গত রোজার ঈদে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকার সদরঘাটে মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত সোহেলের ঘর আলো করে এসেছে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান।
বুধবার ভোরে বরিশালে বাবার বাড়িতে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। পৃথিবীর আলো দেখলেও জন্মের আগেই বাবাকে হারানো এই শিশুর ভাগ্যে জুটলো না বাবার কোল।
চলতি বছরের ১৮ মার্চ (রমজান মাসে) গর্ভবতী স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ঈদের ছুটি কাটাতে ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার চরখাগকাটার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী যুবক সোহাগ (সোহেল)। সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ট্রলারে করে ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে ওঠার সময় পেছন থেকে ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামের একটি লঞ্চ সজোরে ধাক্কা দেয়।
ঘটনাস্থলেই লঞ্চের চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান সোহেল। একই দুর্ঘটনায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন তার বাবা মিরাজ হোসেন, যিনি পরবর্তীতে আর বেঁচে ফেরেননি। নদী থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সোহেলের ২০ বছর বয়সী অন্তসত্ত্বা স্ত্রী রুবাকে (রেবা)। দুর্ঘটনায় তার হাত ও পা ভেঙে যায়।
স্বামী ও শ্বশুরকে হারানোর তীব্র শোকের পাশাপাশি ভাঙা হাত-পা নিয়ে তিন মাস ধরে জীবনযুদ্ধ চালিয়েছেন প্রসূতি রুবা। গতকাল ভোরে সমস্ত কষ্টকে জয় করে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তিনি।
তার প্রতিবেশী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সদরঘাটের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ওর (রুবা) দুটো জীবনই চলে গেল—একদিকে শ্বশুর, অন্যদিকে হাসবেন্ড। আর যে শিশুটি গতকাল জন্ম নিল, সে তো তার বাবাকে দেখার সুযোগই পেল না।’
রুবা জানান, মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে ২০ রমজানে সোহেল হয়তো নিজের নিয়তি বুঝতে পেরেছিলেন। রুবার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার হাত-পা ভাইঙ্গা আসতেছে, মনে হয় আর বাঁচবো না। আমি মইরা গেলে তুমি কি আমার সন্তান ফালায়া অন্য জায়গায় সংসার করবে?’
সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল সোহেলের। রুবা কান্না চেপে বলেন, সন্তানের নামও আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। মেয়ে হলে সুমাইয়া আক্তার সোহা, আর ছেলে হলে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘মোহাম্মদ রায়হান’। সন্তানকে মাদরাসায় পড়িয়ে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন ছিল তার। আজ সন্তান জন্ম নেওয়ার খবরে ও বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো।
সন্তান জন্ম দিলেও রুবার শারীরিক অবস্থা এখনো পুরোপুরি শঙ্কাযুক্ত নয়। ভাঙা হাতটি কিছুটা ঠিক হলেও এখনো বেশি ওজন তুলতে পারেন না তিনি, পায়েও রয়ে গেছে প্রচণ্ড ব্যথা। ভাঙা শরীর আর বুকভরা কষ্ট নিয়েই এখন সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার এক নতুন যুদ্ধে নেমেছেন এই মা।
সোহেলের চাচাত ভাই ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় লঞ্চ মালিকদের ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। কিন্তু সেটা এখনও পাইনি।’
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ