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

 

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রকৃতির রুদ্ররূপে লণ্ডভণ্ড সাত জেলা

৫১ প্রাণহানি, ১০ লাখের বেশি মানুষ বিপন্ন

আপডেট সময় ১১:২৬:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর আকস্মিক পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বানের জলের তোড়ে ভেসে গেছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, আর পাহাড়ধসের নিচে চাপা পড়েছে বহু তাজা প্রাণ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যা ও বন্যা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একটা বড় অংশই প্রাণ হারিয়েছেন মাটি চাপা পড়ে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন একজন। আর পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

পানিবন্দি ১০ লাখ প্রাণ

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই ৭টি জেলার ৫৯টি উপজেলার অন্তত ৩৮০টি এলাকা এখন পানির নিচে। পানিবন্দি ও অতিবৃষ্টির কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয়েছে হাজার হাজার পরিবারের। সরকারি হিসেবে, দুর্গতদের জন্য খোলা ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এই মুহূর্তে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ।

কক্সবাজারে লাশের মিছিল, চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ক্ষতি

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলের নিষ্ঠুর থাবায় জেলাটিতে রেকর্ড ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা হলেও বাকি ১৩ জন আশ্রিত রোহিঙ্গা নাগরিক, যারা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে, ভৌগোলিক ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি লণ্ডভণ্ড হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলার প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কক্সবাজারেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

বরাদ্দের তুলনায় বিতরণে ধীরগতি

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারিভাবে এ পর্যন্ত দুর্গত জেলাগুলোতে ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

ক্ষতির তীব্রতা বিবেচনায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে সব জেলাতেই ত্রাণ পৌঁছানোর গতি এখনও ধীর।

কক্সবাজার: ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৩৩০ প্যাকেট শুকনো খাবার। এছাড়া ৩০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চল: খাগড়াছড়িতে ৪০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৬৭.৬ মেট্রিক টন, রাঙামাটিতে ৫০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে ২৩৫ মেট্রিক টন এবং বান্দরবানে ৪০০ মেট্রিক টনের বিপরীতে মাত্র ৬৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চল: মৌলভীবাজারে ৯০ মেট্রিক টন ও হবিগঞ্জে ৭০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

জরুরি মানবিক সহায়তার আহ্বান

বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। নিরাপদ পানির অভাব, শুকনো খাবারের সংকট এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অনেক মানুষের কাছে এখনও পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত জরুরি খাদ্য সহায়তা। এই মুহূর্তে দুর্গতদের বাঁচাতে এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজের সামর্থ্যবান প্রতিটি মানুষকে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসা জরুরি।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি