বরিশালের আগৈলঝাড়ার একটি ঘটনা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক জলজ্যান্ত এবং উদ্বেগজনক স্মারক। চুরির মামলায় গ্রেপ্তার রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর ‘গুজব’ ছড়িয়ে পড়ার পর একদল উত্তেজিত মানুষ থানায় হামলা চালায়। পুলিশ ও মিছিলকারীদের এই সংঘর্ষে সহকারী উপপরিদর্শকসহ (এএসআই) অন্তত ১২ জন আহত হন। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত রিয়াজ নিজেই হাজতে নিজের মাথায় আঘাত করে অচেতন হয়েছেন। অন্যদিকে রিয়াজের মায়ের দাবি, পুলিশ তাঁর ছেলেকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করেছে। ঘটনা যাই হোক না কেন, এই একটি চিত্রনাট্য আজ বাংলাদেশের বহু জনপদের সাধারণ গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনাটি মূলত তিনটি গভীর সংকটকে সামনে এনে দাঁড় করায়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থার চরম সংকট, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা, এবং গুজবকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অস্থিরতা। আজকের বাংলাদেশ কি সত্যিই আইনের শাসনের দিকে হাঁটছে? নাকি এক অদৃশ্য ‘ভয়ের সমাজ’ আমাদের গ্রাস করছে? আগৈলঝাড়ার থানা ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটিকে শুধু একটি ‘স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ও শাসনকাঠামোর ভেতরের এক গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ।
জনগণ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে থানা বা হাজতখানা কোনো নিরাপদ জায়গা নয়, তখনই গুজবের ডালপালা দ্রুত ছড়ায়। রিয়াজ ফকিরের পরিবারের দাবি- তাঁকে পুলিশি নির্যাতন করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি- তিনি নিজে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমাদের দেশের ফৌজদারি বিচার ইতিহাসে ‘পুলিশি হেফাজত’ বা ‘কাস্টডিয়াল টর্চার’ নিয়ে এত বেশি বিতর্ক রয়েছে যে, সাধারণ মানুষ প্রথমত পুলিশের বয়ানকে বিশ্বাস করতে দ্বিধাবোধ করে। এই বিশ্বাসের অভাবই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রথম অনুঘটক।
ডিজিটাল এবং সামাজিক যোগাযোগের এই যুগে একটি গুজব মুহূর্তের মধ্যে বারুদে আগুন দেওয়ার মতো কাজ করে। রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়ামাত্রই শতাধিক মানুষ থানায় চড়াও হয়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি (Social Contract) কতটা ভঙ্গুর হলে মানুষ সরাসরি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদর দপ্তরে হামলা করতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অপরাধের ধরন যেমন পাল্টাচ্ছে, তেমনি অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সমসাময়িক সংকটগুলোকে কয়েকটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত করা যায়
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হলো ‘মব জাস্টিস’। চোর সন্দেহে, ডাকাত সন্দেহে কিংবা স্রেফ গুজবের ওপর ভিত্তি করে দলবদ্ধভাবে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যখন সাধারণ মানুষ মনে করে অপরাধী আদালতে গিয়ে পার পেয়ে যাবে, অথবা পুলিশ সঠিক বিচার করবে না, তখন তারা নিজেরাই ‘অন-দ্য-স্পট’ বিচার করতে চায়। এটি আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং একটি আদিম ও বর্বর সমাজের লক্ষণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পেশাদারিত্ব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ।
দলীয়করণ, তদবির-সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিতার অভাব পুলিশকে জনগণের মিত্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি ‘ভীতি বা ভয়ের প্রতীক’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বাস্তব জগতের অপরাধের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগৎ এখন অপরাধের এক বিশাল অভয়ারণ্য। গুজব ছড়ানো, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল এবং ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দাঙ্গা বা সহিংসতা বাঁধানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।
আগৈলঝাড়ার ঘটনাতেও দেখা গেছে, স্রেফ একটি মৌখিক বা সামাজিক মাধ্যমের গুজব কীভাবে একটি থানাকে রণক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে। যখন বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তখন সমাজজুড়ে একটি চরম নিরাপত্তাহীনতাবোধ তৈরি হয়। মানুষ তখন নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বৈধ বা অবৈধ শক্তির আশ্রয় খোঁজে, যা সমাজকে আরও বেশি সহিংস করে তোলে। “যে সমাজে একজন নাগরিক থানায় যেতে ভয় পায়, যেখানে অপরাধের শিকার হওয়ার পর মানুষ আইনের আশ্রয় না নিয়ে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়, সেই সমাজ আর যাই হোক গণতান্ত্রিক বা সভ্য সমাজ হতে পারে না।”
আমরা আজ যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘ভয়ের সমাজ’ (Society of Fear) বলে আখ্যয়িত করছেন। এই সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: নাগরিকের সাথে নাগরিকের এবং নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের এক চরম অবিশ্বাস তৈরি হয়। আইন সবার জন্য সমান—এই আপ্তবাক্যটি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। যার ক্ষমতা বা অর্থ আছে, আইন তার পক্ষে কথা বলে। মানুষ অন্যায় দেখেও চুপ থাকে, কারণ প্রতিবাদ করলে উল্টো নিজে ফেঁসে যাওয়ার ভয় থাকে। বরিশালের আগৈলঝাড়ার ঘটনা আমাদের জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। রাষ্ট্রকে যদি ‘ভয়ের সমাজ’ থেকে ‘আইনের শাসনে’ ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে অবিলম্বের কিছু কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
কাঠামোগত সংস্কারই পারে ‘ভয়ের সমাজ’ থেকে ‘আইনের শাসন’ ফেরাতে
পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। থানাগুলোতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ হেফাজতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা বা আঘাতের ঘটনা ঘটলে তা স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে, যাতে জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা থানায় হামলা চালানোর মতো ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আগৈলঝাড়ার ঘটনায় যারা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে, তাদের যেমন আইনের আওতায় আনতে হবে, তেমনি ঘটনার মূল কারণ (রিয়াজ ফকিরের আহত হওয়ার প্রকৃত সত্য) উদ্ঘাটন করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হলে মামলার জট কমাতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। যেকোনো সংবেদনশীল তথ্য পাওয়ার পর তা যাচাই না করে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য নাগরিকদের সচেতন করতে হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং আইনের সমান প্রয়োগে।
রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা একদিনে গড়ে ওঠে না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না। এটি গড়ে ওঠে প্রতিটি সুষ্ঠু তদন্ত, প্রতিটি নিরপেক্ষ বিচার, প্রতিটি জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি মানবিক আচরণের মাধ্যমে। বরিশালের আগৈলঝাড়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। নাগরিকের দায়িত্ব আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনের মাধ্যমে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা। এই দুই দায়িত্বের সমন্বয়েই প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কোন পথ বেছে নিই তার ওপর। যদি বিচারহীনতা, গুজব, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিই, তাহলে নিরাপত্তাহীনতার বৃত্ত আরও বিস্তৃত হবে। আর যদি জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, পেশাদার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথ আরও সুদৃঢ় হবে। আইনের শাসন কোনো স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাসের আরেক নাম। সেই বিশ্বাস রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, আর সেই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য।
◊ লেখক একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট (এটি তার নিজস্ব মত)
মো. আব্দুল মান্নান 





















