ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে শুক্রবার (১০ জুলাই) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। মতভেদের মূল বিষয় হচ্ছে- আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর কার্যকর নজরদারির সক্ষমতা হারিয়েছে বলে অধিকাংশ সদস্য দেশ সতর্ক করেছে। এর ফলে পরমাণু বিস্তার রোধে গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন দাবি করেছে, ২০১৫ সালের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের আইনি কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের যৌক্তিকতা নেই।
IAEA-এর নজরদারি নিয়ে উদ্বেগ
জাতিসংঘের রাজনৈতিক ও শান্তিবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল রোজমেরি ডিকার্লো জানান, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলার পর IAEA ইরানের ঘোষিত সব পরমাণু স্থাপনা সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা হারিয়েছে। সংস্থাটি এখন সেন্ট্রিফিউজ, ভারী পানি এবং ইউরেনিয়াম উৎপাদন ও মজুদের পূর্ণাঙ্গ চিত্রও জানতে পারছে না।
কূটনীতির পথ এখনও খোলা বলছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন, কূটনীতির দরজা এখনও খোলা রয়েছে এবং সেটিই ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার।
তবে, তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি বেসামরিক স্থাপনা বা জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র জবাব দেবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি লঙ্ঘনের জন্য ইরানকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কঠোর অবস্থানে জার্মানি ও ফ্রান্স
জার্মানি জানিয়েছে, যাচাইযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে পরমাণু কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ইরানকে পূরণ করতে হবে। এই শর্ত পূরণ হলে পরমাণু-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে সমর্থন দেবে জার্মানি।
ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, ইরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। তিনি অভিযোগ করেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গ করেছে। তবে, ওই সমঝোতাকে তিনি যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ পরমাণু সমঝোতার জন্য একটি ইতিবাচক প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভারসাম্য অবস্থানে চীন
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানায় চীন। বেইজিংয়ের প্রতিনিধি বলেন, ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানতে হবে।
তবে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের বৈধ অধিকারও ইরানের রয়েছে যা IAEA-এর কঠোর তদারকির আওতায় থাকা উচিত।
রাশিয়ার আপত্তি
নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠককে ‘ইরানবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করেছে রাশিয়া।
মস্কোর প্রতিনিধি বলেন, ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে এবং পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞাকে ব্যবহার করছে। তার দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগের পক্ষে IAEA কখনোই সামরিক উদ্দেশ্যে পরমাণু উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ পায়নি।
পাকিস্তান ও বাহরাইনের মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে কূটনৈতিক সমাধানের একটি কার্যকর রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করে পাকিস্তান। একই সঙ্গে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে বাহরাইন অভিযোগ করে, কূটনীতিকে বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসেবে নয় বরং সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। একই সঙ্গে IAEA-এর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক হামলা ও নৌ-চলাচলে হুমকি বন্ধের আহ্বান জানায় বাহরাইন।
বৈঠকের সার্বিক আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, এখনও কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে গভীর বিভক্তি বজায় রয়েছে।
২২৩১ নম্বর প্রস্তাব কী?
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবটি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই গৃহীত হয় যা Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) বা ইরানের পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত। এই যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে- পরমাণু ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত চুক্তি। এর মাধ্যমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন) ও জার্মানির (5p+1) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। এই চুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও অংশগ্রহণ করেছিল।
চুক্তির মূল উদ্দেশ্য
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সে জন্য তার পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়।
চুক্তির প্রধান শর্ত
১) ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত করবে।
২) উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাবে।
৩) পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখবে।
৪) আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে বের করে নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অভিযোগ ছিল, চুক্তিটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
বাংলা৭১নিউজ/এবি



























