১৯৭১ সালের মধ্যভাগ। গেরিলা যুদ্ধের আকস্মিক আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কিছুটা কোণঠাসা হলেও কৌশলগত দিক থেকে তারা তখনো বেশ সুসংহত। ঠিক এমন একটি ক্রান্তিলগ্নে, ১৯৭১ সালের ৭ই জুলাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়। জন্ম নেয় বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড—‘জেড ফোর্স। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নামের আদ্যাক্ষর অনুসারে গঠণ করা হয় জেড ফোর্স।এই ফোর্সটি ছিল মূলত প্রথাগত বা নিয়মিত যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রয়াস। তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সেনাপ্রধান হন এবং দেশের ক্রান্তিলগ্নে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর একটি উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী দলের হাতে তিনি নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন।
জেড ফোর্স গঠনের নেপথ্য কাহিনী ও কারণ
১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত যুদ্ধ মূলত ছিল বিক্ষিপ্ত ও প্রতিরোধমূলক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি আধুনিক ও সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ করে ভূখণ্ড দখল ও তা ধরে রাখা অসম্ভব ছিল। জুলাই মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের ঐতিহাসিক সম্মেলনে এসব দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখা হয় তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের উপর। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় তার নামের আদ্যক্ষর দিয়ে একটি নিয়মিত ফোর্স গঠনের। এছাড়াও আও দুটি নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
ভূখণ্ড দখল ও নিয়ন্ত্রণ: গেরিলাদের মূল কাজ ছিল ‘আঘাত করো এবং পালিয়ে যাও’ (হিট এন্ড রান)। কিন্তু মুক্তাঞ্চল গঠন ও তা ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পদাতিক বাহিনীর (ইনফেনট্রি) কোনো বিকল্প ছিল না।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা: স্বাধীন বাংলাদেশের একটি নিয়মিত সামরিক বাহিনী রয়েছে—এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রমাণ করা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
মনস্তাত্ত্বিক বিজয়: পূর্ব পাকিস্তান যে সত্যিই স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল নিজস্ব নিয়মিত সেনাদল। এই লক্ষ্যেই ১ম, ৩য় এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এই তিনটি নির্দিষ্ট ব্যাটালিয়নকে একসাথে করেই জেড ফোর্স নামের প্রথম সামরিক ব্রিগেডটি গঠন করা হয়েছিল। ভারতের মেঘালয়ের তুরা পাহাড়ি অঞ্চলের তেলঢালায় জেড ফোর্সের সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়।
রণক্ষেত্রের ত্রাস: কামালপুর থেকে ধলই
জেড ফোর্সের আভিযানিক ইতিহাস মূলত রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমর এবং অবিশ্বাস্য বীরত্বের গাথা। এই ফোর্সের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে তাদের সুরক্ষিত বাংকার ও ক্যাম্প থেকে টেনে বের করে এনে যুদ্ধ করতে বাধ্য করত।
কামালপুর যুদ্ধ: পাকিস্তানি দম্ভের পতন
ময়মনসিংহের বকশীগঞ্জের কামালপুর সীমান্ত ঘাঁটিটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজের (বীর উত্তম) নেতৃত্বে ৩১ জুলাই জেড ফোর্সের ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এখানে এক রক্তক্ষয়ী আক্রমণ চালায়। বুক সমান কাদা ও তুমুল বৃষ্টির মধ্যে শত্রু ঘাঁটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। এই যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ শাহাদাত বরণ করলেও, জেড ফোর্সের এই মরিয়া আক্রমণ পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল চূর্ণ করে দেয়। পরবর্তীতে এই কামালপুর ঘাঁটিতেই পাকিস্তানি সেনারা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
সিলেট ও রৌমারীর যুদ্ধ
জেড ফোর্সের অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারীকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা। পুরো ৯ মাস এই অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী পা ফেলার সাহস পায়নি। পরবর্তীতে এই ফোর্স সিলেট অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয় এবং ধলই সীমান্ত ঘাঁটি, কানাইঘাট, ছাতক ও টেংরাটিলার মতো অত্যন্ত দুর্ভেদ্য পাকিস্তানি ডিফেন্স লাইনের ওপর একের পর এক সফল আক্রমণ চালায়।
এই ফোর্স যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল
জেড ফোর্স গঠন ও তার সফল অপারেশনগুলো মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশলকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। জেড ফোর্সের আক্রমণের পর যুদ্ধটি আর কেবল ‘বিদ্রোহ’ বা ‘গেরিলা তৎপরতা’ রইল না; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধে রূপ নিল।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস: জেড ফোর্সের সুপরিকল্পিত আক্রমণের ফলে ঢাকা-সিলেট এবং ময়মনসিংহ-জামালপুর রুটে পাকিস্তানি বাহিনীর রেল ও সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং রসদ সরবরাহে বিপর্যয় ঘটে।
যৌথ বাহিনীর ভিত্তি: ডিসেম্বর মাসে যখন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড গঠিত হয়, তখন জেড ফোর্সের নিয়মিত ব্যাটালিয়নগুলো ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে কাঁধ মিলিয়ে দ্রুততম সময়ে ঢাকামুখী অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে পেরেছিল।
পাকিস্তানি হানাদারদের জন্য জেড ফোর্স ছিল ‘ত্রাস’
তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক নথিপত্র এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবন্দী অফিসারদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেড ফোর্স শব্দটাই তাদের জন্য আতঙ্কের কারণ ছিল।
সাধারণত গেরিলারা আক্রমণ করে লুকিয়ে যেত, কিন্তু জেড ফোর্সের জওয়ানরা ভারী অস্ত্র (যেমন ৩ ইঞ্চি মর্টার ও এলএমজি) নিয়ে সরাসরি পাকিস্তানি ডিফেন্সের ভেতরে ঢুকে হানা দিত। বিশেষ করে বেয়নেট চার্জ বা মুখোমুখি হাতাহাতি যুদ্ধে (হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমবেট) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্ষিপ্রতা পাকিস্তানি সেনাদের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করেছিল। কামালপুর বা কানাইঘাটের যুদ্ধে জেড ফোর্সের আক্রমণের তীব্রতা দেখে পাকিস্তানি কমান্ডারেরা ধরে নিয়েছিল যে তাদের সামনে কোনো সাধারণ বিদ্রোহী নয়, বরং অত্যন্ত পেশাদার ও মরণজয়ী এক সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে জেড ফোর্সের অবস্থান
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর, জেড ফোর্সের ব্যাটালিয়নগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল স্তম্ভ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: এই ব্যাটালিয়নটি ‘জেড ফোর্স’-এর প্রধান শক্তি ছিল, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গৌরবময় ও সিনিয়র ব্যাটালিয়ন হিসেবে মর্যাদা পায় এবং এটি “সিনিয়র টাইগার্স” নামে পরিচিত।
৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: এই ব্যাটালিয়ন দুটিও দেশের বিভিন্ন ব্যারাকে পুনর্গঠিত হয় এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের কার্যক্রম বজায় রাখে।
কমান্ড কাঠামো: জেড ফোর্সের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান (সেনাপ্রধান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ফোর্সের বহু কর্মকর্তা (যেমন ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ যিনি বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার), (ক্যাপ্টেন আমিন আহম্মেদ চৌধুরী প্রমুখ) পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং উচ্চতর কমান্ড পরিচালনা করেন।
পুনশ্চ
১৯৭১ সালের ৭ জুলাই যে ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়েছিল, তা কেবল একটি সামরিক ব্রিগেড ছিল না; তা ছিল বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও সাহসের প্রতীক। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে শুরু করে সিলেটের সমতল ভূমি পর্যন্ত তাদের বুটের আওয়াজ আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পাকিস্তানি হানাদারদের মনে যে কম্পন সৃষ্টি করেছিল, তা-ই মূলত বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি





















